ধীরে ধীরে ফিলোমিনার দিকে ফিরুল লুকা। ছ্যাৎ করে উঠল ফিলোমিনার বুক। সভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল সে।
যা করতে বলেছি তাই করো–যাও, চাপা কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠল নিস্তব্ধ কামরার ভেতর। আবার বলল লুকা, তোমার কোন অভাব রাখব না। যাও।
ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল ফিলোমিনা। কথা বেরুল না মুখ থেকে। দ্রুত মাথা নাড়তে পারুল শুধু। কিন্তু সেটা লুকার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্যে যথেষ্ট নয়। বুঝতে পেরে প্রাণপণ চেষ্টায় ফিসফিস করে বলল, আমাকে মাফ করুন। আপনি ওর বাপ, যা হয় আপনি করুন।
তিন সেকেণ্ড নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকল লুকা। তারপর শার্টের ভেতর হাত গলিয়ে একটা ছোরা বের করল। তোমাকে কাটব, বলল সে।
এরপর কিছুক্ষণ হুঁশ ছিল না ফিলোমিনার। কারণ আবার যখন সুস্থ বোধ করল সে, চিন্তা শক্তি ফিরে পেল, দেখল বাড়িটার নিচে বেসমেন্টে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে দেখা যাচ্ছে প্রকাণ্ড চুলোটা। সদ্যজাত শিশুকে এখনও বুকের সাথে জাপটে ধরে আছে সে। আশ্চর্য, মায়ের পেট থেকে বেরুবার পর থেকে এখন পর্যন্ত একবারও কাঁদেনি সে–যেন প্রতিবাদ করে কোন লাভ নেই জানতে পেরে চুপচাপ থাকারই সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিষ্পাপ শিশু। কিন্তু ফিলোমিনা চাইছে, একবার অন্তত কেঁদে উঠুক বাচ্চাটা। তাতে যদি লুকার প্রাণে একটু দয়া হয় একটা চিমটি কাটলেই ব্যথা পেয়ে কেঁদে ওঠে ও, কিন্তু দিশেহারা ফিলোমিনার মাথায় বুদ্ধিটা এল না।
চুলোর দরজা কেউ একজন খুলে দিয়ে গেছে। ভেতরে আগুন দেখা যাচ্ছে। বেসমেন্টে লুকা আর ফিলোমিনা ছাড়া কেউ নেই। চারদিকে গরম পানির পাইপ দেখা যাচ্ছে, ঘামের মত বিন্দু বিন্দু পানি ঝরছে পাইপের গা থেকে। ইঁদুর-ইঁদুর বোটকা একটা গন্ধ ঢুকছে নাকে!
ছোরাটা আবার কখন যেন বের করে হাতে নিয়েছে লুকা। ফিলোমিনা জানে, ওকে খুন করার জন্যে তৈরি হয়ে আছে সে।
আগুনের দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল ফিলোমিনা। ধীরে ধীরে লুকার দিকে তাকাল আরেকবার। বুঝতে পারল, প্রকৃতিস্থ অবস্থায় নেই লোকটা! মুখটা বিকৃত হয়ে গেছে। শয়তানের চেহারাও বুঝি এমন বীভৎস নয়। খালি হাতটা দিয়ে ওকে ধাক্কা দিল সে। ধাক্কাটা সামলাতে না পেরে চুলোর ভোলা দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেল ফিলোমিন।
অসহায় ফিলোমিনা জানে, কিছুই তার করার নেই। লুকার হুকুম অমান্য করতে পারে সে, তাতে খুন হতে হবে। কিন্তু খুন হয়ে লাভ কি যদি না বাচ্চাটাকে বাঁচানো যায়?
গল্প থামিয়ে চুপ করল ফিলোমিনা। তাকে এক গ্লাস মদ দিল মাইকেল! সেটা খেয়ে বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকল সে। ঠোঁট জোড়া নড়ে উঠল, বিড়বিড় করে প্রার্থনা করছে সে।
কাজটা তুমি করলে? কোমল গলায় জানতে চাইল মাইকেল।
উপর নিচে মাথা দোলাল ফিলোমিনা।
তারপর কি হলো?
গল্পটা আবার বলতে শুরু করল ফিলোসিনা এক বান্ডিল টাকা দিয়ে তাকে গাড়িতে তুলে বাড়ি পাঠিয়ে দিল লুকা। বিদায় দেবার আগে গভীর সুরে জানাল, মুখ খুললে মরতে হবে ফিলোমিনাকে। ফিলোমিনা মুখ খোলেনি। কিন্তু দুদিন পরই পুলিশ এসে বেঁধে নিয়ে গেল লুকাকে। কারণ শিশুর মাকে খুন করেছিল সে।
কয়েক দিন বাড়ি ছেড়ে ভয়ে কোথাও বের হত না ফিলোমিনা। তারপর মনস্থির করে গড ফাদারের কাছে গেল সে, তাকে সব কথা খুলে বলল সব শুনে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর সম্পূর্ণ আশ্বাস দিয়ে ফিলোমিনাকে বললেন, তোমার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমি নিলাম। কিন্তু এ-ব্যাপারে কাউকে তুমি কিছু বোলো না।
গড ফাদারের আশ্বাস পেয়েও খুব একটা নিরাপদ বোধ করেনি ফিলোমিনা। তার কারণ, লুকা ব্রাসি তখনও ডন কর্লিয়নির কাজ করে না
ডন কর্লিয়নি কোন পদক্ষেপ নেবার আগেই সেলে বসে লুকা ব্রাসি আত্মহত্যার চেষ্টা করল। ভাঙা কাঁচের টুকরো দিয়ে নিজের গলা কেটে ফেলেছিল, কিন্তু দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ায় বেঁচে গেল সে। ওদিকে, সে সুস্থ হয়ে ওঠার আগেই তাকে পুলিশ এবং আইনের হাত থেকে বঁচাবার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করে ফেললেন ডন কর্লিয়নি। আদালতে প্রমাণ দাখিল করার মত কিছুই পেল না পুলিশ, বেকসুর খালাস পেয় গেল লুকা।
ডন কর্লিয়নি ফিলোমিনাকে সম্পূর্ণ আশ্বাস দিলেও পুলিশ বা লুকার তরফ থেকে বিপদ হতে পারে এই ভয় কাটেনি তার কাজে মন বসে না, সব সময় গা ছমছম করে। শেষ পর্যন্ত সব কথা খুলে বলল স্বামীকে লোকটা ভাল ছিল, সব কথা বুঝল সে! মুদি দোকান বিক্রি করে ইটালিতে ফিরে আসতে রাজী হলো।
ফিরে এল ওরা। আমেরিকায় কঠোর পরিশ্রম করে প্রচুর টাকা রোজগার করেছিল ফিলোমিনার স্বামী, কিন্তু ইটালিতে ফিরে এলে দুর্বল লোকটা সব টাকা উড়িয়ে দিল। তাই তো আজ এই অবস্থা ফিলোমিনার, পরের দোরে চাকরানীর কাজ করতে হচ্ছে।
শেষ হলো ফিলোমিনার গল্প। মাইকেলের হাত থেকে আরেক গ্লাস মদ নিয়ে খেলো সে।
মাইকেল কর্লিয়নি, বলল বুড়ি, তোমার বাবা খুব ভাল মানুষ, যখনই গির্জায় যাই তখনই তার জন্যে প্রার্থনা করি। আমার আশীর্বাদ সব সময় তার সাথে আছে। টাকার দরকার হলে কখনও তিনি নিরাশ করেননি, খবর পেয়েই পাঠিয়ে দিয়েছেন। কেন আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ, বুঝলে তো এখন? উনি শুধু আমার প্রাণই বাঁচাননি, বেঁচে থাকার জন্যে সাহায্যও করেছেন। তাকে বোলে, মৃত্যুর পর তার কোন ভয। নেই। আমি তার আত্মার কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করি।
