বিয়ের পর প্রথম কটা দিন রোজ আলফা রোমিও চড়ে পিকনিক করতে গেল ওরা। একদিন মাইকেলকে ডেকে ডন টমাসিনো বললেন, মাইকেল, তোমার আর একটু সতর্ক হয়ে চলা দরকার।
অবাক হয়ে জানতে চাইল মাইকেল, কেন বলুন তো?
ডন টমাসিনো জানালেন, বিয়েটা ধুমধামের সাথে হওয়ায় ইটালির এই এলাকায় মাইকেলের পরিচয় কারও আর জানতে বাঁকি নেই, তাই কর্লিয়নি পরিবারের শত্রুদের চোখ খুলে গেছে। তিনি আভাস দিলেন শত্রুদের লম্বা হাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এই ছোট্ট দ্বীপেও পৌচেছে।
বাগানবাড়ির চারদিকে সশস্ত্রগার্ড মোতায়েন করা হলো। বাড়ির ভেতর থাকল আরও দুজন সশস্ত্র প্রহরী, কার্লো আর ফ্যাবিযিয়ো। সেদিন থেকে বলতে গেলে বাড়ির ভেতর বন্দী জীবন কাটাতে শুরু করল মাইকেল আর অ্যাপলোনিয়া।
অ্যাপলোনিয়াকে নিয়েই সময় কাটে মাইকেলের। তাকে ইংরেজি লিখতে আর পড়তে শেখায়, বাড়ির উঠানে গাড়ি চালানো শেখায়, কিছু কিছু আদব-কায়দা রপ্ত করার জন্যে তালিমও দেয়। এই সময়টা খুবই অন্যমনস্ক দেখায় ডন টমাসিনোকে। সব সময় কি যেন চিন্তা করেন, ভাল করে কথা বলেন না কারও সাথে। ব্যাপারটা কি জানার জন্যে ডাক্তার তাজাকে একদিন প্রশ্ন করল মাইকেল। ডাক্তার বললেন, পালার্মোয় কিছু মাফিয়া নেতা উড়ে এসে জুড়ে বসেছে, তাদের সাথে বিরোধ দেখা দিয়েছে চুন টমাসিনোর।
এর মধ্যে একদিন এক ঘটনা ঘটল। বাড়ির বুড়ি ঝি এক পেয়ালা জলপাইয়ের আচার নিয়ে দেখা করতে এল মাইকেলের সাথে। সোজা বাগানে ঢুকে পড়ল সে। গ্রামেরই মেয়ে বুড়ি, এখানেই বড় হয়েছে সে। বেশ কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে মাইকেলকে দেখল সে, তারপর জিজ্ঞেস করল, সবাই একটা কথা বলছে, তা কি সত্যি? নিউ ইয়র্ক শহরের গড ফাদার, ডন ভিটো কর্লিয়নির ছেলে তুমি?
গোপনীয়তা এতদূর প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে মাথা নাড়লেন ডন টমাসিনো। কিন্তু বুড়ির সেদিকে ভ্রূক্ষেপ মাত্র নেই, সে মাইকেলের দিকে এমন নিবিষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল যেন মাইকেল কি উত্তর দেয় তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে তার। মৃদু হেসে মাথা নাড়ল মাইকেল। বাবাকে তুমি চেনো? জিজ্ঞেস করল ও।
মেটে রঙের আখরোটের মত কোঁচকানো মুখ বুড়ির, নাম/ফিলোমিনা। দাঁতগুলো ফিকে লাল রঙের, মুখের পাতলা খোলের ভেতর দেখা যায় সেগুলো। মাইকেলের ফাইফরমাস খাটে, কিন্তু আজ পর্যন্ত ওর সাথে বিশেষ কথা বলার গরজ দেখায়নি সে, কিন্তু আজ বুড়ি ব্যাকুল আগ্রহ নিয়ে শুধু কথা বলতে আসেনি, তার জীবনের মস্ত বড় একটা ভীতিও দূর করতে এসেছে। মাইকেলের কথা শুনে হাসল। বুড়ি, দুই কান পর্যন্ত গিয়ে ঠেকল তার আঁকিবুকি কাটা ঠোট্টজোড়া। অদ্ভুত এক কৃতজ্ঞ দৃষ্টি ফুটে উঠল চোখে। গড ফাদার সুস্থ থাকুন, বলল সে। যীশু তার মঙ্গল করুন। মাইকেলের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করুল সে, জানো, এই যে আজও আমি বেঁচে আছি, এ কার দান? গড ফাদারের। তিনি একবার আমার এটা, বুড়ি হাত দিয়ে নিজের মাথাটা দেখাল, বাঁচিয়েছিলেন। হ্যাঁ, মাইকেল কর্লিয়নি, তার দয়ায় সেবার আমার এই প্রিয় প্রাণটা রক্ষা পায়।
পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, আরও অনেক কথা বলার আছে ফিলোমিনার। উৎসাহ দেবার জন্যে একটু হাসল মাইকেল।
কিন্তু কি ভেবে যেন হঠাৎ ভয় পেয়ে চুপসে গেল বুড়ির চেহারা। খানিক ইতস্তত করার পর জানতে চাইল সে, আরেকটা কথা! আচ্ছা, লুকা ব্রাসি সত্যি মারা গেছে কিনা তুমি জানো, বাবা?
নিঃশব্দে মাথা নাড়ল মাইকেল, অমনি পরম স্বস্তির একটা ভাব ফুটে উঠল বুড়ির চেহারায়, মস্ত একটা হাঁফ ছাড়ল সে। বুকে ক্রুশ চিহ্ন একে বলল, যীশু মাফ করুন আমাকে, কিন্তু তবু চাই ওর আত্মা যেন অনন্ত নরকে পোড়ে।
বুড়ির কথা শুনে লুকা ব্রাসি সম্পর্কে অনেক আগের কৌতূহলটা আবার নতুন করে জেগে উঠল মাইকেলের মনে! বহুবার এই কৌতূহল মেটাবার চেষ্টা করেছে ও, কিন্তু হেগেন.আর সনি মুখ খুলতে রাজী হয়নি। লুকা সম্পর্কে এমন একটা রহস্য আছে যা নাকি একশো বছরের বুড়ো না হওয়া পর্যন্ত মাইকেলের শোনা উচিত নয়। হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে কথাটা জানার সুযোগ পেয়ে সেটাকে হাতছাড়া করার ইচ্ছে হলো না মাইকেলের। ও ধরেই নিয়েছে যে বুড়ি ব্রাসি-রহস্য অবশ্যই জানে। বুড়ির হাত ধরল ও, টেনে নিয়ে এসে নিজের পাশে বসল, তারপর তাকে এক গ্লাস মদ খেতে দিয়ে বলল, পুরানো দিনের অনেক কথা জানো তুমি, তাই না? সে-সব আমি শুনতে চাই। তুমি আমাকে বাবা আর লুকা ৰাসির গল্প বলো। কোথায় ওদের দেখা হলো, কে ওরা, কাকে কেমন চোখে দেখত… শুনেছি, লুকা নাকি বাবাকে সাংঘাতিক ভক্তি করত…কোন ভয় নেই তোমার, সব কথা নিয়ে বলো আমাকে।
কিন্তু ভয় তবু দুর হয় না ফিলোমিনার। অপ্রতিভভাবে অনুমতির জন্যে ডন টমাসিনোর দিকে তাকাল সে। মাথা নেড়ে সায় দিলেন তিনি। মাইকেলের উৎসাহ লক্ষ করে বুড়িকে মুখ বুজে থাকার নির্দেশ দিতে পারলেন না। ফিলোমিনার। কিসমিসের মত কালো চোখে খানিকটা স্বস্তি ফিরে এল, কোঁচকানো মুখে ক্ষীণ হাসি ফুটল একটু। গল্প বলতে শুরু করল সে। তার মুখ থেকে লুকা ব্রাসির গল্প শুনেই সন্ধ্যাটা কাটিয়ে দিল সেদিন ওরা।
ত্রিশ বছর আগের কথা।
নিউ ইয়র্ক। টেনথ এভিনিউ ইতালীয়দের পাড়া। ধাত্রীর কাজ করে ফিলোমিনা। এই সব ইতালীয় মেয়েরা ফি বছর বাচ্চা বিয়োয়, ভালই রোজগার হয়। তার। নিজের পেশায় যথেষ্ট জ্ঞান রাখে সে। প্রসবের সময় যদি কখনও অস্বাভাবিক জটিলতা দেখা দেয় বাড়ির কর্তারা ফিলোমিনার কথা অগ্রাহ্য করে ডাক্তার ডাকে। ডাক্তাররা ফিলোমিনার কাছ থেকে কিছু কিছু ব্যাপারে শিক্ষা লাভ করে ফিরে যায়। একটা মুদির দোকান আছে তার স্বামীর, তাতেও ভাল রোজগার হয় ওদের। কিন্তু স্বামী তার বাধ্য নয়, যখন যা ইচ্ছা তখন তাই করে বেড়ায়। মদ হত্যা খায়ই, জুয়াও খেলে। আর মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি করাটা তত তার একটা দুরারোগ্য ব্যাধি। এই করতে করতে লোকটা মারা গেল। ফিলোমিনা তার আত্মার কল্যাণের জন্যে গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা করে। তবে মারা যাবার সময় লোকটা তার জন্যে এক পয়সাও রেখে যায়নি।
