অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকান জনি। উঠে দাঁড়িয়ে বার-এর দিকে এগোচ্ছে। পিছন থেকে মৃদু গলায়, উদাসীন ভঙ্গিতে বলল জুলস্, আমি কিন্তু বলেছি, ওসব খাওয়া উচিত নয় ওর।
কেন কে জানে, জুলসকে দেখলেই মেজাজ বিগড়ে যায় জনির। লোকটার চেহারা, হাবভাব, কথাবার্তা কিছুই ওর ভাল লাগে না। তার একটা কারণ সভবত এই হতে পারে যে যত গুরুতর ব্যাপারই হোক না কেন, লোকটা কখনও উত্তেজিত হতে জানে না। গলার সুরটা সব সময় শান্ত, ভাষাটা আশ্চর্য নিরপেক্ষ, যেন কিছুতেই কিছু এসে যায় না ওর। কাউকে যদি সাবধান করে দেবার ইচ্ছে হয়, নিজের মতামতটাই শুধু জানায়, অনুরোধ বা নির্দেশের সুরে কিছু বলে না। লোকটার এই নির্লিপ্ত ভাবটাই সহ্য করতে পারে না ও। নিনোর মদ খাওয়া উচিত নয়, কথাটা এমন সুরে বলল যে গুনেই একটা জেদ চেপে গেল ওর। ভেবেছিল সামান্য একটু মদ ঢেলে দেবে নিনোকে, কিন্তু তা না করে পুরো গ্লাস ভর্তি করে হুইস্কি আনল সে। গ্লাস্টা নিনোর হাতে ধরিয়ে দেবার আগে জুলসের দিকে তাকাল একবার, জানতে চাইল: বলো, ডাক্তার। এটুকু খেলে নিনো ভ্যালেন্টি কি মারা। যাবে?
না, তা যাবে না, শান্তভাবে বলল জুলস।
কামরার ভেতর একটা উত্তেজনা বেড়ে উঠছে, টের পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল লুসি। জুলসের দিকে ফিরে কি যেন বলতে গিয়েও চুপ করে গেল সে। ইতিমধ্যে গ্লাসের মদটুকু গলায় ঢেলে দিয়েছে নিনো।
আপন মনে হাসছে জনি। তার ধারণা, ডাক্তার ব্যাটাকে উচিত শিক্ষা দেয়া গেছে।
হঠাৎ ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলল নিনো। লাল মুখটা নীল হয়ে গেছে তার। নিবাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে। তারপর মাছের মত লাফিয়ে উঠল তার শরীরটা। চোখ দুটো কোটছেড়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। দ্রুত উঠে দাঁড়াল স্কুল, ঘুরে খাটের আরেক দিকে চলে গেল। নিনোর গলাটা এক হাত দিয়ে পেচিয়ে ধরুল ও, তারপর কাঁধ আর গলার মাঝখানে দক্ষ হাতে একটা ইঞ্জেকশন পুশ করুন। সাথে সাথে ওর আলিঙ্গনের মাঝে স্থির হয়ে গেল নিনো। ধীরে ধীরে তাকে বালিশের উপর শুইয়ে দিল জুল। চোখ দুটোয় ঘুম নেমে আসছে নিনোর, বন্ধ হয়ে গেল। পাতা দুটো।
নিঃশব্দ পায়ে বসার ঘরে ফিরে এল ওরা তিনজন। মস্ত কফি টেবিলটাকে ঘিরে বসল। হাত বাড়িয়ে হালকা নীল টেলিফোনের রিসিভারটা তুলে নিল লুসি, স্যান্ডউইচ আর কফির অর্ডার দিল ও। নিঃশব্দে আবার উঠে দাঁড়াল জনি, বার-এর দিকে এগিয়ে যাবে। একটা হুইঞ্চি ঢালল, তাতে অল্প একটু পানি মেশাল। তারপর দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকাল জুলসের দিকে। আপনি জানতেন হুইস্কি খেলে নিনো অসুস্থ হয়ে পড়বে? তীব্র গলায় জানতে চাইল সে।
শ্রাগ করল জুলস। আশঙ্কা করেছিলাম।
তাণে সাবধান করেননি কেন আমাকে? বাধা দেননি কেন?
দিয়েছিলাম। আপনি কানে তোলেননি, মৃদু গলায় বলল জুলস।
অনেক কষ্টে মেজাজ সংযত রেখেছে জনি। কিন্তু ওর চেহারা দেখে রাগের প্রচণ্ডতা টের পেতে অসুবিধে হচ্ছে না কারও। বলল, ওকে সাবধান করা বলে? আশ্চর্য মানুষ তো আপনি! একজন ডাক্তারের কাছ থেকে এমন আচরণ আশা করি না আমি। কিছুতেই যেন কিছু এসে যায় না আপনার, তাই কি? নিনোকে পাগলা গারদে পাঠাতে বললেন, কেন স্যানাটোনিয়াম বা ওই ধরনের কোন ভাল শব্দ উচ্চারণ করতে পারতেন না? মানুষের আঁতে ঘা দিয়ে কথা বলতে খুব ভাল লাগে বুঝি আপনার?
হাত দুটো কোলে ফেলে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে আছে লুসি।
কিন্তু জুলসের মধ্যে ভাবের কোন পরিবর্তন নেই। জনির দিকে তাকিয়ে আছে সে। হাসছে। হাসতে হাসতেই বলল, আরও কড়া ভাবে নিষেধ করলেও আপনাকে ঠেকানো যেত না, মদটুকু আপনি মি. ভ্যালেন্টিকে দিতেনই। আমাকে আপনি কেয়ার করেন না, এটা প্রমাণ করার জন্যে আপনি একেবারে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। আপনি বিখ্যাত জনি ফন্টেন, সবাই আপনাকে তোয়াজ করে, ওই জিনিসটা পাবার একটা লোভ জন্মে গেছে আপনার মধ্যে। জানি, আপনার সাথে আমার ভাল বনিবনা হবে না। তাই আপনার এই গলার ব্যাপারটার পর আপনি যখন আপনার ব্যক্তিগত ফিজিশিয়ানের পদে চাকরি দিতে চাইলেন আমাকে, হেসেই উড়িয়ে দিলাম প্রস্তাবটা, গ্রহণ করার কথা একবার ভেবেও দেখলাম না। আসল কথা কি জানেন? আপনি বিখ্যাত হতে পারেন, কিন্তু একজন ডাক্তারের বিখ্যাত হবার দরকার করে না। ডাক্তার মনে করে সে একজন গড, আধুনিক সভ্যতার মহাপুরোহিত-তার কাজের ওটা একটা পুরস্কার। কিন্তু আপনি আমার সাথে সেরকম আচরণ করবেন না। আপনার চাকরি করলে আমাকে হতে হত পা-চাটা গড। হলিউডে ওরাই তো আপনাদের দেখাশোনা করে। কোত্থেকে জোগাড় করেন ওদেরকে, বলুন তো? খ্রীস্ট, আসলেই কি ওরা কিছু জানে না, নাকি অবহেলা করে? জানে না একথা আমি বিশ্বাস করি না। মি. নিনোর অবস্থা যে হয়ে এসেছে নিশ্চয়ই জানে ওরা। কিন্তু সত্যিকার চিকিৎসার ধার দিয়ে না গিয়ে ওঁকে শুধুমাত্র। খাড়া করে রাখার জন্যে একের পর এক ওষুধ খাইয়ে যাচ্ছে। গায়ে শিল্কের কোট চাপিয়ে ওরা সবাই আপনাদের পা চাটে। আপনারা ফিল্ম লাইনের কেউকেটা কিনা, সাংস্কৃতিক জগৎটাকে উদ্ধার করছেন, দুনিয়ার সব ব্যাপারেই আপনাদের স্বচ্ছ ধারণা আছে, তাই ওই খুনেগুলোকে মনে করেন মুশকিল আসান, বিপদের একমাত্র বন্ধু, পরম ত্রাতা। আসলে যে ওরা আপনাদেরকে স্লো পয়জন করছে সে-কথা একবারও কেউ ভেবে দেখেন না। ওদেরকে ডেকে পাঠিয়ে বলেন, শো বিজনেন, ডাক্তার, ক্ষমা ঘেন্না করে কড়াকড়ি একটু শিথিল করো! ঠিক বলিনি? আসলে আপনারা মরলেন কি বাচলেন তাতে ওদের কিছুই এসে যায় না। আমার ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। আমার আবার একটা বাজে হবি আছে। অনেকের কাছে সেটা হয়তো ক্ষমার যোগ্য নয়?
