চোখ তুলে বারান্দার দিকে তাকাল জনি। ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে টিনা। কাঁচের জানালা বন্ধ, কিছুই শুনতে পাচ্ছে না সে। কেউ ওর গান শোনে, কেন কে জানে, তা চায় না জনি।
নতুন করে পুরানো একটা ব্যালাড ধরুল ও। এবার গলাটাকে চেপে রাখল না। গলা ছেড়ে গাইছে ও, যেন শ্রোতাদের সামনে গাইছে।
গলাটাকে পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে, নিজেকে মুক্ত করে দিয়ে গাইছে ও, আর অপেক্ষা করছে কখন শুরু হবে পরিচিত জ্বালাটা। কিন্তু সেটার অস্তিত্বই টের পাচ্ছে না সে।
অনেকদিন পর নিজের গানের গলা শুনছে জনি। কেমন যেন অন্যরকম শোনাচ্ছে, কিন্তু খারাপ লাগছে না। কণ্ঠস্বর আরও গাঢ় লাগছে–পুরুষ মানুষের গলা এটা, ছেলেমানুষের নয়। সন্দেহ হলো, গলায় একটা বিস্ময়কর সমৃদ্ধি এসেছে। সন্দেহটা ধীরে ধীরে বিশ্বাসে পরিণত হচ্ছে, এখন আর কোন সন্দেহ নেই ওর মনে, এটা একটা সুগভীর সমৃদ্ধ কণ্ঠস্বর। নিশ্চিন্ত মনে থামল জনি। পাথরের মত নিশ্চল বসে আছে পিয়ানোর সামনে। নড়বে, সে শক্তি নেই যেন শরীরে। চুপচাপ বসে ভাবছে।
মন্দ নয়, আচমকা পিছন থেকে নিনোর গলা পেল ও। অন সেকেণ্ড বট-কিসের মন্দ নয়? অপূর্ব! বিস্ময়কর। এ কার গলা, দোস্ত?
ঝট করে ঘুরে বসল জনি। দরজায় নিনোকে একা দেখে স্বস্তি বোধ করল সে। নিনো শুনেছে শুনুক, তাতে তার আপত্তি নেই। ওর সঙ্গিনীটা না শুনলেই হলো।
দেখা যাক, বলল জনি। মেয়ে দুটোকে নিয়ে কি করা যায় বল তো? ওদেরকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া যায় না?
তুই ব্যবস্থা কর, বলল নিনো। এত কচি আর এত ভাল, ফুল ছুঁড়েও ওদের মনে কষ্ট দিতে পারব না আমি। আমার মেয়েটার সাথে দুবার প্রেম চালালাম, এখন যদি ওকে না খেতে দিয়ে ফেরত পাঠাই, আমাকে কি ভাববে বল দেখি?।
ধ্যত্তেরি, না হয় শুনলই ওরা! বিচ্ছিরি গলা তো কি হয়েছে। মেয়েগুলোকে বিদায় করবার দরকার নেই, মনস্থির করে পরিচিত এক ব্যাণ্ড লীডারকে ফোন করল জনি। পাম স্প্রিংসেই থাকে সে। তার কাছ থেকে একটা ম্যাণ্ডোলিন চাইল সে। কিন্তু ব্যাণ্ড লীডার প্রতিবাদের সুরে বলল, ম্যাণ্ডোলিন? ম্যান্ডোলিন দিয়ে কি হবে? পাম স্প্রিংসে কেউ ম্যান্ডোলিন বাজায় না।
জানি, চিৎকার করে বলল জনি। তোমাকে যা বলছি তাই করো। একটা মাণ্ডোলিন পাঠিয়ে দাও।
রেকর্ড করার যন্ত্রপাতিতে বাড়িটা ভর্তি, সুতরাং সেদিক থেকে কোন সমস্যা দেখা দিল না। মেয়ে দুটোকে থাকতে দেয়ায় সুবিধেই হলো। ওদেরকে যন্ত্র অন অফ করা, শব্দ কমানো বাড়ানো রপ্ত করিয়ে নিল জনি।
খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে কাজে বসল ও। ম্যাণ্ডোলিন নিয়ে সঙ্গত করছে নিনো। এক এক করে তার সব পূরানো গান গাইছে জনি। গাইল গলা ছেড়ে, একটুও দয়া মায়া করল না গলাটাকে। গলার অবস্থা চমৎকার, এত ভাল আশা করেনি সে, মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে গেয়ে যেতে পারবে।
কতদিন, কত মাস গাইতে পারেনি সে। গাইতে পারেনি, কিন্তু গানের ভাবনা ছাড়তে পারেনি কখনও। কল্পনায় ভেবেছে, আবার যদি গাইতে পারত, অল্প বয়সে যেভাবে গেয়েছে সেভাবে গাইত না, অন্যভাবে গাইত। এতদিন আওয়াজ করে গাইতে পারেনি জনি, মনে মনে গেয়েছে। কল্পনাটা এখন বাস্তব হয়ে উঠছে। যেভাবে গাইলে গান আরও ভালভাবে ফুটবে বলে মনে করত সেইভাবে গাইছে এখন, আরও বেশি ওস্তাদি আর রংঘাত আরোপ করে। তা করতে গিয়ে মাঝে মধ্যেই গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। মাথার ভেতর যেমন শুনতে পেত কাজের বেলায় সেই ভাবে গাইতে গিয়ে ঠিক সুরটি বেরুচ্ছে না।
মনে মনে ঠিক করল, আরও জোরে, আরও অনেক ভোলা গলায় গাইতে হবে তাকে। এখন আর নিজের গলা শুনছে না জনি।সম্পূর্ণ মনোযোগ চলে গেছে গানের ওস্তাদির দিকে। তাল বজায় রাখতে গিয়ে ঠেকে যাচ্ছে এখানে সেখানে কিন্তু ও কিছু না, অনেকদিন চর্চা না থাকলে অমন হতেই পারে। মেট্রোনোম ওর মাথার ভেতরই আছে, ফলে কখনও ভুল হয় না তার। আবার সব ঠিক হয়ে যাবে, একটু চর্চা করলেই হবে।
অবশেষে থামল জনি। উজ্জল, উদ্ভাসিত মুখে এগিয়ে এসে তার মুখে একটা চুমু খেয়ে বলল টিনা, আজ বুঝলাম কেন তোমার প্রত্যেকটা ছবি দেখতে যায় মা! উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত কথাটাই বলে ফেলেছে টিনা। ঠিক এই বিশেষ মুহূর্তটি ছাড়া অন্য কোন সময় কথাটা বলা ভুল হত। হাসছে ওরা।
টেপটা বাজিয়ে শোনার পালা এবার। পুরো মন লাগিয়ে নিজের গানগুলো ও জনি। আশ্চর্য বদলে গেছে গলাটা, প্রায় সম্পূর্ণ বদলে গেছে, কিন্তু এ যে জনি ফন্টেনেরই কণ্ঠস্বর তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। তার আগের ধারণাটাই ঠিক। আগের চেয়ে আরও অনেক সমৃদ্ধি এসেছে গলায়। আরও গাঢ় হয়েছে স্বর। আগের গলায় একটা ছেলেমানুষির পাতলা ভাব ছিল, এখন সেটা পুরুষ মানুষের পরিণত গলায় রূপান্তরিত হয়েছে। এই নতুন গলায় আবেগ আরও যথার্থভাবে ফুটেছে, অনুভব করার জন্যে এর ভেতর অনেক বেশি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কৌশলগত বিচারেও এর আগে কখনও এত ভাল গায়নি জনি। এ যাকে বলে গুণীর কাজ। চর্চা নেই, তাতেই যদি এত ভাল গাইতে পেরে থাকে, চর্চা করলে তো আরও কত ভাল গাইতে পারবে।
হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল জনির মুখ। নিনোর দিকে ফিরল সে। কি রে, কেমন বুঝছিস? যতটা ভাল মনে করছি, আসলেই কি ততটা ভাল?
প্রত্যাশায় ভরাট জনির মুখের দিকে তাকাল নিনো। চিন্তিত ভাবে বলল, ততটা কিংবা হয়তো তারচেয়েও ভাল। কিন্তু দেখা যাবে কাল কি রকম গাইতে পারিস।
