ঠাট্টা করছ কেন? ধৈর্য হারিয়ে ফেলল কে। একটি বারের জন্যেও কি সিরিয়াস হতে পারো না তুমি? আজেবাজে কথা বলে ভোলাতে পারবে না আমাকে। প্রশ্নের উত্তর দাও।
বেশ, দিচ্ছি, বলল মাইকেল। আরেকবার নাক ঝেড়ে ভাল করে মুছে নিল। কিন্তু, মনে রেখো, এই প্রথম এবং এই শেষ–আর কখনও এসব ব্যাপারে কোন কথা তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করবে না। আমি আশা করব, এখন যা বলছি তার প্রতিটি কথা তুমি বিশ্বাস করবে। একটু থামল মাইকেল, তারপর শুরু করল, তুমিই একমাত্র মানুষ যার ওপর গভীর টান আছে আমার। সে এত গভীর টান, তার পরিমাপ আমার জানা নেই। বাড়ি ফিরে এসে তোমাকে ফোন করিনি। কিন্তু সেজন্যে আমাকে দোষ দিতে পারো না তুমি। অমন জঘন্য একটা তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যাবার পরও তুমি যে আমাকে ক্ষমা করতে পারবে, মনে রাখবে তা আমি কি করে বুঝব বলে? হ্যাঁ, তোমার পিছু পিছু ঘুরতে পারতাম আমি পারতাম তোমাকে একগাদা মিথ্যে কথা বলে ধাপ্পা দিতে, কিন্তু সেরকম ইচ্ছাই হয়নি আমার। একটু থামল ও। তারপর গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলল, এখন যে কথাটা বলব, সেটা তুমি তোমার বাবাকেও বলতে পারবে না। তোমাকে বিশ্বাস করি, তাই বলছি কথাটা। সব কিন্তু যদি ঠিকঠাক মত চলে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কর্লিয়নি পরিবার আর কোন রকম অন্যায়, বেআইনী কাজের সাথে জড়িত থাকবে না। এটা আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছে। এই ইচ্ছেটাকে বাস্তবে পরিণত করতে হলে অনেকগুলো বড় আর সূক্ষ্ণ চাল চালতে হবে আমাকে। কিন্তু তার আগেই তুমি বিধবা হয়ে যেতে পারো। যদিও, বিধবা হলে অবস্থাপন্ন বিধবাই হবে, ভালভাবে বেঁচে থাকার জন্যে কখনও দুশ্চিন্তা করতে হবে না তোমাকে। এবার বলি, তোমাকে কেন দরকার আমার। কেন যেন মনে হয় আমার, আমার সন্তানের মা হিসেবে একমাত্র তোমাকেই মানায়। ছেলেপুলে চাই আমি, নিজস্ব একটা পরিবার চাই–এসবের প্রয়োজন আছে তার সময়ও হয়েছে। তোমাকে চাওয়ার আরেকটা কারঙ, আমি চাই আমার প্রভাব যেন আমার ছেলেমেয়েদের ওপর না পড়ে। আমার ওপর বাবার প্রভাব পড়েছে, সেজন্যেই এব্যাপারে এতটা সতর্ক হতে চাইছি আমি। তার মানে বাবা আমার ওপর ইচ্ছা করে তার প্রভাব ফেলেছেন তা আমি বলছি না।
না, তা তিনি ফেলেননি। বরং উল্টোটাই চেয়েছিলেন তিনি। আমাকে অধ্যাপক, ডাক্তার বা ওই ধরনের কিছু এটা তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনাচক্রে সব ওলটপালট হয়ে গেল। পারিবারিক ব্যাপারে জরিয়ে পড়তে বাধ্য হলাম আমি, পরিবারটিকে রক্ষা করার জন্যে লড়তে হলো আমাকে। লড়তেই হলো, তার কারণ, বাবাকে আমি শ্রদ্ধা করি। ভালোবাসি। ভক্তি করি। আর সব আদর্শ ছেলের মতই, আমিও আমার বাবার অনুগত পুত্র, বাইরে থেকে যাই মনে হোক না কেন। আসলে, এতটা ভক্তি করার যোগ্য মানুষ আমার জীবনে আর দেখিনি আমি। তার মত ভাল স্বামী, ভাল বাপ, গরীব দুঃখী অসহায়ের এত বড় বন্ধু, এত বিচক্ষণ মানুষ কোথাও আর দ্বিতীয়টি আছে কিনা আমার জানা নেই। তাঁর আরেকটা দিক আছে, কিন্তু আমি তার ছেলে বলে সেটার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।
রুমাল দিয়ে আবার নাক মুছল মাইকেল। চেহারায় শান্ত অথচ দৃঢ় একটা ভাব ফুটে উঠেছে তার। কিন্তু আসল কথা আমি চাই ছেলেমেয়েরা যেন আমার প্রভাবে না পড়ে। এদেরকে আমি সত্যিকার আমেরিকান হিসেবে দেখতে চাই। যাকে বলে আগাগোড়া, আপাদমস্তক, পুরোপুরি আমেরিকান, ওরা হবে তাই। কে জানে, ওরা হয়তো আমেরিকার গর্বে পরিণত হবে। ওরা হয়তো রাজনীতি করবে। আপন মনে হাসল মাইকেল। কে জানে, ওদের মধ্যে কেউ একজন হয়তো আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত হবে। হতে বাধাটা কোথায় বলো? কলেজে থাকার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত, পারিবারিক তথ্য বিষয়ে একটা বই পড়তে হয়েছে আমাকে। তাতে এমন সব তথ্য আছে, পড়লে তুমি হতভম্ব হয়ে যাবে। প্রেসিডেন্টদের বাপ দাদাদের কারও কারও ভাগ্য নেহাতই ভাল, তা না হলে ওঁদের অনেকেরই ফাঁসি হওয়া উচিৎ ছিল। এমন গুরুতর সব অপরাধ করেছেন তারা, গুরুত্বের আর নৃশংসতার বিচারে ইদানীংকার অপরাধের তুলনায় সেগুলো শতগুণ বেশি জঘন্য। তবু তো তাদের ছেলেদের প্রেসিডেন্ট হতে বাধা পেতে হয়নি। আর আমার কথা যদি বলো, আমি তো সজ্ঞানে কখনও কোন অন্যায় কাজ করব না। অন্তত বিবেকের কাছে সাধু সেজে থাকার সব রকম প্রয়াস থাকবে আমার মাঝে। তাই, যদি আশা করি আমার ছেলেদের মধ্যে কেউ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবে, তাতে অন্যায় কোথায়? সেটাকে দুরাশা মনে করার কি আছে? এখন আর হাসছে না মাইকেল। প্রেসিডেন্ট হতেই হবে, তা আমি বলছি না। হবার পথে কোন বাধা থাকবে না, সেটা বোঝাতে চাইছি। প্রেসিডেন্ট না হলে, অধ্যাপক হবে ওরা, ডাক্তার হবে, কিংবা সঙ্গীতজ্ঞ হবে-তাতেই আমি খুশি। তার মানে, পারিবারিক ব্যবসাতে ওদেরকে আমি ঢুকতে দেব না। সেখানে ওদের কোন জায়গা নেই। তবে, কি জানো, অতটা বড় করতে করতে আমিও অবসর নেব তখন। তখন আমার সময় কাটবে তোমাকে নিয়ে। তুমি আর আমি ক্লাবে যাব। সচ্ছল আমেরিকানদের উপযুক্ত সাদামাঠা স্বাস্থ্যময় জীবন উপভোগ করব। এবার বলো, কেমন লাগছে। প্রস্তাবটা?
চমৎকার! অপূর্ব! বলল কে। কিন্তু ওই বিধৰা হবার বিষয়টা এড়িয়ে গেলে কেন?
