এটার খুব যে একটা সম্ভাবনা আছে তা নয়, রুমাল দিয়ে নাক মুছে বলল মাইকেল, সত্যি কথা বলতে হয়, তাই বললাম আর কি।
প্রসঙ্গটা তুলে তুমি যাই বোঝাতে চাও না কেন, আমি কিন্তু ওসব একেবারেই বিশ্বাস করি না। তুমি অত খারাপ লোক হতে পারো না। উহ, তা কি করে হয়! এমন তো নয় যে তোমাকে আমি চিনি নবা চিনতে ভুল করেছি। অসম্ভব। কিন্তু চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে বিভ্রান্তিতে ভুগছে কে! দূর ছাই, তোমার কথা ভাল বুঝতেই পারিনি আমি। আরেকটা ব্যাপার কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকছে না। তোমার বিরুদ্ধে এত বড় আর এমন জঘন্য অভিযোগ আনা হলো কেন?
একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাইকেলকে-র দিকে। নরম গলায় বলল, প্লীজ, জেদ ধরো না, কে। এর বেশি তোমাকে আমি বোঝাতে পারব না। এসব বিষয় আসলে কিছু চিন্তা করার দরকারই নেই তোমার, কেমন? যা ঘটে গেছে, গেছে-এর সাথে তোমার বা আমাদের বিবাহিত জীবনের কোন সম্পর্কই থাকবে না। এর আগেও তো বললাম, পারিবারিক ব্যবসার ব্যাপারে তোমার মাথা ঘামানো চলবে না, তার কোন দরকার নেই। তুমি আমাকে পাবে, আমি তোমাকে পাব, ভাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে আমাদের। আমার ছেলেমেয়ের মা হিসেবে তোমাকে দেখতে চাই আমি।
হঠাৎ রেগে গেল কে। তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল কণ্ঠস্বর। তোমার কথা কিছুই আমি বুঝতে পারছি না। আমাকে বিয়ে করার কথা কিভাবে মুখে আনছ, কিভাবে যে আভাস দিচ্ছ আমাকে তুমি ভালবাস-কিছুই পরিষ্কার হচ্ছে না আমার কাছে। ভালবাসি, এই শব্দটা কখনও তুমি আমার সামনে উচ্চারণ করোনি। একটু আগে। বললে, তোমার বাবাকে তুমি ভালবাস! কই আমাকে ভালবাস সে কথা তো একবারও বললে না! তা বলবেই বা কিভাবে! আমাকে যদি বিশ্বাস করতে, তাহলে হয়তো বলতে পারতে কিন্তু তা তো করো না। করলে, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো চেপে রাখতে চাইতে না। তাহলেই জিজ্ঞেস করতে হয়, বিশ্বাসই যখন করতে পারছ না, তাহলে আমাকে বিয়েই বা করতে চাইছ কেন? আমি জানি, তোমার বাবা তোমার মাকে বিশ্বাস করেন, অস্বীকার করতে পারবে?
অস্বীকার করব কেন? বলল মাইকেল। আমিও জানি বার মাকে বিশ্বাস করেন! করবেন না কেন? কিন্তু বিশ্বাস করেন মানে এই নয় যে বাবা তাকে সব কথা বলেন। তাছাড়া, আরও কথা আছে। বাবার বিশ্বাস অর্জনের জন্যে আমার মাকে অনেক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হতে হয়েছে। নিজের স্ত্রী বলেই নয়, মার। ওপর বিশ্বাস রাখার আরও অনেক কারণ আছে বাবার। এক সময় সন্তানের জন্ম দেয়া ভীষণ কঠিন একটা ঝুঁকির ব্যাপার ছিল, সে-সময় আমাদের চার ভাই-বোনের জন্ম দিয়েছিলেন মা। বিপদের সময় বাবাকে আগলে রাখতেন তিনি। বাবা গুলি খেলে কে তাঁর সেবা করত? মা। মা কখনও বাবার কথার ওপর কথা বলেননি। বাবাকে শুধু ভালই বাসেননি, বাবার বিচার বুদ্ধি আর বিচক্ষণতার ওপর সম্পূর্ণ আস্থাও রেখেছেন। একটানা চল্লিশটা বছর ধরে মার প্রথম কাজ ছিল বাবার সেবা করী। এত সব করে তুমিও যদি আমার বিশ্বাস অর্জন করতে পারে, কেন তোমাকে দুচারটে কথা বলতে পারব না আমি? অবশ্য তখন তুমিই শুনতে চাইবে না।
শান্তভাবে জানতে চাইল কে, আমরা কি উঠানে থাকব?
হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকিয়ে বলল মাইকেল। খারাপ লাগবে না তোমার, নিজেদের আলাদা বাড়ি থাকবে আমাদের। কেউ আমাদের ব্যাপারে নাক গলাতে আসবে না, আমার মা বা বাবা সেরকম মানুষই নন। আমাদের রুচি আর পছন্দ মত যেভাবে খুশি থাকব আমরা। তবে, সব হাঙ্গামা মিটে না যাওয়া পর্যন্ত ওই উঠানেই থাকতে হবে আমাদের।
তার কারণ, বাইরে থাকা তোমার জন্যে নিরাপদ নয়।
পরিচয় হবার পর এই প্রথম মাইকেলের রাগ দেখল কে। হঠাৎ ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা হয়ে গেল ও। চেহারায় এমন সন্ম পরিবর্তন এল, প্রায় ধরাই যায় না। তার গলার স্বরও বদলাল না। বরফের ধোয়ার মত একটা ঠাণ্ডা ভাব উঠছে শরীর থেকে। নিজের অজান্তে শিউরে উঠল কে। ঢোক গিলল একটা। পরিষ্কার উপলব্ধি করছে, মাইকেলকে যদি বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেয় সে, তার কারণ হবে মৃত্যুর মত ভয়াল ওর এই ঠাণ্ডা ভাবটুকু।
যত নষ্টের গোড়া ওই সিনেমা আর খবরের কাগজগুলো, বলল মাইকেল। আমার বাবা অথবা কর্লিয়নি পরিবার সম্পর্কে তোমার কোন ধারণাই নেই। সম্পূর্ণ ভুল বুঝে বসে আছ তুমি। শুধু তোমার খাতিরে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করছি, কিন্তু এই শেষ, আর কখনও এ-বিষয়ে কোন প্রশ্ন কোরো না। শোনো, বুঝিয়ে দিচ্ছি। একটু থামল মাইকেল, রুমাল দিয়ে নাক মুছল। আমার বাবা একজন ব্যবসায়ী। তার একটা পরিবার আছে। আর আছে বেশ বড় একদল বন্ধু, যারা তার বিপদ আপদের সময় সাহায্য করবে। এদের সবার জীবিকার ব্যবস্থা করতে হয় তাকে। এঁরা যাতে ভাল খেয়ে পরে জীবনটাকে সুন্দরভাবে উপভোগ করতে পারে সেদিকেও তার নজর রাখতে হয়। আমাদের চারদিকে যে সমাজটা দেখতে পাচ্ছি, আমার বাবা সে সমাজের নিয়ম বা আইন মানেন না। না মানার কারণও আছে। তিনি একজন অসাধারণ বুদ্ধিমান মানুষ, তার অসংখ্য দুর্লভ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই সমস্ত যোগ্যতা আর উপযুক্ততা তার আছে বলেই তিনি নিজের মনের মত করে বেঁচে থাকতে চান, কিন্তু প্রচলিত সমাজের নিয়ম মেনে চললে তাকে সেভাবে বেঁচে থাকতে দেয়া হবে না। যতটুকু প্রাপ্য তার চেয়ে কম সুযোগ-সুবিধে নিয়ে বেঁচে থাকতে রাজী নন তিনি। প্রসঙ্গক্রমে বলছি, কথাটা তোমাকে বুঝতেও হবে, আমার বাবা প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বা গভর্নরদের চেয়ে নিজেকে ছোট বলে মনে করেন না। একদল লোক নিজেদের সুবিধে করে নেবার মতলবে কিছু আইন তৈরি করে নিয়েছে, সেগুলো মেনে চললে বাবাকে নিকৃষ্ট জীবন গ্রহণ করতে হবে, তাই তা তিনি মানতে রাজী নন। অবশ্য, প্রচলিত সমাজের অন্তর্ভুক্ত হওয়াই তার অন্তিম ইচ্ছ, কিন্তু তা হবার আগে প্রচুর ক্ষমতার অধিকারী হতে চান তিনি। ব্যক্তিগত ক্ষমতা না থাকলে এই সমাজ কাউকে সাহায্য করে না। সেই প্রচুর ক্ষমতা যতদিন না তাঁর হাতে আসছে, ততদিন তিনি নিজের তৈরি কিছু আইন মেনে চলবেন বলে ঠিক করেছেন। প্রচলিত সমাজের বিধি বিধান এবং আইনের চেয়ে তার নিজের তৈরি বিধিবিধান এবং আইনগুলো অনেক বেশি ন্যায্য এবং উন্নত বলে মনে করেন তিনি।
