হলঘরের ওদিকে হাত-মুখ ধুতে গেল মাইকেল। আশপাশে কোথাও দেখা যাচ্ছে না অ্যাপলোনিয়াকে। হয়তো কিচেনে গিয়ে খাবার তৈরি করছে ওর জন্যে। মাইকেলের সাথে এক সাথে যেতে পারছে না বলে বিবেকের একটু দংশন অনুভব করছে হয়তো। মাইকেল তাকে সাথে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু সিসিলির আরেক প্রান্তে চলে যেতে হচ্ছে, তাই মা-বাপ-ভাইদের সাথে কটা দিন কাটিয়ে যেতে চাইছে সে! বিবেককে একটু শান্ত করার জন্যে হয়তো আজ সে রাঁধতে বসেছে।
কিন্তু কিচেনে নেমে এসে অ্যাপলোনিয়াকে দেখতে পেল না মাইকেল। ওকে কফি দিয়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল বুড়ি ফিলোমিনা, পিছন থেকে বলল মাইকেল, তোমার কথা বাবাকে বলব আমি। একটু থেমে হাসল বুড়ি, তারপর মাথা দোলাল।
কার্লো ভেতরে ঢুকল, বাইরে তোমার জন্যে গাড়ি অপেক্ষা করছে, মাইকেলকে বলল সে। ব্যাগ নিয়ে আসি সব?
না, বলল মাইকেল। আমি আনছি। অপলা কোথায়?
আমুদে হাসিতে ভরে উঠল কার্লোর মুখ! গাড়ির ড্রাইভিং সীটে বসে আছে, স্টার্ট দেবার জন্যে হাত দুটো নিশপিশ করছে যাই বলো, ও কিন্তু আমেরিকায় পৌঁছুবার আগেই মার্কিনী বনে যাচ্ছে। কার্লো কিছু বাড়িয়ে বলছে না। চাষী পরিবারের একটা মেয়ে গাড়ি চালানো শিখেছে, সিসিলিতে এর চেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না।
অ্যাপলোনিয়াকে একা একাও গাড়িটা চালাতে দেয় বটে মাইকেল, কিন্তু সব সময় পাশে থাকে ও। বাড়ির ভেতরই প্র্যাকটিস করে অ্যাপলোনিয়া, আজ পর্যন্ত বাইরে একবারও গাড়ি নিয়ে বেরোয়নি সে। চালানোটা এখনও রপ্ত করতে পারেনি ঠিকমত, প্রায়ই ব্রেক চাপতে গিয়ে ভুল করে অ্যাকসিলারেটরে চাপ দিয়ে ফেলে।
ফ্যাব্রিকে নিয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করে গাড়িতে, কার্লোকে বলল মাইকেল। কিচেন থেকে বেরিয়ে এল ও, একসাথে দুতিনটে করে সিঁড়ির ধাপ টপকে দোতলায় উঠল। ব্যাগগুলো আগেই গোছানো হয়েছে। তুলে নেবার আগে জানালা দিয়ে নিচে কাল একবার, দেখল গাড়িটা কিচেনের দরজার সামনে নয়, গাড়িবারান্দার সামনে রয়েছে।
গাড়ির ভেতর দেখা যাচ্ছে অ্যাপলোনিয়াকে। হাত দুটো স্টিয়ারিং হুইলের ওপর সত্যি নিশপিশ করছে। পিছনের সীটে খাবারের টুকরি নামিয়ে রাখছে কার্লো। কিন্তু ফ্যাব্রিযযিয়োকে এই মুহূর্তে কোথাও দেখতে পেল না মাইকেল। তারপর হঠাৎ চোখে পড়ল ওকে। বিরক্ত হলো মাইকেল। বাগানবাড়ির গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে, খুব ব্যস্ত ভাবে, যেন হঠাৎ জরুরী কি একটা কাজের কথা মনে পড়ে গেছে তার। ব্যাটা করছেটা কি? এই সময় পিছন ফিরে তাকাল ফ্যাব্রিযযিয়ো, চোখে কেমন যেন চোরা চাহনি। ছোকরাকে একটু শাসন করতে হবে, নিজেকে মনে করিয়ে দিল মাইকেল। নিচে নেমে আবার কিচেনে ঢোকার ইচ্ছে রয়েছে ওর, আরেকবার বিদায় নেবে বুড়ি ফিলোমিনার কাছ থেকে। তাই করল। কথা শেষ করে জানতে চাইল, ডাক্তার তাজা কোথায়? এখনও ঘুমাচ্ছেন নাকি?
বুড়ো মোরগদের সূর্য ওঠার তর সয়না, ফিলোমিনার আঁকিবুকি কাটা মুখে ধূর্ত ভাব ফুটে উঠল। কাল রাতেই পালার্মোয় চলে গেছেন তিনি।
হাসল মাইকেল। পালার্মোর বেশ্যাপাড়ার কমবয়েসী মেয়েগুলোর সান্নিধ্য না পেলে পেটের খাবার হজম হয় না ডাক্তার তাজার।
কিচেনের দরজার সামনে এসেদিাড়াল ও! সাথে সাথে নাকে এসে লাগল লেবু ফুলের গন্ধ। গত কমাসের স্মৃতি হঠাৎ পীড়া দিল ওকে। চলে যেতে হচ্ছে, কে জানে আবার কোনদিন ফেরা হবে কিনা! এগোতে যাবে, হঠাৎ অ্যাপলোনিয়াকে হাত নাড়তে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল ও।
হাত পনেরো দূরে গাড়িটা। অ্যাপলোনিয়া চাইছে মাইকেল ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকুক, গাড়ি নিয়ে সেই আসবে ওর কাছে। গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে কার্লো, দুপাটি দাঁতের সবগুলো বের করে হাসছে সে। হাতে ঝুলছে লুপারা। কিন্তু ফ্যাব্রিযযিয়োর ছায়া পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না কোথাও।
ঠিক এই মূহুর্তে, কেমন করে যেন আচমকা সব পরিষ্কার বুঝে ফেলল মাইকেল। সচেতনভাবে কিছু চিন্তা করেনি ও আত্মরক্ষার সহজাত বুদ্ধিতেই ধরা পড়েছে ব্যাপারটা। মুহর্তে উন্মাদের মত হয়ে উঠল ওর চেহারা। গলার সবটুকু জোর দিয়ে চিৎকার করে নিষেধ করল অ্যাপলোনিয়াকে, না! না
কিন্তু দেরি হয়ে গেছে এরই মধ্যে, ইগনিশনে চাবি দিয়ে ফেলেছে অ্যাপলোনিয়া। প্রচণ্ড বিস্ফোরণের আওয়াজে চাপা পড়ে গেল মাইকেলের চিৎকার। বিস্ফোরণের ধাক্কায় কিচেনের দরজাটা ভেঙে খান খান হয়ে গেল, ছিটকে পড়ল মাইকেল দশ হাত দূরে। বাগানবাড়ির পাচিলে গিয়ে পড়ল সে, সেখান থেকে মাটিতে। পর মুহূর্তে ওপর থেকে বাড়ির পাথরের ছাদ ধসে পড়ল ওর কাঁধে আর মাথায়।
এখনও জ্ঞান রয়েছে ওর বুঝতে পারছে, মারা যায়নি সে। বোকার মত তাকাচ্ছে চারদিকে, যেন পেষ নিঃশ্বাস ফেলার আগে দুনিয়াকে দেখে নিচ্ছে। কোথাও নেই আলফা রোমিওটা, চারটে চাকা আর চাকাগুলো জোড়া লাগাবার দুটো ডাণ্ডা ছাড়া তার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। হঠাৎ সব অন্ধকার হয়ে গেল।
.
জ্ঞান ফিরল মাইকেলের। কামরাটা অন্ধকার লাগছে। কার যেন কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছে ও অস্পষ্ট, বোঝা যাচ্ছে না কিছু! সহজাত বুদ্ধিতেই অচেতন হয়ে থাকার ভান করছে ও। কিন্তু কিভাবে যেন টের পেয়ে গেল ওরা, কেউ আর কথা বলছে না এখন। চোখ না খুলেও বুঝতে পারল মাইকেল, কে যেন খাটের ওপাশ থেকে ঝুঁকে পড়ল ওর ওপর। গলাটা চেনা গেল না, তবে স্পষ্ট যীশুর দয়ায় আবার আমাদের কাছে ফিরে এসেছে ও?
