এক নিশুতি রাতের ঘটনা। ফিলোমিনার জীবনে সেটা একটা অভিশপ্ত রাতও বটে। পাড়ার সব ভাল মানুষ যে যার বাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছে, এই সময় কে যেন তার দরজায় টোকা দিল। এত রাতে কে ডাকে? ভয় পায়নি ফিলোমিনা, কারণ সে জানে, পাপ আর পাপীতে ভরা এই দুনিয়ায় নিরাপদে ঢোকার জন্যে খুব বৃদ্ধি করে। এই নিশুতি রাতকেই বেছে নেয় শিশুরা। তাড়াতাড়ি কাপড় পরে নিয়ে দরজা খুলে দিল সে সামনে একজন লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাকে দেখেই শিউরে উঠল ফিলোমিনা। সুকা ব্রাসি! ইতালীয় পাড়ার সবচেয়ে নিষ্ঠুর লোক বলে বদনাম আছে এর। তাছাড়া, পাড়ার সবাই জানে, লুকা বিয়ে করেনি। তার মানে, কোন অবৈধ কাজ করিয়ে নেবার জন্যে এসেছে। ফিলোমিনার স্বামী তখনও বেঁচে, তাই লুকাকে দেখে প্রথমে তার স্বামীর নিরাপত্তার কথাটাই মনে পড়ল। ভাবল, লুকা নিশ্চয়ই তার স্বামীর কোন ক্ষতি করতে এসেছে। ছোটখাট কোন ব্যাপারে কেউ সাহায্য করতে। অৰীকার করলে লুকা তার চরম সর্বনাশ করতে দ্বিধা করে না।
অনিষ্ট করার উদ্দেশ্য নিয়েই এসেছে লুকা, কিন্তু ফিলোমিনার স্বামী তার লক্ষ্য নয়। বলল, এ পাড়া থেকে কিছুটা দূরে একটা মেয়ের প্রসব হবে, এখুনি সেখানে যেতে হবে ফিলোমিনাকে। সেই মুহূর্তে বুঝে নিল ফিলোমিনা, নিশ্চয়ই কোথাও কোন গোলমাল আছে তাকিয়ে দেখল, পাষাগটাকে আজ রাতে কেমন যেন অস্থির, উন্মাদ মত দেখাচ্ছে। ভূতে পাওয়া মানুষের মত দিশাহারা। খুব ভয়ে ভয়ে মৃদু আপত্তি জানাল ফিলোমিনা। কর্কশ একটা চাপা আওয়াজ বেরিয়ে এল লুকার গলার ভেতর থেকে। ফিলোমিনার হাতে কয়েকটা কাগজের নোট গুঁজে দিয়ে গভীরভাবে। বলল সে, কথা নয়। আমার সাথে এসো সেই জলদগম্ভীর আদেশ অমান্য করার সাহস হলো না ফিলোমিনার।
একট। ফোর্ড গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে রাস্তায়। ড্রাইভারের সীটে বসে আছে কারই এক সহচর। পাড়ার বাইরে সেই বাড়িটায় পৌঁছুতে আধঘন্টাও লাগল না। লং আইল্যান্ড সিটির ঠিক পূলের ওপর ছোট্ট কাঁঠের তৈরি বাড়িটা। খুব জোর হলে কোনরকমে দুটো পরিবার থাকতে পারে ওখানে, কিন্তু একটু পরই জানা গেল লুকা আর তার সহচররা ছাড়া আর কেউ থাকে না।
ভেতরে ঢুকে ফিলোমিনা দেখল কয়েকজন গুণ্ডা কিচেনে বসে মদ গিলছে আর জুয়া খেলছে। ওপর তলার একটা বেডরুমে তাকে নিয়ে এল লুকা। অল্প বয়েসী একটা মেয়ে শুয়ে আছে খাটে। খুবই সুন্দরী। রঙের প্রলেপ রয়েছে মুখে, চুলগুলো লাল, পেটটা শুয়োরের মত ফুলে উঠেছে। দেখে আইরিশ বলে মনে হলো, চেহারায় ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে শুয়ে আছে সে। ওদের দুজনকে দেখেই আঁতকে উঠল, হ্যাঁ আঁতকে উঠল, তারপর দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্য দিকে পাশ ফিরল। লকা ব্রাসির চেহারায় ভয়ঙ্কর একটা বিদ্বেষের ভাব লেপ্টে রয়েছে, তাই দেখে ঠক ঠক করে কাঁপছে ফিলোমিনা।
নিঃশব্দে কামরা থেকে বেরিয়ে গেল লুকা ব্রাসি। ধাত্রী ফিলেমিনাকে সাহায্য করল লুকারই দুজন সহকারী। পোয়াতী তেমন কষ্ট পেল না, সহজেই বেরিয়ে এল বাচ্চাটা। সাথে সাথে ক্লান্তিতে ঢলে পড়ল মা, ঘুমিয়ে পড়ল। খবর পেয়ে কামরায় ফিরে এল লুকা।
নবজাতককে কম্বলে জড়িয়ে নিয়ে এগোল ফিলোমিনা। লুকা ব্রাসির সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে, তার দিকে বাড়িয়ে ধরল বাচ্চাকে, বলল, আমার কাজ শেষ। আপনি যদি এর বাবা হন, নিন।
ফিলোমিনার দিকে নিঃশব্দে তাকাল লুকা। ভয়ে আবার কাঁপতে শুরু করল ফিলোমিনা। আবার সেই পাগলের মত দেখাচ্ছে লুকাকে, কি যেন একটা অশুভ শক্তি ভর করেছে তার ওপর, কি যেন একটা অসম্ভব কথা চিন্তা করছে সে।
হ্যাঁ, আমিই ওর বাবা,কর্কশ গলায় বলল লুকা কিন্তু এই বংশের কেউ বেঁচে থাকুক তা আমি চাই না। ওকে নিয়ে বেসমেন্টে চলে যাও, ফেলে দাও চুলোয়।
ফিলোমিনার মনে হলো, ঠিক কি বলতে চাইছে লুকা তা সে বুঝতে পারছে না। বংশের কথা কেন তুলল সে? মেয়েটা ইতালীয় নয়, সেজন্যে? নাকি সে বেশ্যা বলে? অথবা লুকার ঔরসে যে জন্মেছে তার বেঁচে থাকার অধিকার নেই, যোগ্য নয়? কিন্তু পরমুহূর্তে ভাবল, এসব কিছু না, ব্যাপারটা আসলে লুকার নির্দয় একটা ঠাট্টা।
আপনার সন্তান, কার কি বলার আছে-যা ইচ্ছে করুন। ছোট্ট পোটলাটা লুকার দিকে আরেকটু বাড়িয়ে দিল ফিলোমিনা।
ঠিক এই সময় ঘুম ভেঙে গেল মায়ের। পাশ ফিরল সে, ওদের দিকে তাকাল। দেখল, থমথম করছে লুকার চেহারা। কম্বলে জড়ানো পোটলাটা ঠেলে ফিরিয়ে দিচ্ছে ফিলোমিনার বুকের ওপর। লুকা! আঁতকে উঠল মা। ও, লুকা! ওকে তুমি মাফ করো! সদ্যজাত সন্তানের হয়ে ক্ষমা চাইল সে। ওকে রেহাই দাও! তোমার পায়ে পড়ি, ওকে নয়, তুমি আমাকে…
ঘাড় ফিরিয়ে তার দিকে তাকাল লুকা।
ফিলোমিনা দেখল, ঘৃণায় বিকৃত হয়ে উঠেছে ওর চেহারা। সদ্যজাত শিশুর মায়ের দিকে তাকাল ফিলোমিনা। তার চেহারাতেও ফুটে উঠেছে তীব্র ঘৃণা। দুই হিংস্র জানোয়ার যেন পরস্পরকে চিনতে পেরে প্রচণ্ড আক্রোশে ফুঁসছে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, দুজনের কেউই এখন দুনিয়ার কোন ব্যাপারে সচেতন নয়, শিশুটির কথাও ভুলে গেছে ওরা পরস্পরের প্রতি ওদের ঘৃণা আর ক্রোধ প্রতি সেকেণ্ডে শুধু বেড়েই চলেছে।
হিংস্র পশুর মত পরস্পরের দিকে আরও অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল ওরা। অদ্ভুত এক পৈশাচিক লালসা ফুটে উঠেছে লুকার চেহারায়। খুনের নেশায় পাগল দেখাচ্ছে ওকে।
