নিনোকে আরেকবার পরীক্ষা করল জুলস। আজ রাতে এখানে থাকার জন্যে। একজন নার্সকে ডাকছি আমি, বলল সে। আপনি কিন্তু অন্তত দুটো দিন বিছানা ছেড়ে উঠতে পারবেন না। কোন ওজর আপত্তি চলবে না।
আপনি যা বলবেন তাই হবে, ডাক্তার, মৃদু হেসে বলল নিনো। কিন্তু সাবধান, নার্সটা যেন খুব বেশি সুন্দরী না হয়।
টেলিফোনে নার্সের ব্যবস্থা করল জুল। তারপর লুসিকে সাথে করে বিদায় নিল।
খাটের পাশে একটা চেয়ারে বসে রয়েছে জনি, কখন নার্স আসবে তার জন্যে অপেক্ষা করছে।
আবার ঘুম পাচ্ছে নিনোর। চেহারায় ক্লান্তির গভীর ছাপ। একা একা বসে নিনোর বলা কথাগুলো চিন্তা করছে জনি। পাম প্রিংসে এক বছর আগে যা ঘটে গেছে সে ব্যাপারে নিনোর মনে কোন দুঃখ নেই, ঈর্ষা নেই। এটুকু জানে জনি।
কিন্তু জনির মনে সন্দেহটা উঁকিই দেয়নি যে নিনোর মনে ঈর্ষা হতে পারত।
৪.০৫ এক বছর আগের কথা
০৫.
এক বছর আগের কথা।
সিনেমা কোম্পানীর মালিক জনি ফন্টেন। তার সাজানো অফিস কামরায় বিষণ্ণ মনে ব্রসে আছে একাকী। প্রথম ছবিটাই সুপারহিট হয়েছে তার, সাফল্যের শিখরে উঠে এসেছে সে, কিন্তু তবু বেঁচে থাকায় কোন স্বাদ পাচ্ছে না। ভাল লাগছে না কিছুই। সে নিজেই তার প্রথম ছবির নায়ক, সেটায় নিনোরও একটা বিশেষ ভূমিকা আছে। জোয়ারের মত টাকা নিয়ে আসছে ছবিটা। কাজ শেষ করতে কোথাও। কোন উটকো ঝামেলায় পড়তে হয়নি তাকে। শিল্পী, কর্মী, টেকনিশিয়ান সবাই যে যার কাজ সুচারুভাবে শেষ করেছে। খরচও বাজেট ছাড়ায়নি। ছবিটা থেকে সবাই দেদার টাকা কামাচ্ছে, আরও কামাবে, আর সেই সাথে দশ বছর বেড়ে যাবে জ্যাক ওল্টসের বয়স।
আরও দুটো ছবিতে হাত দিয়েছে জনি। প্রথমটার নায়ক নিজেই, কিন্তু দ্বিতীয়টার নায়কের ভূমিকা ছেড়ে দিয়েছে নিনোকে। দর্শকরা পর্দায় দারুণ পছন্দ করেছে ওকে। আর যাই হোক, চেহারাটা খাসা, ঠিক যেন পাকা আপেল, এমন নেশায় পাওয়া মিষ্টি চেহারার নায়কদেরকেই তো বুকে জড়িয়ে ধরতে ভালবাসে মেয়েরা। নিনোর চেহারায় অদ্ভুত একটা সরলতাও আছে, ঠিক যেন হারিয়ে যাওয়া ছোট ছেলে জনির কপালই ভাল, হাতটা যেন পরশ পাথর হয়ে উঠেছে, ধুলো ভুলেও সোনা হয়ে যাচ্ছে ঘরে টাকা আসার কোন বিরাম নেই। ওদিকে ব্যাংকের মাধ্যমে গড ফাদারও নিজের ন্যায্য ভাগ ঠিক মত পেয়ে যাচ্ছেন। এ আরেক আনন্দের ব্যাপার। গড ফাদার তার ওপর এতটা বিশ্বাস রাখেন, সে-বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পেরে. জনিও গর্বিত। কিন্তু এসব স্মরণ করেও মনটাকে আজ বশ মানাতে পারছে না ও।
আজ সে একজন সফল, সার্থক, স্বাধীন চিত্র-প্রযোজক। গাইয়ে হিসেবে যত প্রতিপত্তি ছিল, তার সমান নয়, আরও অনেক বেশি খ্যাতি অর্জন করেছে সে ছবি তৈরি করে। গলা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় যা কিছু হারিয়েছিল, তার সবই ফিরে এসেছে তার হাতের মুঠোয়। সুন্দরী মেয়েরা আবার তার পিছু নিয়েছে, একজন দুজন নয়, ঝাঁকে ঝাকে। কে কার আগে তার গায়ে আছড়ে পড়তে পারে তারই যেন। প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে ওদের ভেতর। আগেও এমন হয়েছে, কিন্তু সেবার কারণটা ছিল ওর ওপর ভক্তি। এখন তা নয়। এখনকার ব্যাপারটা আরও অনেক বেশি বৈষয়িক।
নিজে ব্যবহার করার জন্যে প্লেন কিনেছে জনি। রাজ-রাজড়াদের মত জীবন কাটায়, বিলাসিতার সমস্ত স্বাদ উপভোগ করছে। ইনকাম ট্যাক্স-এর ব্যাপারে আজকাল নানা ধরনের সুবিধে পায় সে আগে যা কখনও পেত না। তাহলে মন খারাপের কি হলো জনির?
কোন কারণ নেই, তবু মন খারাপ, ব্যাপারটা তা নয়! মাথার সামনের দিকে, কপালে ব্যথা অনুভব করছে সে। নাকের ভেতর নালিগুলোতে যন্ত্রণা। আর গলা খুস খুস। এই গলা খুস খুস ভাবটাই সবচেয়ে বেশি জ্বালাচ্ছে তাকে। ওটা চুলকে আরাম পাবার একমাত্র উপায় গান গাওয়া। কিন্তু কিভাবে গাইবে জনি? সাঙ্ঘাতিক ভয় করে তার। ডাক্তার জুলস সীগলকে ফোন করে জানতে চাইল, কবে নাগাদ গাইতে পারব, ডাক্তার?
উত্তরে জুলস জানাল, যখন ইচ্ছে গাইতে পারেন আপনি।
সাহস পেয়ে গাইতে চেষ্টা করল জনি। চেষ্টা না করলেই ভাল ছিল। গাধার মত হেঁড়ে সুর বেরুল গলা থেকে, নিজের কণ্ঠস্বর বলে চিনতেই পারুল না ও। চোখে পানি এসে গেল তার। খানিক চেষ্টা করার পর হাল ছেড়ে দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল মদের বোতলের দিকে। তার পরদিন সে কি ব্যথা গলায়। আঁচিলগুলো চেঁছে ফেলে দেবার আগে যে-ধরনের ব্যথা অনুভব করত এটা সে-ধরনের নয়, অন্যরকম। এতে জ্বালা ভাবটা বেশি, যেন কাটা ঘায়ে লবণের ছিটে পড়েছে। ভয়ানক একটা আশঙ্কা ছিল মনে গলাটা বোধহয় আর কোনদিন ভাল হবে না। কিন্তু অপারেশনের পর সেইদিন প্রথম গাইতে চেষ্টা করে পরিষ্কার বুঝল জনি, গলাটা তার চিরকালের জন্যে গেছে।
গানই তো ছিল তার জীবন। গান ছাড়া আর কি জিনিস আছে যাকে সে ভালবেসেছে? সেই গানই যদি গাইতে না পারে, কি লাভ বেঁচে থেকে? সাফল্য, টাকা, খ্যাতি-গাইতে না পারলে এসবের এক পয়সাও দাম নেই। অন্তর দিয়ে একটা কাজই করতে পারত জনি, করেছেও তাই–গান। একটা বিশেষ ধরনের গান গাইত সে, সে বিষয়ে দুনিয়ায় তার চেয়ে ভাল আর কেউ কিছু জানে না। এতদিন ভাল বোঝেনি, কিন্তু আজ গলা হারিয়ে টের পায় কত ভাল গাইত সে। দীর্ঘ অনেক। বছরের অভিজ্ঞতা, শেষদিকে খাঁটি পেশাদার শিল্পী হয়ে উঠেছিল সে। কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল তা জিজ্ঞেস করতে হত না কাউকে, ও নিজেই সব বুঝতে পারত। চর্চা করে যখন গলাটাকে শানিয়ে নিয়ে এসেছে, ঠিক তখনই সেটা নষ্ট হয়ে গেল। মাঝে মাঝে আশ্চর্য হয়ে ভাবে জনি, এখনও সে আত্মহত্যা করেনি কেন? এতবড় দুঃখ কিভাবে সহ্য করছে সে? এ যে কি ক্ষতি, কত বড় ক্ষতি, কাউকে তা বলে বোঝাতে পারবে না সে।
