রওনা হবার সময় একটা ব্যাপার লক্ষ করে অবাক হয়ে গেল মাইকেল। সম্ভবত অ্যাপলোনিয়ার আবদারে তার মা-ও ওদের সাথে গাড়িতে উঠছে। মাইকেলের মন্মেভাব টের পেয়ে শ্বশুর এগিয়ে এসে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। একেবারে কচি বয়স মেয়েটার, কুমারী, তাই একটু ভয় পেয়ে গেছে। বিয়ের পরদিন সকালে ও হয়তো কারও সাথে কথা বলতে চাইবে। এরকম ক্ষেত্রে এক-আধটু গোলমাল তো হতেই পারে। তা যদি হয়, ওকে সব বুঝিয়ে দেবার জন্যে কাউকে দরকার।
অ্যাপলোনিয়ার দিকে তাকাল মাইকেল। গম্ভীর হরিণ চোখে একরাশ অনিশ্চয়তা নিয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে সে। মৃদু হেসে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল মাইকেল। তারপর মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
কর্লিয়নিতে ওদের সাথে অ্যাপলোনিয়ার মা এল বটে, কিন্তু ভদ্রমহিলা যথেষ্ট কাণ্ড-জ্ঞানের পরিচয় দিয়ে দ্রুত দৃশ্যপট থেকে কেটে পড়ল। ডাক্তার তাজার বাড়িতে পৌঁছেই প্রথমে সে পরিচারিকাদের সাথে কি যেন পরামর্শ করল, জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো মেয়েকে, তারপর অন্দরমহলে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেল। বিশাল একটা ঘরে ফুলশয্যা পাতা হয়েছে, নববধুকে নিয়ে সেখানে মাইকেল একাই ঢুকল।
বিয়ের সাজ-পোশাক এখনও খোলেনি অ্যাপলোনিয়া, ওপরে শুধু একটা সিল্কের আলখাল্লা জড়িয়ে নিয়েছে। আগেই গাড়ি থেকে ওর ট্রাঙ্ক আর সুটকেস শোবার ঘরে নিয়ে আসা হয়েছে। ঘরের ভেতর ছোট্ট একটা টেবিল, তার ওপর এক প্লেট বিয়ের কেক আর এক বোতল মদ দেখা যাচ্ছে। খাটটা প্রকাণ্ড, ঝালর দিয়ে ঘেরা, না তাকালেও চোখে পড়ছে সারাক্ষণ। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তরুণী। অপেক্ষা করছে। প্রথম উদ্যোগ মাইকেল নেবে, এই আশায়।
কিন্তু আজব এক আড়ষ্টতায় কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাইকেল, একচুল নড়ার শক্তি পাচ্ছে না সে। এতদিন নিজের সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে এই মেয়েকে কামনা করেছে, এখন তাকে একাকিনী পেয়েও, তার স্বামিত্ব অর্জন করেও তাকে স্পর্শ করার জন্য হাত উঠছে না। এই তো সেই অপরূপ মুখ, রোজ রাতে স্বপ্নের ঘোরে দেখেছে সে, এই তো সেই যৌবপুষ্ট সজীব শরীর, তাকে জড়িয়ে ধরার পথে আজ আর কোন বাধাই নেই, তবু সেদিকে এগোতে পারছে না কেন। ধীরে ধীরে নড়ে উঠল অ্যাপলোনিয়া, বিয়ের শালটা খুলে ফেলল গা থেকে, ঝুলিয়ে রাখল একটা চেয়ারে। তারপর মাথা থেকে নামাল বিয়ের মুকুট, ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখল সেটা। পালার্মো থেকে নিয়ে আসা নানারকম সুবাস আর ক্রীম সাজানো রয়েছে একটা টেবিলে, সেদিকে তাকাল অ্যাপলোনিয়া।
ও কি চাইছে ঘরটা অন্ধকার করে দিই? কাপড় ছাড়ার জন্যে অন্ধকারের আশ্রয় ভাল লাগবে ওর? চিন্তাটা মাথায় আসতেই হাত বাড়িয়ে আলোটা নিভিয়ে দিল মাইকেল। তাতে কিন্তু অন্ধকার দূর হলো না জানালাগুলো খোলা রয়েছে, উজ্জ্বল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে সিসিলির জ্যোছনা। একটা বাদ। দিয়ে বাকি জানালার খড়খড়ি বন্ধ করে দিল ও। সবগুলো বন্ধ করলে গুমোট হয়ে উঠবে পরিবেশটা।
তবু টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে রইল অ্যাপলোনিয়া, একচুল নড়ছে না। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল মাইকেল, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল। বাগানে বসে গল্প করছেন ডাক্তার তাজা আর ডন টমাসিনো, তাদের সাথে যোগ দিল ও। বাড়ির মেয়েরা এরই মধ্যে শোবার জন্যে তৈরি হয়ে গেছে। এক গ্লাস মদ খেলো মাইকেল। মনে মনে ভাবছে ফিরে গিয়ে দেখবে, অ্যাপলোনিয়া রাতের পোশাক পরেই বিছানায় শুয়ে পড়েছে। পোশাক খোলার ব্যাপারে মেয়েকে পরামর্শ দেয়নি মা, কথাটা ভেবে একটু অবাক হলো মাইকেল। আবার ভাবল, এমনও হতে পারে যে মায়ের সাহায্য নিতে অস্বীকার করেছে অ্যাপলোনিয়া। সে হয়তো মাইকেলের সহযোগিতা পাবে বলে আশা করে আছে। কিন্তু ওই পর্যন্তই, মুখ ফুটে কথাটা প্রকাশ করা তার সাধ্যের বাইরে। মাইকেল জানে, এ মেয়ে আশ্চর্য নিষ্পাপ, কোমল, অতটা এগোবে সে-দুঃসাহস নেই।
পা টিপে টিপে শোবার ঘরে ফিরে এল মাইকেল। প্রথমেই লক্ষ করল, একমাত্র যে জানালাটা খোলা ছিল সেটাও এখন বন্ধ ঘন অন্ধকারে ঘরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। একবার ভাকল অ্যাপলোনিয়ার নাম ধরে ডাকবে নাকি। কিন্তু মন তাতে সায় দিল না। অন্ধের মত নিঃশব্দ পায়ে এগোল ও। হাতড়ে স্পর্শ করল খাটটা। ঝুঁকে পড়তেই আঁধারের ভেতর চোখে পড়ল বিছানার ওপর কি যেন পড়ে রয়েছে, সম্ভবত অ্যাপলোনিয়াই। অন্ধকারটা চোখে: আরও একটু সয়ে আসতে নিজের অনুমানটা সঠিক বলে বুঝতে পারল ও। ওর দিকে পিছন ফিরে শুয়ে আছে অ্যাপলোনিয়া। মনটা একটু দমে গেল ওর। ঘুমিয়ে পড়ল নাকি?
ধীরে ধীরে কাপড় ছাড়ল মাইকেল। তারপর দুরুদুরু বুকে ঢুকল চাদরের নিচে। হাত বাড়াতেই রেশমের মত নরম তুকের ছোঁয়া অনুভব করল ও। শিউরে উঠল মাইকেল। ঢোক গিলল নিজের অজান্তেই। টের পেল নিঃশ্বাসগুলো কি গরম! শরীবের পাশে শুয়ে রয়েছে আরেকটা শরীর, দুটোই ওর নিজের শরীর, কিন্তু তবু কেন যেন চোর চোর মনে হচ্ছে নিজেকে, হাত বাড়াতে ভয় লাগছে। হঠাৎ টের পেল, অ্যাপলোনিয়ার গায়ে নাইট-গাডন নেই। মেয়ের সাহস দেখে ভীষণ খুশি মাইকেল। এই আনন্দই তাকে একটু সাহস যোগাল। অত্যন্ত যত্নের সাথে, খুব আলগোছে, একটা হাত রাখল নববধুর কাঁধে। কি এক পরম পাবার আনন্দে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল সারা শরীর। একটু চাপ দিল অ্যাপলোনিয়ার কাঁধে। নিজের দিকে ওকে ফেরাতে চাইল ও
