আমার একটা আস্তানা আছে শহরে। সেখানে যাব? জানতে চাইল মাইকেল। নাকি কোন রেস্তোরাঁয়?
ক্ষিধে পায়নি আমার, বলল কে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল দুজনেই। তারপর জিজ্ঞেস করল মাইকেল, ডিগ্রিটা নিয়েছ?
নিয়েছি। একটা স্কুলে পড়াচ্ছি, আমাদের শহরেই। পুলিশ ক্যাপটেনকে যে খুন করেছে সে কি ধরা পড়েছে? সেজন্যেই তুমি বাড়ি ফিরতে পেরেছ, তাই না?
উত্তর দেবার আগে কিছুক্ষণ চিন্তা করল মাইকেল। তাই। খবরের কাগজে তো সব কথা ছাপা হয়েছিল, পড়েছ নিশ্চয়ই?
নিজেকে খুনী বলে স্বীকার করছে না মাইকেল, সেজন্যে পরম একটা স্বস্তির পরশ অনুভব করল কে। মন খুলে এই প্রথম হাসল সে। বলল, ছোট শহর, ওখানে নিউইয়র্ক টাইমস ছাড়া আর কিছু পৌঁছায় না। খবরটা হয়তো ডননব্বই পৃষ্ঠায় চাপা পড়ে গিয়েছিল। যদি জানতাম আরও অনেক আগে ফোন করতাম তোমার মাকে। খানিক ইতস্তত করে আবার বলল সে, তোমার মা কিন্তু অনেক আবোলতাবোল কথা বলতেন, তার মাথামুণ্ড কিছুই বুঝতে পারতাম না আমি। খুব অদ্ভুত শোনাত তার কথাগুলো, মনে হত ওই জঘন্য কাণ্ডটার জন্যে তুমিই যেন দায়ী। কিন্তু আজ তিনি সম্পূর্ণ অন্য কথা শোনালেন আমাকে, কফি খেতে খেতে খুব হাসির সাথে জানালেন, কোন এক খ্যাপা লোক নাকি নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করেছে।
মা হয়তো ভুল করে আমাকেই সন্দেহ করতেন, বলল মাইকেল; আসল। ঘটনা জানতে পেরে ভুল ভেঙেছে তার।
তোমাকে সন্দেহ করতেন? চোখ তুলে জানতে চাইল কে। তোমার নিজের মা?
ছেলেমানুষের মত একগাল হাসল মাইকেল। জানো না, পুলিশেরও বাড়া হয় মায়েরা? সবচেয়ে খারাপটাই আগে বিশ্বাস করে?
মালবেরি স্ট্রীটে পৌঁছে একটা গ্যারেজের সামনে গাড়ি দাঁড় করাল মাইকেল। মালিক নোকটা ওর পরিচিত বলে মনে হলো কে-র। পায়ে হেঁটে বাক নিল ওরা, চারদিকে ধসে পড়া পোড়ো বাড়িঘর, সেগুলোর একটায় তাকে নিয়ে এল মাইকেল। গেটের চাবি রয়েছে ওর কাছে, ভেতরে ঢুকল ওরা। দেখতে ভাঙাচোরা হলে কি হবে, কে আবিষ্কার করল, বাড়িটার ভেতর সব রকম অত্যাধুনিক আরাম আয়েশের নিখুঁত আয়োজন রয়েছে, একজন শহুরে কোটিপতির বাড়িতে যেমন থাকে।
ওরতলার ফ্ল্যাটে তাকে নিয়ে এল মাইকেল। বসবার ঘরটা প্রকাণ্ড। কিচেনটা বিশাল। একটা দরজা দিয়ে ঢুকলে শোবার কামরা। বার রয়েছে বসবার ঘরে, মাইকেল দুটো গ্লাসে পানীয় ঢালল। কে-র হাত ধরে টেনে নিয়ে এসে একটা সোফায় বসল ও, নিজেও বসল তার পাশে। তারপর মৃদু গলায় বলল, তুমি চাইলে শোবার ঘরে গিয়েও বসতে পারি আমরা।
গ্লাসে লম্বা একটা চুমুক দিল কে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল মাইকেলের দিকে। হেসে ফেলল দুজনেই। পারিই তো। চলো তাহলে, বলল সে।
আজকের প্রেমটা কে-র কাছে আগের মতই লাগল। তবে আগের চেয়ে একটু রূঢ় মনে হলো মাইকেলকে। কোমল ভাবটা নেই ত, যা হলো সোজাসুজি হলো। ওর মনে হলো, তার কাছেও মাইকেল যেন সতর্কতা বজায় রাখছে। ঠাট্টার সুরে অনুযোগ করতে পারে সে, কিন্তু ইচ্ছে হলো না। জানে এরকম আড়ষ্ট ভাব কেটে যাবে, অনেক দিন পর প্রথম বলেই হয়তো এমন হচ্ছে। তার ধারণা, এসব ক্ষেত্রে পুরুষদের মধ্যেই আশ্চর্য একটা স্পর্শকাতরতা দেখা যায়। দীর্ঘ দুবছর পর দেখা এবং মিলন, কই, কিছুই তো অস্বাভাবিক বলে মনে হলো না তার কাছে। সব যেন সেই আগের মতই আছে। মাইকেলকে এতদিন দেখেনি, ওর সাথে শোয়নি, এসব অনুভবই করছে না।
মাইকেলের গায়ে গা ঠেকিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে রইল কে। বলল, আমাকে বিশ্বাস করতে পারোনি, না? তা নাহলে চিঠি লেখোনি কেন? একটা চিঠি লিখে না হয় দেখতেই, তোমার সাথে বেঈমানী করি কিনা। ভুয়া ঠিকানা দিয়েও তো লিখতে পারতে, আমার পরীক্ষাটা অন্তত হয়ে যেত। যদি লিখতে, বিশ্বাস করো, নিউ ইংল্যান্ডের ওমের্তা পালন করতাম আমি। তুমি বোধহয় জানো না, ইয়াংকিরাও যথেষ্ট মুখ বুজে থাকতে পারে।
আশ্চর্য একটা পুলক অনুভব করছে মাইকেল। অন্ধকারে নিঃশব্দে হাসছে ও ভুলেও কখনও ভাবিনি তুমি আমার পথ চেয়ে বসে থাকবে। যা বিশ্রী একটা ব্যাপার ঘটল, তারপরও আমার জন্যে অপেক্ষা করবে, ভাবতেই পারিনি।
লোক দুটোকে তুমি মেরেছ, এ আমি কক্ষনও বিশ্বাস করিনি, দ্রুত বলল কে। কিন্তু তোমার মায়ের কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। সে যাই হোক, মনে মনে আমি ঠিকই জানতাম এ ধরনের কাজ তোমার পক্ষে সম্ভবই নয়। অন্তত আমি তোমাকে চিনি তো!
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মাইকেল। আমি দায়ী কি দায়ী নই, কিছু এসে যায় না তাতে, মৃদু গলায় বলল ও। এটুকু তোমাকে মেনে নিতে হবে। আসলে কিছু এসে যায় না। আমার কথা বুঝতে পারলে?
মাইকেলের গলার সুরে, অদ্ভুত একটা ঠাণ্ডা ভাব, অনুভব করে শিউরে উঠল কে। এক সেকেণ্ড নিজের সাথে যুদ্ধ করে কঠিন সুরে বলল, তাহলে এখনই আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। ওই লোক দুজনকে তুমি খুন করেছ নাকি করোনি?
উঠে বসল মাইকেল, ঠেস দিল বালিশে। লাইটার জ্বেলে সিগারেট ধরাল একটা। তারপর বলল, ধরো, তোমাকে আমি বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছি, এখন তোমার এই প্রশ্নের উত্তর না পেলে তুমি কি সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না?
তোমাকে ভালবাসি। আমার কাছে তুমিই আসল ব্যাপার। আর কিছু আমি গ্রাহ্য করি না। আর কিছু কেয়ার করি না। আমি যেমন ভালবাসি তোমাকে, তেমনি তুমিও যদি ভালবাসতে আমাকে, তাহলে সত্যি কথাটা বলতে এত ভয় পেতে না। তোমার মনে এই সন্দেহ জাগত না যে আমি পুলিশের কাছে গিয়ে সব কথা লাগাব। ঠিক কিনা? গুণ্ডা গুণ্ডা, আসলে তুমি একটা গুণ্ডা-তাই না? তবু সত্যি বলছি, তাতেও কিছু এসে যায় না আমার। কিন্তু তুমি সত্যি আমাকে ভালবাস কি ভালবাস না তাতে আমার অনেক কিছু এসে যায়। বোঝাই যাচ্ছে, আমাকে ভালবাস না তুমি। যদি বাসতে, প্যাঁচ মেরে কথা বলতে না। বাড়ি ফিরে একটা ফোন পর্যন্ত করলে না। কেমন মানুষ তুমি সেতো বোঝাই যাচ্ছে। পাষণ্ড!
