ঘন ঘন সিগারেটে টান মারছে মাইকেল। কে-র উদোম পিঠে খানিকটা ছাই পড়ল। শিউরে উঠে বলল কে, প্লীজ টরচার কোরো না। কাউকে কিছু বলব না আমি, যীশুর কিরে!
রসিকতাটায় কিন্তু হাসল না মাইকেল। কথা বলছে, কিন্তু স্বরটা কেমন যেন দূর থেকে ভেসে মাসা বলে মনে হলো কে-র।
একটা কথা কি জানো, বাড়িতে ফিরে ওদের সবাইকে দেখে ভাল লেগেছিল, কিন্তু সেটা তেমন কিছু নয়। আজ কিচেনে তোমাকে দেখেই আনন্দে ভরে উঠল বুকটা। এর তুলনা হয় না, এত আনন্দ! এরই নাম কি ভালবাসা?
ঠিক জানি না, বলল কে। কিন্তু ভালবাসার এত কাছাকাছি বলে মনে হচ্ছে যে ওতেই আমার চলে যাবে।
এরপর আবার পরস্পরের শরীর নিয়ে মেতে উঠল ওরা। গতবারের চেয়ে এবার মাইকেলের আচরণে অনেকটা কোমলতা প্রকাশ পেল। এক সময় বেরিয়ে গিয়ে দুজনের জন্য দুটো গ্রাসে মদ নিয়ে এল ও। ফিরে এসে বিছানায় উঠল না আর, বসল খাটের কাছে একটা আরাম কেদারায়।
এসে, এবার একটু সিরিয়াস হওয়া যাক, বলল ও। আমাকে বিয়ে করার ব্যাপারে কিছু ভেবেছ নাকি?
প্রশ্নটাকে পাত্তা দিল না কে, ঠোঁট বাঁকা করে হেসে ইঙ্গিতে বিছানাটা দেখাল।
মাইকেলও হাসল, তারপর বলল, না, আগে কাজের কথা শেষ হোক। একটা কথা মেনে নিতে হবে তোমাকে। যা ঘটে গেছে সে বিষয়ে কিছুই বলতে পারব না তোমাকে। বাবা কিছু কাজ দিয়েছেন, সেগুলো এখন করতে হচ্ছে আমাকে। শেষ পর্যন্ত আমাদের পারিবারিক জলপাই তেলের ব্যবসাটা আমার ঘাড়ে চাপবে, তার ভার নেবার জন্যে তৈরি করা হচ্ছে আমাকে। কিন্তু তুমি তো জানোই, এই পরিবারের শত্রুর কোন অভাব নেই। বাবার কিছু ব্যক্তিগত শত্রুও আছে। আমি বলতে চাইছি, আমাকে বিয়ে করলে, কাল বা পরশু কিংবা তার পরদিন তুমি বিধবা হয়ে যেতে পারো যাবেই, তা বলছি না-তবে সম্ভাবনা আছে, যদিও খুব বেশি নয়। আরেকটা কথা, অফিসে কি হচ্ছে না হচ্ছে সে বিষয়ে রোজ তোমাকে আমি জবাবদিহি করতে পারব না। ব্যবসা, পেশা বা কাজ-কর্মের ব্যাপারে কিছুই তোমার জানা চলবে না। আমার ও-দিকটা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে থাকতে হবে তোমাকে। তার মানে, আমার স্ত্রী হয়েও তুমি আমার কাজীবনের সহকারিণী হবে না। অন্তত সমান সমান অংশীদার হবে না। সেটা হবার একদম উপায় নেই।
বিছানায় উঠে বসল কে। টেবিলের আলোটা জ্বালল সে, সিগারেট ধরাল একটা। ধীরে ধীরে বালিশে ঠেস দিয়ে বলল, এত কথা বলে তুমি আসলে নিজের পরিচয়টা পরিষ্কার করার চেষ্টা করছ আমার কাছে, তাই না? তুমি একজন গুণ্ডা, এই কথাটাই ঘুরিয়ে বলছ, তাই না? খুন, এবং ওই ধরনের কিছু অপরাধের জন্য তুমি দায়ী। আরও বলছ, ওসব বিষয়ে কখনও কোন কথা তোমাকে আমি জিজ্ঞেস করতে পারব না, চিন্তা পর্যন্ত করতে পারব না। এই হলো তোমার শর্ত। এ যেন ঠিক হরর ফিন্মের কাহিনী-নরপিশাচ নায়িকাকে ধরেছে, বলছে তাকে ওর বিয়ে করতে হবে।
ভাঙা মুখটা কে-র দিকে ঘুরিয়ে দেখাল মাইকেল, তারপর হাসল একগাল।
মুখ শুকিয়ে চোখ বড় হয়ে গেল কে-র, অনুতপ্ত হয়ে দ্রুত বলল, যীশুর কিরে, মাইক, তা ভেবে ওকথা বলিনি আমি। সত্যি বলছি, এটা আমি ধর্তব্যের মধ্যেই আনি না!
হাসছে মাইকেল। জানি! আমার নিজেরও আজকাল এটাকে আর খারাপ লাগে না। তবে সারাক্ষণ সর্দি গড়াচ্ছে, এটাই যা দুঃখের বিষয়।
তুমি আমাকে সিরিয়াস হতে বলেছ, বলল কে। বিবাহিত জীবনটা কেমন হবে আমার? তোমার মায়ের মত, আর সব ইতালীয় স্ত্রীদের মত? শুধু বাচ্চা বিয়ানোই আমার একমাত্র কাজ হবে? ছেলেপুলে, ঘর-সংসারই আমার জগৎ, তার বাইরে আমি অবাঞ্ছিত থেকে যাব? তারপর ধরো, যীশু না করুন, যদি কিছু হয়? একদিন হয়তো তোমাকে ধরে জেলেই পুরে দিল। তখন?
এদিক ওদিক মাথা দোলাল মাইকেল। না, তা কখনও হবে না। খুন? হ্যাঁ। জেল? না।
স্বীকারোক্তির বহর লক্ষ করে হেসে ফেলল কে, তার হাসিতে গর্বের সাথে অদ্ভুতভাবে মিশে রয়েছে একটু কৌতুক। আশ্চর্য মানুষ তো! এ ধরনের একটা কথা মুখে আনতে পারলে তুমি? কি ভেবে বললে কথাটা? বলো, বলতেই হবে তোমাকে।
এই সব বিষয়েই তোকিছু জানাতে পারব না তোমাকে জানাতে চাইও না।
অনেকক্ষণ আর কোন কথা বলল না কে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকেই নিস্তব্ধতা ভাঙতে হলো। এতদিন কেটে গেল, একটা খবরও তো নাওনি, আজ আমি হঠাৎ এসে পড়ায় দেখা হয়ে গেল–তাহলে আবার বিয়ে করতে চাইছ কেন? বিছানায় আমি কি এতই ভাল?
গম্ভীর হয়ে গেল মাইকেল। চেহারাটা থমথম করছে। মাথা নেড়ে বলল, অবশ্যই। আমার জন্যে বিছানায় তোমার চেয়ে ভাল আর কেউ হতে পারে না। কিন্তু না চাইতেই, বিনা পয়সাতেই পাচ্ছি যখন, বিয়ে করে ঝামেলা ঘাড়ে নিতে যাব কেন? বসো, এখুনি উত্তর দিয়ো না। এখন থেকে আগের মত আবার মেলামেশা চনতে থাকুক। ইচ্ছে করলে তুমি তোমার মা-বাবার সাথে বুদ্ধি পরামর্শ করতে পারো। আমি বরং সেটাই চাইব। শুনেছি, তোমার বাপটিও নিজের ক্ষেত্রে কারও চেয়ে কম যান না। তার উপদেশ অবহেলা কোরো না।
ক্ষীণ জেদের সুর ফুটে উঠল কে-র গলায়, কিন্তু কেন বিয়ে করতে চাও তা তো বললে না?
টেবিলের দেরাজ থেকে সাদা একটা রুমাল বের করে নাকে চেপে ধরল মাইকেল। এই সর্দিটাই হয়তো আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে তোমাকে। সারাক্ষণ শুধু নাক ঝাড়ে, এমন লোককে কি কাছে রাখতে ভাল লাগবে তোমার?
