এতক্ষণে একটু গম্ভীর হলো জুলস। কয়েক সেকেও চুপ করে থাকার পর আবার বলল, হবিটা হলো মানুষকে আমি বাঁচিয়ে রাখতে চাই। মি. নিনোকে আপনি মদ দিলেনই, আমিও তেমন কড়া ভাবে নিষেধ করলাম না, কারণ ওঁর অবস্থা কতটা খারাপ সেটা আমি আপনাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চেয়েছিলাম। হঠাৎ জনির দিকে ঝুঁকে পড়ল সে, চেহারা এবং কণ্ঠস্বর আবার আগের মত সংযত আর শান্ত হয়ে এসেছে তার। মন দিয়ে শুনুন, মি. জনি ফন্টেন। আপনার বন্ধুর প্রায় হয়ে এসেছে। কি বলছি বুঝতে পারছেন? উপযুক্ত চিকিৎসা আর কড়া ডাক্তারি নিয়মে ওর যদি সেবা যত্ন করতে পারেন তবেই একটা সুযোগ পাবেন তিনি, তা না হলে কোন আশাই নেই। ব্লাড প্রেশার, তার ওপর ডায়াবিটিস, তারপর বদভ্যাসগুলো একটাও তিনি ছাড়ছেন না–দেখবেন, বলে রাখছি, মগজটা সে ফেটে যাবে ওঁর। জুলসের ভাবলেশহীন চেহারায় একটু অসহায় ডাব ফুটে উঠল। এর চেয়ে পরিষ্কার করে অরি কি বলব? তা, বলেছি, পাগলা গারদ বলেছি। না বলে উপায় ছিল? না বললে আপনার টনক নড়ত? এবার আরও সোজা করে বলছি, বন্ধুকে যদি সত্যি ভালবাসেন, ওঁকে পাগল সাব্যস্ত করে কোথাও বন্দী করার ব্যবস্থা করুন, তবেই যদি ওঁকে বাঁচাতে পারেন। তা না হলে ওঁর গালে চুমু খেয়ে ধরা গলায় বলুন-বন্ধু বিদায়!
জুলস থামতেই ফিস ফিস করে কলল লুসি, গুরুত্বটা বুঝিয়ে দিলেই তো হলো, জুলস। এত কড়া কথা বলার দরকার কি?
উঠে দাঁড়াল জুলস। এতক্ষণে শান্ত ভাবটা অদৃশ্য হয়ে গেছে চেহারা থেকে। ব্যাপারটা লক্ষ করে আশ্চর্য একটা সন্তুষ্টি বোধ করুল জনি ফন্টেন। জুলসের ওই প্রশান্ত ভাবটাই তো যত রাগের কারণ তার! লোকটাকে খেপিয়ে দিতে পেরে আপন মনে হাসছে সে এখন।
আপনার বুঝি ধারণা, এই রকম একটা পরিস্থিতিতে এই প্রথম আপনার-মত একজন লোককে এই ধরনের কথা বলছি আমি? জী মা, বোকার দল দুনিয়ায় কয় নেই, আর আমাকেও রোজ এই সব কথা বারবার করে বলতে হয়। কড়া কথা বলতে নিষেধ করছে লুসি–কি যা-তা বকছে তা ও নিজেই জানে না। শুনুন তাহলে। সবাইকে কি বলতাম জানেন? বলতাম, অত খেয়ো না, মারা যাবে, অত খেটো না, মারা যাবে, অত ধোয়া গিলো না, মারা যাবে; অত মদ খেয়ো না, মারা যাবে কেউ কানেই তোলে না আমার কথা। কারণ কি, জানেন? কারণ কালকেই মরবে একথা বলি না ওদেরকে। কিন্তু মি. নিনোর ব্যাপারে কোন দ্বিধা না করেই বলতে পারি, ও যদি আগামীকালই মারা যায় আমি মোটেও আশ্চর্য হব না।
কাঁধ ঝাঁকাল জুলস, এগিয়ে গেল বার-এর দিকে, নিজের গ্লাসে আরও একটু হুইস্কি ঢালল সে। তারপর আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকাল জনির দিকে। কি ঠিক করলেন, মি. ফন্টেন? পাগল সাব্যস্ত করবেন বন্ধুকে?
ঠিক বুঝতে পারছি না।
কি জানেন, একজন মানুষ ধূমপানের ফলে মরতে পারে, বেশি খাটাখাটনির ফলে মরতে পারে, মদ খেয়ে মরতে পারে, এমনকি বেশি বেশি খেয়েও মরতে। পারে। এগুলো সম্ভব। কিন্তু ডাক্তারির দিক থেকে একটা জিনিস সম্ভব নয়। সেটা কি জানেন? রমণ করে করে মরা। কেউ রমণ করতে করতে মারা গেছে, ডাক্তারি শাস্ত্র এ-কথা স্বীকার করে না অথচ ওটার বেলাতেই সবার যত আপত্তি। মদের গ্লাসে চুমুক দিল জুলস। কিন্তু সে হলো পুরুষদের বেলায়। মেয়েদের বেলায় তাতেও। বিপদ। এমন অনেক মেয়ে আসতো আমার কাছে যাদের আর ছেলেপুলে হবার কথা নয়। বলতাম, এবার হওয়াতে বিপদ আছে জামাতাম, খুব বেশি ঝুঁকি আছে, আপনি মারা যেতে পারেন। সেই মেয়েই মাসখানেক পর আবার আমার। কাছে এসে হাজির। একমুখ হাসি নিয়ে আমাকে শোনাত ডাক্তার, ফের বোধহয় আমি অন্তঃসত্ত্বা। ঘটলও তাই। রাগ চেপে বলতাম কিন্তু এতে যে নেক ঝুঁকি। তখনকার দিনে গলার সুরে আমার ভাব প্রকাশ পেত। কিন্তু মেয়েগুলো। নির্লজ্জের মত হাসত, কলত, কিন্তু আমরা যে গোঁড়া ক্যাথলিক।
নক হলো দরজায়। চাকা লাগানো ট্রেতে খাবার আর কফি নিয়ে কামরায় ঢুকল দুজন ওয়েটার। একটা পোর্টেবল টেবিলের ভাঁজ খুলে সেটাকে দাঁড় করল তারা, খাবার সাজিয়ে দিয়ে চলে গেল। গরম স্যাণ্ডউইচ আর ধূমায়িত কফি শেষ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল জনি। একটা সিগারেট ধরাল। জুলসের দিকে তাকিয়ে বলল, তার মানে, আপনি মানুষের প্রাণ বাঁচাবার চেষ্টা করেন, কিন্তু গর্ভপাত ঘটানো তো ঠিক তার উল্টো ব্যাপার, সেটা করতেন কিভাবে?
মেয়েরা বিপদে পড়লে জুলস শুধু তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করত, এই প্রথম মুখ খুলল লুসি। তা নাহলে ওরা যে আত্মহত্যা করে বসবে। অথবা নিজেরাই ভ্রূণ নষ্ট করতে গিয়ে সাঙ্ঘাতিক কিছু একটা ঘটিয়ে বসবে… জুলস ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে দেখে চুপ করে গেল লুসি।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল জুলস। উহু, ব্যাপারটা অত সহজ নয়, বলল সে। যাই হোক, অবশেষে সার্জন হলাম আমি। একজন খেলোয়াড়কে যেমন বলা হয়, ভাল খেলে, আমাকেও তেমনি বলা হত খুব ভাল কাটা-চেরা করে। বড়াই করছি না, আমার হাত সত্যি খুব ভাল, এতই ভাল যে আমি নিজেই ভয় পেতাম। এক হতভাগার পেট কেটে সাথে সাথে বুঝে ফেললাম, তার আর কোন আশা নেই। বাঁচবে না। অপারেশন করতাম ঠিক, কিন্তু মনে মনে জানতাম, টিউমার বা ক্যানসারটা আবার গজাবে। তবু একমুখ হেসে, একরাশ মিথ্যে সান্তনা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিতাম তাকে। ক্যানসার বাধিয়ে হয়তো এক বেচারা মেয়ে এল, তার একটা স্তন কেটে ফেলে দিলাম। পরের বছর আবার এল সে। এবার দ্বিতীয় স্তনটা কেটে বাদ দিলাম। এক বছর পর আবার আসবে ওই মেয়ে, জানতাম। এলও তাই। এবার পেঁপের ভেতর থেকে যেভাবে বিচি চেঁছে বের করে দেয় সেভাবে ওর বুক থেকেও পচামাংস চেঁছে বের করে দিলাম। এতসব করছি কিন্তু অযধা, মরে যে যাবে সে তো আর অজানা কোন ব্যাপার নয়। ওদিকে ওদের স্বামী দিনে অমন হাজারবার টেলিফোন করে জানতে চায়, ডাক্তার সাহেব, টেস্ট থেকে কি বোঝা গেল?
