কে যেন আলো জ্বালল একটা। সাদা আলোর ঝলক লাগল ওর বন্ধ চোখের পাতায় মাথাটা ফেরাল ও। অসম্ভব ভারি আর অবশ লাগছে। এখনও ওর ওপর ঝুঁকে রয়েছে মুখটা চিনতে পারল ডাক্তার তাজার মুখ।
তোমাকে একবার খেই নিভিয়ে দেব আলোটা, কোমল স্নেহের সুরে বললেন ডাক্তার তাজা। ছোট পেন্সিল টর্চটা আবার জ্বাললেন তিনি, আলো ফেললেন মাইকেলের চোখে। কোন ভয় নেই, সুস্থ হয়ে উঠবে তুমি। আরও কেউ একজন আছে কামরায়, তার দিকে ফিরে আবার বললেন, ইচ্ছে করলে এখন ওর সাথে কথা বলতে পারো।
খাটের কাছাকাছি একটা চেয়ারে বসে আছেন ডন টমাসিনো। এতক্ষণে তাঁকে স্পষ্ট দেখতে পেল মাইকেল।
মাইকেল? মাইকেল? তোমার সাথে কথা বলতে পারব? নাকি খারাপ লাগছে, বিশ্রাম করার ইচ্ছা?
কথা বলতে পারল না মাইকেল, হাত তুলে ইশারা করল।
কে এনেছিল গাড়িটা গ্যারেজ থেকে? জানতে চাইলেন ডন টমাসিনো। ফ্যাব্রিযযিয়ো?
কিছু চিন্তা না করেই, নিজের অজান্তে হসিল মাইকেল-বরফের মত ঠাণ্ডা অদ্ভুত এক সম্মতির হাসি।
ফ্যাব্রিযযিয়ো গায়েব হয়ে গেছে, বললেন ডন টমাসিনো। আমার কথা সব বুঝতে পারছ তো তুমি, মাইকেল? প্রায় এক হপ্তা অজ্ঞান থাকার পর আজ তোমার জ্ঞান ফিরেছে। সবাই জানে তুমি বেঁচে নেই। বুঝতে পারছ? তার মানে, তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ, ওরা তোমাকে খুঁজছে না। খবরটা পেয়ে আমেরিকা থেকে তোমার বাবা কয়েকটা নির্দেশ পাঠিয়েছেন আমেরিকায় ফিরে যেতে তোমার আর খুব বেশি দেরি নেই। তার আগে পর্যন্ত এখানে তুমি নিরিবিলিতে বিশ্রাম করবে। এটা পাহাড়ের ওপর আমার একটা ছোট খামার বাড়ি, এখানে তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ, কোনও ভয় নেই। পালার্মোর লোকেরা আপোস করেছে আমার সাথে, তার কারণ, ওরা জানে মারা গেছ তুমি। হ্যাঁ, আসলে তুমিই ওদের হামলার লক্ষ্য ছিলে। ওরা তোমাকেই খুন করার সুযোগে ছিল, কিন্তু সবাইকে ভাবতে দিয়েছিল তোমাকে নয় আমাকে খুন করতে চায়। বিশেষভাবে এই কথাটা তোমার জানা উচিত, তাই এত কথা বলছি। আর সব ব্যাপার আমার ওপর ছেড়ে দাও তুমি, সবদিক খুব ভালই সামলাতে পারব আমি। তুমি শুধু সুস্থ হয়ে ওঠো। মনটাকে শক্ত করো।
একে একে সব কথা মনে পড়ছে এখন মাইকেলের। জানে, অ্যাপলোনিয়া মারা গেছে। মারা গেছে কার্লো। বুড়ি ফিনোমিনার কথা মনে পড়ল। কিচেন থেকে ওর সাথে সে-ও বাইরে বেরিয়ে এসেছিল কিনা স্মরণ হলো না। ফিস ফিস করে জানতে চাইল ও, ফিলোমিনা?
শান্ত গলায় ধীরে ধীরে বললেন ডন টমাসিনো, কোথাও আঘাত পায়নি, শুধু বিস্ফোরণের ধাক্কায় রক্ত বেরিয়েছে নাক দিয়ে। তার কথা ভেবে দুশ্চিন্তা কোরো না।
ফ্যাব্রিযযিয়ো, মৃদু গলায়, ফিস ফিস করে বলল মাইকেল। ফ্যাব্রিযযিয়ো। হু বেশ, আপনার রাখালদের জানিয়ে দিন, ওকে আমি চাই। কেউ যদি সিসিলির সেরা ঘাস-জমির মালিক হতে চায়, ফ্যাব্রিযযিয়োকে এনে দিক আমার কাছে।
মস্ত একটা হাঁফ ছাড়লেন ডন টমালিনো আর ডাক্তার তাজা তো নিঃশব্দে হেসেই ফেললেন। পাশের একটা টেবিল থেকে হলদেটে পানায় ভরা একটা গ্লাস তুলে নিয়ে তাতে চুমুক লাগালেন ডন টমাসিনো সাথে সাথে মাথাটা পরিষ্কার হয়ে উঠল তার।
হাসিটা মুখ থেকে মুছে ফেলে খাটের ওপর বসলেন ডাক্তার তাজা। একটু অন্যমনস্কভাবে বললেন, তোমার স্ত্রী মারা গেছেন, তুমি এখন বিপত্নীক। জানো তো, সিসিলিতে বিপত্নীকের সংখ্যা খুবই কম, নেই বললেই চলে। ভাবটা যেন, এই বৈশিষ্ট্যটুকুর জন্যে খানিকটা সান্তনা পাবে মাইকেল।
ইশারা করল মাইকেল। সাথে সাথে ওর দিকে আরও ঝুঁকে পড়লেন ডন টমাসিনো।
বাবাকে খবর পাঠান, শান্ত গলায় বলল মাইকেল। আমি বাড়ি ফিরতে চাই। আঁকে জানান, তার ছেলে হতে চাই আমি।
কিন্তু পুরোপুরি সেরে উঠতে আরও একটা মাস সময় লাগল মাইকেলের। সুস্থ হয়ে ওঠার পরও সাথে সাথে দেশে ফিরতে পারল না সে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যোগাড়, এবং অন্যান্য কাজ সারতে সময় লেগে গেল আরও দুটো মান। তারপর প্লেনে চড়ে পালার্মো থেকে বোম, বোম হয়ে সোজা নিউইয়র্ক। এই তিন মাসে কোথাও ছায়া পর্যন্ত দেখেনি কেউ ফ্যাব্রিযযিয়ো নামের সেই রাখালের।
৪.০৩ আমেরিকা নিউ হ্যাম্পশায়ার
০৩.
আমেরিকা নিউ হ্যাম্পশায়ার। কলেজ থেকে ডিগ্রি নিয়ে লেখাপড়ার পাট অনেক আগেই চুকিয়ে ফেলেছে কে অ্যাডামস। একটা গ্রেভ স্কুলে শিক্ষিকার দায়িত্ব নিয়েছে সে।
মাইকেল অদৃশ্য হয়ে যাবার প্রথম ছমাস কর্লিয়নি পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে এসেছে কে। প্রতি হপ্তায় মিসেস কর্লিয়নিকে ফোন করতে ভুল হত না তার। প্রতিবারই তিনি ওর সাথে খুব ভাল ব্যবহার করেছেন। সস্নেহে বলতেন, তোমার মত ভাল মেয়ে হয় না। কিন্তু মাইকের কথা ভুলে যেতে হবে তোমাকে। অন্য কোন ছেলে দেখে বিয়ে করে ফেল।
কথাগুলো স্পষ্ট, কিন্তু রূঢ় নয়। কে বুঝতে পারত ওর শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবেই কথাগুলো বলছেন তিনি। সেজন্যে কিছু মনে করত না সে। তাকে তিনি ছেলেমানুষ বলে মনে করতেন, আর যা ঘটে গেছে তা কোন দিন ফেরানো সম্ভব নয় বলে বিশ্বাস করতেন।
স্কুলে প্রথম টার্ম শেষ হলো কে সিদ্ধান্ত নিল নিউইয়র্কে যাবে। কিছু বন্ধু বান্ধবের সাথে দেখা করাও দরকার, ভদ্রগোছের কিছু পোশাক-আশাক কেলনারও সময় হয়েছে। সেই সাথে ভেবে রেখেছে মনের মত একটা চাকরি বা আর কিছু যদি জুটে যায়, ওখানেই থেকে যাবে সে। দুটো বছর তো কাটাল সন্ন্যাসিনীর মত। এই দুবছর কোন পুরুষ বন্ধুর সাথে দেখা পর্যন্ত করতে অস্বীকার করেছে সে। বই পড়ে আর অধ্যাপনা করে কাটিয়েছে সময়টা। লং বীচে টেলিফোন করার অভ্যাসটা শ্রাগ করেছে অনেক দিন আগেই, বাড়ি থেকে বলতে গেলে কাজ ছাড়া বড় একটা বের হয়নি, দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে নিজেকে; তাতে ফল যে ভাল কিছু হয়েছে তা নয়, বরং মেজাজটা সব সময় খারাপ হয়ে থাকে ওর। ইদানীং বুঝতে পারে, এভাবে জীবন কাটানো সম্ভব নয়।
