শুক্রবার। জনি ঠিক করল দিনটা আজ ভার্জিনিয়া আর মেয়েদেরকে সঙ্গ দিয়ে কাটাবে। ওখানে যাবার আগে প্রতিবার ফোন করে জানায় সে। আজও তাই করল। এর কারণ, ভার্জিনিয়াকে আপত্তি করার একটা সুযোগ দেয়া। কিন্তু জিনি কখনও আপত্তি করেনি। বিয়েটা ভেঙ্গে যাবার পর কমদিন তো গত হলো না, কিন্তু তবু যখনই মেয়েদেরকে দেখতে যেতে চেয়েছে জনি, সাথে সাথে রাজী হয়েছে জিনি, প্রতিবাদ করেনি। এব্যাপারে জিনিও একটা নীতি মেনে চলে-বাপ তার মেয়েদের দেখতে চাইলে তাতে সেবাধা দেবে না, সে অধিকার নিজেকে সে দেয় না। জিনির কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ উতলা হয়ে উঠল জনির মন। জিনিয়ার মত মেয়ে হয় না, নতুন করে কথাটা স্বীকার করুন আজ আবার। এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করতে পেরেছিল, আজও তার সাথে সব রাখতে পেরেছে, এটা তার নেহায়েত সৌভাগ্য। কিন্তু সে সাথে আবার একথাও ঠিক যে জিনিয়ার সাথে কখনই আর ঘর-সংসার করা সম্ভব নয়। জিনি ওকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারবে না, সেও জিনিকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে পারবে না। দুপক্ষ থেকেই তা আর সম্ভব নয়। তবে যখন পয়ষট্টি বছর বয়স হবে ওদের, সবাই যে বয়সে অবসর নেবার কথা চিন্তা করে, তখন হয়তো দুজনে এক সাথে অবসর জীবনটা কাটাতে পারবে।
কিন্তু তিক্ত বাস্তব মনটাকে শান্ত না করে আরও অস্থির করে তুলল। ওখানে পৌঁছেই টের পেল জনি, জিনিয়ার মেজাজ ভাল নেই। মেয়েরাও বাপকে দেখে আগের মত নেচে উঠল না। তার কারণ, বান্ধবীদের সাথে ক্যালিফোর্নিয়ায় বেড়াতে যাচ্ছে ওরা, শনিরবি দুটো দিন ঘোড়ায় চড়ে কাটাবে সেখানে। জিনির বোধহয় একটু আপত্তি রয়েছে, তাই মুখটা ভার। জনি তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। শেষ পর্যন্ত মায়ের অনুমতি পেল মেয়েরা। জনিও তাদের চুমো খেয়ে বিদায় দিল। মেয়েদের মনের অবস্থা বুঝতে অসুবিধে হয়নি তার। খিটখিটে বাবাকে ফেলে কোন্ ছোট মেয়ে ঘোড়ায় চড়তে না যায়? বিশেষ করে যে বাবা তাদের সাথে থাকে না, নিজের ইচ্ছেমত যায় আসে?
দু ঢোক গিলে গলাটা ভিজিয়ে নিই, জিনিকে বলল জনি, তারপর আমিও বিদায় নেব।
জিনির মেজাজ যে ভাল নেই সেটা তার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। সাধারণত এমন হয় না। মেজাজ যতই খারাপ থাকুক, জনি এলে চেহারাটা হাসিখুশি করে রাখার চেষ্টা করে ও। আজ কিন্তু উল্টোটা ঘটছে। মৃদু গলায় সংক্ষেপে জবাব দিল, আচ্ছা।
মনে মনে স্বীকার করল অনি, যেভাবে জীবন কাটাচ্ছে জিনি, অর্থাৎ যেভাবে জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে, সেটা মোটেও সুখের নয়। সেজন্যে নিজেকে অপরাধী বলে মনে হলো তার।
জনির দিকে তাকিয়ে আছে জিনি। লক্ষ করুল, গ্লাসে কানায় কানায় মদ ঢেলে নিল জনি। একটু বেসুরো গলায় জানতে চাইল সে, তোমার আবার মন খারাপের কি হলো? তুমি যে আবার এত ভাল ব্যবসাও করতে পারবে, স্বপ্নেও ভাবিনি আমি। তোমার তো এখন পোয়াবারো অবস্থা।
ওর দিকে ফিরুল জনি, মৃদু হাসল। টাকা রোজগারটা কোনদিনই তেমন কঠিন কাজ নয়। বলেই বুঝল, জিনির মন খারাপের কাল এটাই–ওর সাফল্য।
মনের মানুষ বা কাছের মানুষ খুব বেশি সাফল্য লাভ করুক, মেয়েরা তা চায় না। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাফল্য ওদের বিরক্ত করে তোলে। বিয়ে, প্রেম, যৌন অভ্যাস এই সব চোখা চোখা অস্ত্র দিয়ে পুরুষদের ওরা কাবু করে রাখতে বেশি পছন্দ করে। পুরুষদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করাটাই ওদের একমাত্র উদ্দেশ্য, সেখানেই ওদের সার্থকতা বলে মনে করে ওরা। সেই পুরুষ যদি খুব বেশি সাফল্যের মুখ দেখে, ওদের মনে অনিশ্চয়তা জেগে ওঠে–ভয় হয়, আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে।
বুদ্ধি করে নিজের দুঃখের কথাটা পাড়ল জনি। দুঃখটা কলজেছেঁড়া হলেও প্রসঙ্গটা তুলল যতটা না সহানুভূতি পাবার আশায়, তারচেয়ে অনেক বেশি জিনির মন ভাল করে দেবার আন্তরিক কামনায়।
কি হবে এসব দিয়ে? বলল জনি। গাইতে পারি না, সেটাই আসল কথা। জিনি, বিশ্বাস করো, আমার আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না। গান ছাড়া আমার অস্তিত্বের দাম কি, বলো?
জিনির চেহারা এবং কণ্ঠস্বরে একরাশ বিরক্তি প্রকাশ পেল। এ আবার কি কথা, জনি? এখনও তুমি কচি খোকা আছ নাকি? বয়স কত হলো খেয়াল আছে? পঁয়ত্রিশ ছাড়িয়ে গেছ। গান? দৃর, ও দিয়ে কি হবে? গাইতে পারো না, তাতে তোমার এত দুঃখ পাবার কি আছে, আমি তো ভেবে পাইনা। ছবির ব্যবসাতে কম টাকা কামাচ্ছ তুমি?
একদৃষ্টিতে জিনির দিকে তাকিয়ে রইল জনি। কয়েক সেকেণ্ড পর বলল, আমি গাইতে ভালবাসি। আমি একজন গায়ক। গান আমার জীবন। তার সাথে বয়স হওয়ার কি সম্পর্ক?
উত্তেজিত হয়ে উঠল ভার্জিনিয়া। কি জানি, বাপু! সত্যি বলছি, আমার কিন্তু কোনকালেই তোমার ওই গান গাওয়া ভাল লাগেনি। তুমি যে ভাল ছথি করতে পারো তা তো প্রমাণ করেই দিয়েছ। আমার কাছে এটাই ভাল মনে হয়। তারপরই ভয়ঙ্কর কথাটা বলল জিনি, তুমি যে আর গাইতে পারো না সেজন্যে আমি খুব খুশি।
মুহূর্তে বিস্ময়ে পাথর হয়ে গেল জনি। তারপরই প্রচণ্ড রাগ হলো তার। কি বললে? এমন একটা বিচ্ছিরি, জঘন্য কথা বলতে পারলে তুমি? আঘাতটা মর্মে গিয়ে লেগেছে ওর। ভেবেই পাচ্ছে না, এমন কথা মুখে আনল কিভাবে জিনি! তাকে জিনি এতটা ঘৃণা করেই বা কিভাবে? কিভাবে তা সম্ভব।
