ওর রাগ আর অভিমান লক্ষ করে হাসল জিনি। আমার ওপর রাগ করা অন্যায় হয়ে যাচ্ছে তোমার, অনেকটা স্মরণ করিয়ে দেবার সুরে বলল সে, একবার ভেবে দেখো। ভাল গায়ক হিসেবে তোমার যখন নাম ডাক ছিল তখন রাজ্যের মেয়েরা তোমার পিছনে ছুটত-ভেবে দেখেছ কেমন লাগত তখন আমার? জনির চোখে চোখ রেখে স্পষ্ট করে বলছে জিনি। উদোম শরীরে আমি যদি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতাম, আর রাজ্যের পুরুষরা আমার পিছনে ছুটত-ভেবে দেখেছ, কেমন লাগত তখন তোমার? তুমি ভাল গাইতে পারতে, সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। আমি চাইতাম, মনেপ্রাণে চাইতাম, তোমার গলা যেন নষ্ট হয়ে যায়–তুমি যেন আর গাইতে না পারো। কিভাবে যেন ঠিক তাই ঘটে গো সেজন্যে আমি খুশি হয়েছিলাম। একটু থামল জিনি, তারপর আবার বলল, তবে, এখন তুমি গাইতে পারো না পারো তাতে আমার কিছু এসে যায় না। ওসব আমাদের বিয়ে ভাঙার আগেকার ব্যাপার–এখন আর কিছুতেই কিছু এসে যায় না।
ঘন ঘন ঢোক গিলে গ্লাসটা নিঃশেষ করল জনি। একটুও বুদ্ধি নেই তোমার, ঠাণ্ডা গলায় বলল সে। কিছুই বোঝো না তুমি। ঘুরে দাঁড়াল সে, কিচেনে চলে এল। ফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করল নিনোর নাম্বারে। পাম স্প্রিংসে গিয়ে শনি-রবি দুটো দিন কাটাবার প্রস্তাব শুনে অপরপ্রান্তে আনন্দে লাফিয়ে উঠল নিনো। জনি একটা মেয়ের ফোন নাম্বার দিল তাকে। কুমারী একটা মেয়ে। অদ্ভুত সুন্দর দেখতে। বয়সও কম। গত কয়েকদিন ধরেই তার সাথে যোগাযোগ করার কথা ভাবছিল ও।
নিনোকে বলল, ওই মেয়েই তোর জন্যে একজন সঙ্গিনী যোগাড় করে নিয়ে আসবে। তোর বাড়িতে ঘন্টা খানেকের মধ্যে পৌঁছে যাব আমি।
বিদায় দেবার সময়ও মুখ ভার করে থাকল জিনি। কিন্তু জনিও গম্ভীর হয়ে থাকল, ভদ্রতা দেখিয়ে একটু হাসল না পর্যন্ত। সহজে জিনির ওপর রাগ করে না সে। কিন্তু আজ জিনি সত্যি রাগিয়ে দিয়েছে তাকে। মন থেকে সমস্ত বিষাদ ঝেড়ে ফেলতে চেষ্টা করছে সে। ধ্যেতেরি ছাই, কে কি বলল তাতে কিছুই এসে যায় না তার-শনি রবিবারটা তো চুটিয়ে ফুর্তি করা যাবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বেশি দরকার।
যা আশা করেছিল, পাম স্পিংসে চমৎকার কাটল সময়টা ওখানে নিজের বাড়ি আছে জনির, সেখানেই উঠল চারজন। বছরের এই একটা সময়, যখন বাড়িটাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে খালি রাখা হয়। কাজের লোকেরা তৈরি হয়েই থাকে; জানে, যে কোন সময় বাড়িতে এসে উঠতে পারে মনিব।
মেয়ে দুটো একেবারে কচি, ফলে দারুণ ফুর্তি করা গেল ওদের নিয়ে। এখনও স্বার্থটাকে বড় করে দেখতে শেখেনি ওরা, নিজেদের জন্যে সুবিধে করে নেবার লোভটা এখনও আসন গেড়ে বসেনি মগজে। ডিনারের আগে পর্যন্ত সুইমিং পুলের ধারে বসে সময় কাটাল ওরা। কিছু বন্ধু এসে জুটল ওখানে। তারা বিদায় নেবার পর নিনোও তার সঙ্গিনীকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে এল-সাপারের জন্যে তৈরি হতে হবে। রোদের আঁচ লেগে গরম হয়ে গেছে গা, এই সুযোগে মেয়েটার সাথে খানিকটা প্রেমও করা যাবে।
কিন্তু জনির মেজাজ আজ অন্যরকম। সঙ্গিনীটির নাম টিনা। একমাথা সোনালী চুল তার। মিষ্টি হেসে তাকে শাওয়ারে গোসল করার জন্যে পাঠিয়ে দিল জনি। সময়টা হয়তো ভালই কাটবে, কিন্তু ও জানে, মেয়েটার সাথে জমবে না তার।
ভার্জিনিয়ার সাথে ঝগড়া হলে অন্য মেয়ের সাথে প্রেম করতে পারে না জনি।
বসবার ঘরটা কাঁচ দিয়ে মোড়া। একধারে একটা পিয়ানো ঘরে ঢুকেই কি এক দুর্বার আকর্ষণ অনুভব করল সে, ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সেদিকে। এককালে ব্যাণ্ডে ছিল জনি, গান করত, স্রেফ মজা বা অলস সময় কাটাবার জন্যে পিয়ানো নিয়ে টুংটাং করত। সে সব দিনের কথা কখনও ভুলবে না ও পুরানো গানের সুর তুলত পিয়ানোতে। সে সব সুর কি কোমল আর জ্যোৎস্না মাখা।
ঘরে কেউ নেই, তাই পিয়ানোর টুংটাঙের সাথে দুকলি গাইছে জনি। বরটা নিচু করে রেখেছে, বাড়তে দিচ্ছে না। যে গানের যে কটা ছাড়া ছাড়া কথা মনে গড়ছে বা গলায় আসছে তাই গুন গুন করছে সে, ঠিক গাইছে বলা চলে না তাকে। পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকেছে টিনা, টেরই পায়নি জনি। গ্লাসে মদ ঢালল টিনা, পানি মেশাল-৩ৰু তার উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন নয় জনি। তারপর ওর পাশে এসে বসল টিনা। নিজের অজান্তেই গানটা থেমে গেল জনির। এখন শুধু পিয়ানোয় টুংটাং আওয়াজ তুলছে। তারপর একটা সুর তুলতে শুরু করল। সেই সুরের সাথে গলা মিলিয়ে গুন গুন করছে টিনা।
টিনাকে পিয়ানোর সামনে বসে থাকতে বলে শাওয়ার সারতে চলে গেল জনি। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে কথা বলার মত ভঙ্গিতে আরও কয়েকটা গানের কলি আওড়লি সে। তারপর কাপড়চোপড় পরে নিচে নেমে এসে দেখে টিনা এখনও পিয়ানো সামনে নিয়ে একা বসে আছে তার জন্যে। নিনো বোধহয় সঙ্গিনীকে নিয়ে। ব্যস্ত, অথবা কে জানে, কোথাও বসে হয়তো মদ খেয়ে মাতাল হবার সাধনা করছে।
আবার সেই দুর্বার আকর্ষণ জনিকে টেনে নিয়ে এল পিয়ানোর সামনে। উঠে দাঁড়িয়ে জায়গা ছেড়ে দিল টিনা। ঘরের ভেতর ঘুরছে সে, সুইমিং পুল দেখছে।
পুরানো একটা গান ধল জনি।
একটু অবাকই হলো, কই, গলা তো জ্বালা করছে নাঃ সুরগুলো বেরিয়ে আসছে গলা থেকে, একটু যেন চাপ সুরে, কিন্তু কোথাও এতটুকু অবাঞ্ছিত খাদ নেই, পরিপূর্ণ নিটোল হয়ে বেরিয়ে আসছে আওয়াজ।
