দু চোখে নগ্ন অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে আছে কে। কিন্তু তা কি করে হয়? ধরো সমাজের সবাই আমরা যদি এই কথা বলি, ফল কি দাঁড়াবে? সমাজটা তাহলে টিকবে কিভাবে? উত্তর দাও। আমরা সবাই কি তাহলে গুহাবাসীদের যুগে ফিরে যাব না? উহু, এ অসম্ভব। কথার কথা, তাই না? আসলে যা বললে তা নিজেও তুমি বিশ্বাস করো না, তাই না, মাইক? বিশ্বাস করো?
হাসিতে ভরে উঠল মাইকেলের মুখ। আমার বাবা কি বিশ্বাস করেন তাই নিয়ে কথা বলছিলাম। তোমাকে আমি শুধু এইটুকু বোঝাতে চাই যে বাবাকে তুমি আর যাই মনে করে, দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে মনে কোরো না–তা তিনি নন। অন্তত তার নিজের তৈরি সমাজে না। মোটেও তিনি একদল উন্মাদ মেশিনগানধারী খুনে গুণ্ডাদের পাণ্ডা নন। তাঁর সম্পর্কে এসব তোমার একেবারেই বাজে চিন্তা। আমার বাবার মত দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ আমি আর দেখিনি।
বেশ বুঝলাম, শান্ত গলায় বলল কে। কিন্তু নিজের ব্যাপারটা তুমি এড়িয়ে যাচ্ছ কেন? তোমাকে নিয়েই তো আমার মাথাব্যথা। তুমি কিসে বিশ্বাস করো সেটা আমাকে জানতে হবে।
আমি তোমাকে বিশ্বাস করি, কল মাইকেল। তুমি আর আমি মিলে একটা পরিবার গড়ে তুলতে পারি, আমার বিশ্বাস ট্রোর ওপর। যদি বিশ্বাস করতাম এই সমাজ আমাদেরকে রক্ষা করবে তাহলে হয়তো ভাল হত। কিন্তু সমাজের ওপর আমার আস্থা নেই। ভাওতা আর ধোকা দিয়ে একদল লোকের ভোট যোগাড় করতে পারাটাই যাদের একমাত্র কৃতিত্ব তাদের ওপর আমার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে আমি রাজী নই। আমাকে ভুল বুঝে না। যা বলছি তা শুধু এখনকার পরিস্থিতির কথা ভেবেই বলছি। পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, আরও বদলাবে। আমার বাবার কাল এই তো শেষ হয়ে গেল। অনেক বিস্ময়কর কাজ শেষ করেছেন তিনি, কিন্তু ভয়ঙ্কর সব ঝুঁকি না নিয়ে সে-ধরনের কাজ এখন আর করা ব নয়। আমরা চাই বা না চাই, একদিন প্রচলিত সমাজেই ঢুকতে হবে কর্লিয়নি পরিবারকে। কিন্তু বাবার মত আমারও ইচ্ছ, যখন কবে অগাধ ক্ষমতার অধিকারী হয়েই ঢুকবে। তার মানে আগে আমাদেরকে কোটি কোটি টাকা আর সয়সম্পত্তি, শ্রদ্ধা আর সম্মান অর্জন করতে হবে। দশজনের দলে ভিড়ে সবার নিয়তির সাথে নিজেদেরকে এক সুতোয় গেঁথে নেবার আগে আমি চাই আমার সন্তানেরা যতটা পারা যায় সচ্ছল আর ক্ষমতাবান হয়ে উঠুক।
কিন্তু আমি অন্তত জানি প্রচলিত সমাজের বাইরে তুমি কোনদিন ছিলে না, বলল কে। যেহায় যুদ্ধে গেছ তুমি। দেশের জন্যে লড়াই করে বীর খেতাব পেয়েছ। হঠাৎ তুমি সমাজের হাত গলে পরিবারের মুঠোয় গিয়ে পড়লে কিভাবে? কি এমন ঘটল যে এতটা বদলে গেলে তুমি?
এসব আসলে সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছু নয়, বলল মাইকেল। তোমাদের গাঁ গ্রামে গোড়া কিছু রক্ষণশীল মানুষ আছে, আমি হয়তো তাদেরই একজন। নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ সবচেয়ে আগে দেখি। একটু ভাবনা, বুঝতে পারবে কোন সরকারই তার নাগরিকদের জন্যে তেমন কিছু করে না, কিন্তু তাও আসলে সত্যি নয়। তোমাকে শুধু একটা কথা জানাতে পারি-বাবা আমার সমর্থন পাবেন। তার পক্ষ নিতে হবে আমাকে। আর তোমাকেও সিদ্ধান্ত নিতে হবে তুমি আমার পক্ষ নেবে কিনা। হাসছে মাইকেল। বিয়ে করার প্রস্তাবটা এখন আর তেমন সুবিধের মনে হচ্ছে না, তাই কি?
বিছানার ওপর হাত দিয়ে চাপড় মারুল কে। বিয়ের কথা জানি না। ধৈর্য হারিয়ে চেঁচিয়ে উঠল সে। বিয়েটা বিয়ে নাকি মরণ তাতে আমার কিছুই এসে যায় না। আমি শুধু জানি দুদুটো বছর পুরুষমানুষ ছাড়া জীবন কাটিয়েছি-এখন যত পাঁয়তারাই কষো, সহজে তোমাকে আমি ছাড়ছি না। অ্যাই, স্বার্থপর, এদিকে এসো। কি হলো! এলে!
আলো নিভিয়ে বিছানায় গেল আবার ওরা। মাইকেলের কানে ঠোঁট ঠেকিয়ে ফিস ফিস করে কথা বলছে কে। তুমি চলে যাবার পর আমি আর কোন পুরুষের কাছে যাইনি। কথাটা বিশ্বাস করো?
করি।
আরও নরম গলায় জানতে চাইল কে। তুমি?
আমি গেছি, বলল মাইকেল। হঠাৎ শক্ত কাঠ হয়ে গেল কে-র শরীর, অনুভব করল ও। গত ছয়মাসের মধ্যে নয় অশ্য। সত্যি কথাই বলল। অ্যাপলোনিয়া মারা যাবার পর এই প্রথম কারও সাথে প্রে করছে মাইকেল।
৪.০৪ লাস ভেগাস
০৪.
লাস ভেগাস।
জমকার্লোভাবে সাজানো হোটেলের একটা সুইট। দেয়াল-জোড়া জানালার সামনে দাঁড়ালে নিচে নকল রূপকথার দেশ দেখা যায়। অন্য জায়গা থেকে তুলে নিয়ে এসে লাগানো তাল গাছগুলো সার সার দাঁড়িয়ে আছে। কমলা রঙের আলোর লতা উঠেছে সেগুলোর গা বেয়ে। খানিক দূরে প্রকাণ্ড আকারের দুটো সুইমিং পুল, গাঢ় উজ্জল নীল পানিতে টইটুম্বুর। মরুভূমির তরালা রাতে ওখানে সাঁতার কাটবে। হোটেলের বোর্ডাররা।
উপত্যকার মাঝখানে নিয়নের আলোয় ঝলমল করছে লাস ভেগাস শহর। চারদিকের দূর দিগন্তরেখার কাছে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বালি আর পাথরের তৈরি পাহাড় সারি। সূক্ষ্ম কারুকাজ করা জানালার ভারি পর্দা নামিয়ে দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল জনি ফন্টেন।
জুয়া খেলার বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে সুইটে। একজন পিট বস। একজন ডিলার, একজন অতিরিক্ত সাহায্যকারী, আর একজন প্রায় নয় ওয়েট্রেস এই চারজন গোটা ব্যাপারটা সামলাচ্ছে। স্যইটের একটা অংশে, লিভিংরুমে, সোফায় বুয়ে আছে নিনো ভ্যালেন্টি, হাতে পানির একটা গ্লাস। তাতে পানি নেই রয়েছে নির্জলা হুইস্কি! লোকগুলো ক্যাসিনো থেকে এসেছে, ব্ল্যাক জ্যাক জুয়ার টেবিল সাজাচ্ছে তারা, একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে তাই দেখছে নিনো। টেবিলটার কাঠামো ঘোড়ার খুরের মত দেখতে, সেটাকে ঘিরে বসানো হয়েছে যথা নিয়মে গদিমোড়া ছয়টা চেয়ার। পুরোপুরি মাতাল নয় এখনও নিনো, তবু গলার স্বর জড়িয়ে যাচ্ছে তার।
