তাই বাধ্য হয়ে একজন লোক রাখতে হলো আমাকে, টেলিফোন এলে সেই কথা বলত। রোগীকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম আমি। সব পরীক্ষা শেষ হবার পর রোগী যখন অপারেশনের জন্যে তৈরি, তার স্বামীকে ডেকে পাঠিয়ে দুমিনিট কথা বলার সুযোগ করে দিতাম। জানাতাম, এটাই টার্মিনেল, মানে শেষ চেষ্টা। কিন্তু আমারা কথা শুনতেই পেত না ওরা। মানেটা যে বুঝতো না তা নয়, বিশ্বাস করত না। প্রথমদিকে মনে করতাম, বোধহয় শুনতে পায়নি। ভাবতাম, কথাটা বলার সময় নিজের অজান্তেই হয়তো গলাটা খাদে নেমে গিয়েছিল।পরের দিকে তাই স্পষ্টভাবে, গলাউ জোর এনে উচ্চারণ করতাম। উঁহু, তবু শুনতে পেত না ওরা। এক লোক তো আমাকে ধমকই মেরে বসল, কি যা-তা বকছেন, জার্মিনেল আবার কি? হাসছে জুলস। তা সে জার্মিনেলই হোক, আর টার্মিনেলই হোক, কিছু কি এসে যায়? যায় না। ওরা মরবেই, ওদেরকে বাঁচাবার সাধ্য আমার নেই। তাই, গর্ভপাত শুরু করলাম। একেবারে পানি মত সহজ কাজ, কেউ এখানে ভুল বোঝে না, বরং সবাই মহাখুশী। বাসন-পেয়ালা ধুয়ে সিঙ্ক সাফ করে রাখার মত, অল্পেই ঝামেলা মুক্ত হওয়া যায়। প্রথম থেকেই ভাল লেগে গেল কাজটা। গর্ভপাতক হওয়া বেশ মজারই তো ব্যাপার, অস্বীকার করব কেন? দুমাসের ভ্রূণ, ওকে আমি জ্যান্ত মানুষই বলি না। তার মানে, বিবেকের দিক থেকে আমার কোন সমস্যা ছিল না। কম বয়সী মেয়েরাই বেশি আসত, সবাই অবিবাহিতা। আবার বিবাহিত মেয়েরাও আসত, এদের বয়স বেশি। ওদের সবাইকে আমি সাহায্য করছিলাম, সেই সাথে দুহাতে টাকাও কামাচ্ছিলাম। কিন্তু কাজটা করতে গিয়ে কিছুটা সম্মান হারাতে হয়েছিল আমাকে। প্রথম সারি থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাই যখন ধরা পড়লাম, মনে হলো যেন ফেরারী আসামীকে ধরে আনা হলো। কিন্তু আমার কপালটা বরাবরই ভাল, এবারও কিভাবে যেন ছাড়া পেয়ে গেলাম। আমার এক বন্ধু সুপারিশ করল তাতেই কাজ হলো। তবে, এখন আমি কোন বড় হাসপাতালে কাজ করার সুযোগ পাই না। সেজন্যই আজ আমাকে এখানে দেখতে পাচ্ছেন আপনারা। আবার আমি নিজের স্বভাব মত সবাইকে সৎ পরামর্শ দিচ্ছি, কিন্তু আমার কথা কেউ কানেই তুলছে না। ঠিক সেই আগের অবস্থা, কিছুই বদলায়নি।
আমাকে ভুল বুঝছেন আপনি, বলল জনি। আপনার পরামর্শ কানে তুলছি না, এ-কথা ঠিক নয় ভেবে দেখছি এখনও।
অনেকক্ষণ পর আবার কথা বলল লুসি, এবার প্রসঙ্গ বদলাবার জন্যে। জনির দিকে ফিরল সে, বলল, এই, জনি, ভেগাসে কেন এসেছ তা তো বললে না? ছুটি নিয়ে, নাকি কাজে?
মাইকেল কেন যেন আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছে, বলল জনি। আজ রাতের প্লেনেই আসছে ও। সাথে টমও থাকবে। টেলিফোনে টম বলল, সে তোমার সাথেও দেখা করবে। ব্যাপারটা কি, কিছু জানো না কি?
আমি শুধু জানি কাল রাতে আমরা সবাই এক সাথে বসে ডিনার খাব, বলল লুসি। ফ্রেডিও থাকবে আমাদের সাথে। সম্ভবত হোটেলের কোন ব্যাপারে আলোচনা। শুনছি, ক্যাসিনো নাকি লোকসান দিচ্ছে, অথচ প্রচুর লাভ হবার কথা। গড ফাদার বোধহয় মাইকেলকে খোঁজ নিতে পাঠাচ্ছেন।
শুনলাম মাইক নাকি তার মুখটাকে মেরামত করিয়েছে, বলল জনি।
অনেক জেদাজেদি করে কে-ই বোধহয় রাজী করিয়েছে ওকে, বলল লুসি। বিয়ের সময় সবাই অত করে বলল, কই, রাজীই হলো না। কে জানে কেন! নাক দিয়ে সব সময় সর্দি গড়াত, কি বিচ্ছিরি! আরও আগে সারিয়ে নিলেই পারত। একটু থেমে জনির দিকে তাকাল লুসি, বলল, অপারেশনটার জন্যে কর্লিয়নি পরিবার থেকে ডাকা হয়েছিল জুলসকে। কনসালট্যান্ট হিসেবে।
আমিই তো ওর নামে সুপারিশ করেছিলাম।
তাই? জানতাম না তো। সে যাই হোক, মাইক নাকি জুলসের জন্যে কিছু করতে চায়। সেজন্যেই ডিনারে ডেকেছে আমাদের।
মাইকেলের কথা বলছ? বলল তুলস। কারও ওপর বিশ্বাস নেই ওর। শ্রামাকে অনুরোধ করেছে, আমি যেন সবার ওপর চোখ রাখি। ওর অপারেশনটা কিন্তু একেবারে সাদামাঠা ব্যাপার ছিল। যে-কোন সার্জন করতে পারত।
পাশের শোবার কামরা থেকে একটা শব্দ ভেসে এল। সবাই একযোগে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল পর্দার দিকে।
আবার জ্ঞান ফিরে পেয়েছে নিন। কামরায় ঢুকে খাটের ওপর তার পাশে বসল জনি। ক্ষীণ, দুর্বল ভাবে একটু হাসল নিনো। বলল, চিন্তার কিছু নেই, আমি আর অবাধ্য হব না। সত্যি, শরীরটা খুব খারাপ লাগছে রে। কথা শুরু করে নিনোর আর থামার লক্ষণ নেই, বকবক করে চলেছে সে, এই, জনি, মনে আছে তোর? সেই যে বছর খানেক আগে পাম স্প্রিংসে গিয়েছিলাম দুটো মেয়ের সাথে? মন থেকে বলছি, সেদিন ওখানে যা ঘটেছিল আমার তাতে দুঃখ হয়নি। বিশ্বাস কর, একটুও হিংসা হয়নি আমার। যীশুর কিরে, খুশিই হয়েছিলাম আমি। তুই আমার কথা বিশ্বাস করছিস তো?
করছি, অবিশ্বাসের সুরে বলল জনি।
মুখ চাওয়াচাওয়ি করল জুলস। এ কি শুনছোরা? জনি ফন্টেন, বিখ্যাত জনি ফন্টেন তার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুর কাছ থেকে মেয়ে ভাগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল?. এ যে একেবারেই অবিশ্বাস্য, অসম্ভব ব্যাপার জনিকে চেনে ওরা, ওর সম্পর্কে শুনেছেও। অনেক কথা, তারপরও এমন অকল্পনীয় একটা অভিযোগ ওরা বিশ্বাস করে কিভাবে? অথচ, অভিযোগটা মিথ্যেও হতে পারে না, নিনো ভ্যালেন্টি তো আর নির অনুপস্থিতিতে কথাটা বলছে না। এর মধ্যে আরও একটা বিস্ময়কর ব্যাপার রয়েছে। যা ঘটে গেছে, ঘটে গেছে, ঝাড়া এক বছর ধরে সে-কথা মনেই বা রেখেছে কেন নিনো? তবে কি এক বছর আগে সেই মেয়েটা তাকে ছেড়ে চলে যাবার দুঃখ আজও ভুলতে পারেনি সে?, সেজন্যে কি জীবনের ওপর এত বিতৃষ্ণা তার, সেই বিতৃষ্ণার কারণেই কি দেদার মদ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করছে ও?
