ট্যাক্সি ডাকল কে। কিন্তু লং বীচের নাম শুনে বেঁকে বসল ড্রাইভার, ওদিকে যাবে না। মিষ্টি করে হাসল কে, তাতেই অর্ধেক ঘায়েল হয়ে গেল লোকটা, তারপর যখন শুনল কে তাকে দিগুণ ভাড়া দেবে, সাথে সাথে উঠে বসতে ইঙ্গিত করল সে।
লং বাঁচে পৌঁছুতে সময় লাগল এক ঘটা:। উঠানটাকে কেমন যেন একটু অচেনা লাগল ওর। অনেক দিন আসেনি ও, তার ওপর এখানে সেখানে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। চারদিকে এখন লোহার রেলিং, লোহার গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকতে হয়। স্ন্যাকস, লাল শার্ট আর সাদা কোট পরে একজন লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে গেটে, গাড়ি থামতেই জানালা দিয়ে ভেতরে মাথা গলিয়ে মিটার দেখল। ড্রাইভারকে কয়েকটা নোট দিল সে টাকাটা গুণে খুব খুশিই বলে মনে হলো ড্রাইভারকে সুতরাং গাড়ি থেকে নেমে পড়ল কে।
.
উঠানের মাঝখানে বাড়িটায় মিসেস কর্নিয়নি থাকেন, সেদিকে এগোল কে। দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন মিসেস কর্লিয়নি নিজে যা কোনদিন ঘটেনি, ওকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন তিনি। অবাক হয়ে গেল কে, একটু লজ্জাও পেল। নিজের বুকের ওপর থেকে কে-কে একটু সরালেন মিসেস কর্লিয়নি, কিন্তু ছেড়ে দিলেন না, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেকক্ষণ দেখলেন, কি যেন মেলাচ্ছেন, কি যেন যাচাই করছেন, তারপর বললেন, তোমার মত সুন্দর মেয়ে খুব কম হয়। দুঃখ কি জানো, আমার ছেলেগুলো একটাও চালাক নয়। কে-র হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে এলেন সোজা কিচেনে। খাবারদাবার সেখানে সব সাজানোই রয়েছে। স্টোভে টগবগ করে ফুটছে কফির পানি। মুচকি একটু হাসলেন তিনি। ওর আসার সময় হয়ে গেছে। খুব অবাক হয়ে যাবে তোমাকে দেখে।
কে যেন পালিয়ে যাবে, তাই তার কাঁধে হাত রেখে পাশেই বসে আছেন মিসেস কর্লিয়নি। জোর-জার করে এটা-সেটা খাওয়াচ্ছেন ওকে, সেই সাথে অত্যন্ত আগ্রহ আর কৌতূহলের সাথে খুঁটিয়ে জেনে নিচ্ছেন সমস্ত খবরাখবর। স্কুলে ছাত্রী ঠেঙাচ্ছে কে, নিউইয়র্কে এসেছে:মেয়ে-বন্ধুদের সাথে দেখা করার জন্যে, আর তার বয়স মাত্র চব্বিশ বছর–এসব শুনে সাঙ্ঘাতিক পুলকিত হয়ে উঠলেন ভদ্রমহিলা। তার মাথা দোলাবার ভঙ্গি দেখে মনে হলো, মনে মনে যা তিনি ভেবে রেখেছিলেন তার সবগুলো ঠিক ঠিক মিলে যাচ্ছে, কোথাও কোন ত্রুটি নেই। রীতিমত ঘাবড়ে গেল কে, তাই ঠিক যা জিজ্ঞেস করা হচ্ছে তারই উত্তর দিচ্ছে, বেশি কথা বলছে ।
চোরা চোখে বারবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছিল কে, তাই সে-ই প্রথম দেখতে পেল ওকে।
একটা গাড়ি এসে থামল বাড়ির সামনে। এক এক করে দুজন লোক নামল নিচে। তারপর নামল মাইকেল মাথা তুলে লোকগুলোর একজনের সাথে কথা বলছে ও। ওর মুখের বা দিকটা দেখতে পাচ্ছে কে। ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল বুকটা। এই মেয়ে, করো কি! নিজেকে শাসন করছে সে, কিন্তু চোখের পানি তাতে বাধা মানছে না। এমন সাঙ্ঘাতিকভাবে আহত হয়েছিল মাইকেল তা জানা ছিল না বলে নিজেকে তার অপরাধী বলে মনে হচ্ছে। লাথি মেরে প্লাস্টিকের পুতুল তুবড়ে দিলে যেমন দেখায় ঠিক সেই রকম দেখাচ্ছে মাইকেলকে। কিন্তু তবু কিভাবে যেন কে-র চোখে ওর সৌন্দর্য একটুও কমল না, বরং আরও কঠোর, শক্ত দেখাচ্ছে ওকে–সেটা পছন্দও করছে সে। ধবধবে একটা সাদা রুমাল বের করে প্রথমে নাকে তারপর মুখে চেপে ধরল মাইকেল। ঘুরে দাঁড়াল। বাড়িতে ঢুকছে এবার
দরজা খোলার শব্দ। হলঘরে পায়ের আওয়াজ। কান পেতে শুনছে কে, হাঁটার অভ্যাসটা আগের মতই আছে মাইকেলের, এই পায়ের আওয়াজ তার হৃৎ স্পন্দনের সাথে তালে তালে মিলে আছে, এতই চেনা, এতই প্রিয়। এগিয়ে আসছে শব্দটা। কিচেনের খোলা দরজার সামনে দেখা গেল মাইকেলকে।
ওকে দেখে প্রথমে ভাবের কোন পরিবর্তন দেখা গেল না মাইকেলের মধ্যে। তারপরই হাসল সে। মুখের ভাঙনটার কাছে এসে আটকে গেল হাসিটা। হ্যালো, কেমন আছ? আগে থেকে ঠিক করে রেখেছে কে, এইরকম কিছু একটা বলবে। কিন্তু মাইকেলকে দেখামাত্র সব ওলটপালট হয়ে গেল কি করছে নিজেই বুঝতে পারল না, বুঝতে চাইলও না। কিভাবে উঠে দাঁড়াল জানে না ও। একছুটে স্যাং করে সেঁধিয়ে গেল মাইকেলের বাহ-বন্ধনে।-ওর কাঁধে মুখ গুঁজে দিল।
কে-র ভিজে গালে চুমু খেলো মাইকেল। ফোপাচ্ছে কে। যতক্ষণ না শান্ত হলো সে, দুহাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে রাখল মাইকেল। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটিয়ে নিয়ে চলল গাড়ির দিকে।
বডিগার্ডদের বিদায় করে দিল মাইকেল। ওকে গাড়িতে বসিয়ে নিজে উঠল ড্রাইভিং সীটে। স্টার্ট দিয়ে ছেড়ে দিল গাড়ি। বেরিয়ে এল ওরা বাড়ি ছেড়ে।
ইতিমধ্যে নিজেকে সামলে নিয়েছে কে। নড়েচড়ে বসে মেক-আপ ঠিক করছে। স্বেচ্ছায়, মৃদু গলায় বলল সে; নিজের অজান্তেই ছেলেমানুষিটা করে বসলাম। কিন্তু তুমি যে এমন ভয়ঙ্করভারে জখম হয়েছ তা তো আমাকে কেউ বলেনি ওঁরা।
ও কিছু নয়, একটু হাসল মাইকেল। মুখের ভাঙা দিকটা ছুঁলো একবার বিপদ হলো, সারাক্ষণ শুধু সর্দি গড়ায়। ফিরে যখন এসেছি. ত্রুটিটা হয়তো এবার সারিয়ে নেব। একটু থেমে গলাটাকে আরও খাদে নামিয়ে আবার বলল, উপায় থাকলে তোমাকে চিঠি লিখতাম বা খবর পাঠাতাম, কিন্তু সে উপায় ছিল না–সবকিছুর আগে এটা তোমাকে বুঝতে হবে।
কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থাকল কে, তারপর বলল, বেশ। একটা দীর্ঘশ্বাস চাপল সে।
