মাইকেল ওকে চিঠি লিখবেই, এই রকম একটা অন্ধ বিশ্বাস ছিল ওর। ওরা অন্তত একটা খবর তো পাঠাবেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত খবর বা চিঠি কোনটাই যখন এল না, রীতিমত অপমান বোধ করেছে ও। এখন ওর মনের অবস্থা আরও খারাপ। বুঝতে পারে, মাইকেলের তরফ থেকে চিঠি পাবার কোন আশা নেই। ওর দুঃখ, মাইকেল ওকে বিশ্বাস করতে পারেনি।
খুব ভোরের ট্রেন ধরল কে। নিউইয়র্কে পৌঁছুতে দুপুর হয়ে গেল। মেয়ে বন্ধুরা সবাই চাকরি করে, তাদেরকে আর বিরক্ত করতে ইচ্ছা হলো না। রাতে ফোন করবে স্থির করে সোজা হোটেলে উঠল ট্রেন জার্নির ফলে খুব ধকল গেছে শরীরের ওপর দিয়ে, এখন আর ঘুরেফিরে কেনাকাটা করারও ইচ্ছে নেই।
হোটেল কামরায় একা বসে আবোলতাবোল ভাবছে। মাইকেলের কথা মনে পড়ে গেল। দুজনে এই হোটেল কামরাতেই প্রেম করত ওরা। হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল মনটা। সেজন্যেই বোধহয় লং বীচে ফোন করে মাইকেলের মায়ের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করল ওর।
ডায়াল করতেই কর্কশ পুরুষ কণ্ঠ কানে ঢুকল। মিসেস কর্লিয়নিকে চাই, বলল কে। কয়েক মুহূর্ত আর কোন সাড়া নেই, তারপর একটা মেয়েলি গলা ভেসে এল অপর প্রান্ত থেকে, আপনি কে?
আমি কে অ্যাডামস, অপ্রস্তুত হয়ে বলল কে! মিসেস কর্লিয়নি, আমাকে কি আপনার মনে আছে?।
নিশ্চয়! একশোবার মনে আছে, বললেন মিসেস কর্লিয়নি। ফোন করোনি যে অনেক দিন? বিয়ে হয়ে গেছে নাকি?
না, না। এই কাজে একটু ব্যস্ত ছিলাম কিনা। ফোন করা ছেড়ে দেয়ায় মাইকেলের মা অসন্তুষ্ট হয়েছেন বুঝতে পেরে আশ্চর্যই হলো কে। জানতে চাইল, মাইকেলের কোন খবর জানেন? ও ভাল আছে তো?
কয়েক সেকেণ্ড অপরপ্রান্তে কোন সাড়া নেই। তারপর পরিষ্কার, স্পষ্ট কণ্ঠে মিসেস কর্লিয়নি বললেন, কেন, মাইকেল বাড়ি এসেছে তুমি জানো না? ফোন করেনি তোমাকে ও? দেখাও করেনি?
এমন চমকে উঠল কে যে মাথাটা ঘুরে উঠল হঠাৎ অসুস্থ বোধ করছে ও। গলার কাছে আটকে থাকা অদম্য কান্নাটা বিস্ফোরণের মত বেরিয়ে আসতে চাইছে। ভাঙা গলায় জানতে চাইল, মাইকেল বাড়ি ফিরেছে? কত দিন হলো?
সেতো আজ ছমাসের ওপর।
ও, বুঝেছি, ফিসফিস করে বলল কে। এরপর আর বুঝতে বাকি থাকে কিছু? এখন শুধু দুঃখ এই যে মাইকেল ওকে এতটা তাচ্ছিল্য করে তা জেনে ফেললেন মিসেস কর্লিয়নি। লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে তার পরমুহূর্তে প্রচণ্ড রাগ হলো।
শুধু মাইকেলের ওপর নয়, মনে মনে সব বিদেশীদের ওপর খেপে উঠল কে, মাইকেলের মায়ের ওপর, সব ইতালীয়দের ওপর, যাদের এইটুকু ভব্যতাজ্ঞান নেই যে প্রেমের সম্পর্ক চুকে গেলেও অন্তত একটা বন্ধুত্বের ভাব জিইয়ে রাখা যেতে পারে। মাইকেল তাকে এতটা তুচ্ছ ভাবতে সাহস পেল কিভাবে?
না হয় শয্যাসঙ্গিনী হিসেবে ওকে সে চাইছে না, নাহয় ওকে বিয়ে করা সম্ভব নয় বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিন্তু তার তো অন্তত এটুকু মনে করা উচিত ছিল যে কে বন্ধু হিসেবেও তার ভাল মন্দ ভেবে দুশ্চিন্তায় থাকবেনাকি ভেবে নিয়েছে তাকে। সতীত্ব দান করার পর বিয়ে হবে না বুঝতে পেরে আত্মহত্যা করেছে কে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইতালীয় মেয়েদের মত? নাকি ভেবেছে খবর দিলেই বিয়ে করার জন্যে ঘাড়ে চেপে বসবে, না করলে গোলমাল পাকাবে, লোক জড়ো করবে?
বুঝেছি, ঠিক আছে, অসংখ্য ধন্যবাদ, গলাটাকে যথাসম্ভব সংযত রেখে বলল। কে। মাইকেল বাড়ি ফিরেছে, ভাল আছে, এটুকু জেনেই আমি খুশি। এর বেশি জানার কিছু নেই আমার। আর কখনও ফোন করব না আপনাকে।
অসহিষ্ণু কণ্ঠস্বর শুনে বোঝা গেল, কে-র ওপর খুব বিরক্ত হয়েছেন মিসেস কর্লিয়নি। এত দ্রুত কথা বলতে শুরু করলেন, মনে হলো কে-র কথা তিনি যেন শুনতেই পাননি। মাইকির সাথে দেখা করতে চাইলে এখুনি চলে এসো তুমি হঠাৎ তোমাকে দেখে সাঙ্ঘাতিক খুশি হবে ও। ট্যাক্সি নিয়ে এসো, আমাদের গেটের লোককে বলে রাখছি, সে-ই ভাড়াটা দিয়ে দেবে। ড্রাইভার হয়তো এতদূর আসতে আপত্তি করতে পারে, তুমি বলবে ডবল ভাড়া দেব। কিন্তু তুমি তাকে ভাড়া দেবে না। মাইকির বাপের লোক আছে গেটে, সে-ই দেবে।
তা হয় না, মিসেস কর্লিয়নি, ঠাণ্ডা গলায় বলল কে। বোঝাই যাচ্ছে আমার সাথে দেখা করার কোন ইচ্ছে মাইকেলের নেই। তা যদি থাকত, অনেক আগেই ফোন করত আমাকে ও। বাড়ির ফোন নাম্বার তো জানাই আছে ওর তার মানে, আমার সাথে কোন সম্পর্ক রাখতে চায় না ও। এই পরিস্থিতিতে আপনাদের বাড়িতে আমার যাওয়া চলে না।
তুমি খুব ভাল মেয়ে, চটপট উত্তর দিলেন মিসেস কর্লিয়নি। তোমার পায়ের গড়ন খুব সুন্দর। কিন্তু যাকে বলে বুদ্ধি, সে জিনিসটা খুব বেশি নেই তোমার মাইকির সাথে নয়, তুমি আমার সাথে কথা বলতে আসছ। তোমার সাথে গল্প করতে চাই আমি দেখো, দেরি কোরো না যেন আবার, এখুনি চলে এসো ট্যাক্সির ভাড়া তুমি দেবে না, মনে আছে তো? তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি আমি কুট করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবার শব্দ হলো।
আবার ফোন করতে পারে কে, বলতে পারে লং বীচে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু কথাটা একবারও ভেবে দেখল না ও। নিজেকে বোঝাল অন্তত ভদ্রতার খাতিরে হলেও মাইকের মার সাথে দেখা করা দরকার একবার। মিসেস কর্লিয়নির। কথা শুনে মনে হলো, মাইকেলের নিউইয়র্কে ফিরে আসাটা কোন গোপনীয় ব্যাপার নয়। তার মানে তার আর কোন বিপদের ভয় নেই, এখন স্বাভাবিকভাবেই দিন কাটাচ্ছে। লাফ দিয়ে খাট থেকে নামল কে, খুব যত্ন করে পোশাক পরল, সাজল, মেক-আপ লাগাল। বেরুবার আগে আরেকবার দাঁড়াল আয়নার সামনে। মাইকেলের সাথে শেষ দেখা হবার পর চেহারাটা কি ভাল হয়েছে আরও? নাকি বিচ্ছিরি রকম বেশি মনে হচ্ছে বয়সটা? সন্দেহ নেই, কাঠামোয় নারীত্বের ভাব আরও প্রকট হয়ে ফুটে উঠেছে। কোমরের কাছটা আরও সুগোল এখন, বুকটা আরও কত ভারি। সবাই বলাবলি করে ইতালীয়রা নাকি এই রকমই ভালবাসে। কিন্তু মাইকেল ওর সম্পর্কে সব সময় অন্য কথা বলত, ও এত রোগা বলেই নাকি ওকে অত ভাল লাগে। তবে, এ-সবে এখন আর কিছুই এসে যায় না। ওর কথা ভুলে গেছে মাইকেল। কোন সম্পর্কই রাখতে চায় না। তা না হলে ছমাস হলো বাড়ি ফিরেছে, একটা ফোন পর্যন্ত করল না!
