ধন্যবাদ, মৃদু কণ্ঠে বলল অ্যাপলোনিয়া।
চোখ ফিরিয়ে নিল মাইকেল, একবারে দুতিন সেকেণ্ডের বেশি তাকাতে পারছে না অ্যাপলোনিয়ার দিকে সত্যি সত্যি ভয় হচ্ছে, বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে পুড়ে যাবে চোখ দুটো তাছাড়া, ওর দিকে তাকালেই নিজেকে বশে রাখতে পারছে না মাইকেল, মনের ভেতর সব কেমন যেন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। মেয়েটার বাবার সাথে কথা বলছে ও, তাছাড়া আর করার আছে কি তার? তবে এরই মাঝে চোখে পড়েছে, অ্যাপলোনিয়ার পরনে সেকেলে ঢিলেঢালা পোশাক থাকলেও, কাপড় ভেদ করে ফুটে উঠেছে যৌবনের ভাজ, রেখা আর চুড়াগুলো। মুখটা লজ্জায় রাঙা, তাতে গায়ের রঙ আরও ঘন আর গাঢ় দেখাচ্ছে।
এবার বিদায় চাইতে হয়। ওর সাথে বাকি সবাইও উঠে দাঁড়াল। নিয়ম মত সবাই বিদায় দেবার পর ওর সামনে এসে দাঁড়াল অ্যাপলোনিয়া। হাতটা বাড়িয়ে দিল সে। বুক কাঁপছে মাইকেলের। হাতে হাত স্পর্শ করতেই সারা শরীর শিউরে উঠল ওর। অ্যাপলোনিয়ার হাতের ত্বক একটু কর্কশ। চাষী পরিবারের মেয়েদের যেমন হয়ে থাকে। গলা বুজে গেছে মাইকেলের, ব্যাকুল ইচ্ছেটা মাথা কুটে মরছে মনের ভেতর, কিন্তু একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। ওর সাথে পাহাড় থেকে নেমেগাড়ি পর্যন্ত এলো সিনর ভিটেলি। ডিনার খেতে নিমন্ত্রণ করল আগামী রবিবার। দাওয়াত কবুল করে মাথা নাড়ল বটে মাইকেল, কিন্তু মনে মনে জানে, অ্যাপলোনিয়াকে আবার না দেখে পুরো এক হপ্তা কিছুতেই থাকতে পারবে না সে।
রাখাল দেহরক্ষীদের সাথে না নিয়ে পরদিনই কাফেতে চলে এল মাইকেল, গাড়ি থেকে নেমে চাতালে বসল অ্যাপলোনিয়ার বাপের সাথে গল্প করতে। অবশেষে দয়া হলো সিনর ভিটেলির, স্ত্রী আর মেয়েকে খবর পাঠাল সে, তারা এসে যেন একটু সঙ্গ দেয় বেচারা মাইকেলকে। এবারের দেখা-সাক্ষাতে জড়তা ভাব অতটা নেই। কিছুটা লজ্জা কেটেছে অ্যাপলোনিয়ার, আর সে বেশ দুএকটা কথাও বলল। রোজকার পোশাক, ছাপা কাপড়ের ফ্রক পরেছে, সুন্দর মানিয়েছে ওর গায়ের রঙের সাথে।
পরদিনও তাই ঘটল, তফাত কেবল এই যে মাইকেলের উপহার দেয়া সোনার নেকলেসটা পরে এসেছে অ্যাপলোনিয়া। ব্যাপারটা লক্ষ করে ওর চোখে চোখ রেখে হাসল মাইকেল। বোঝাই যায়, অ্যাপলোনিয়ার তরফ থেকে এটা একটা ইঙ্গিত।
ওকে সাথে নিয়ে পাহাড়ে চড়ল মাইকেল, অবশ্য ওদের পিছনেই রয়েছে সিনরা ভিটেলি। কিন্তু তাতে কি, গায়ের সাথে গায়ের ছোঁয়াছোয়ি এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব একটা ব্যাপার। হোঁচট খেয়ে একেবারে ওর গায়ের ওপর পড়ে গেল একবার। অ্যাপলোনিয়া, যেন তৈরি হয়েই ছিল মাইকেল, সাথে সাথে ধরে ফেলল তাকে। উষ্ণ, সজীব শরীরের স্পর্শ পেতেই রক্তে যেন বাণ ডাকল ওর। পিছনে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে হাসছে সিনরা ভিটেলি, কিন্তু দুজনের কেউই তা লক্ষ করল না। মা জানে, মেয়ে তার পাহাড়ী ছাগলের মত পটু, এপথে যেতে-আসতে সেই জাঙ্গিয়া ছাড়ার পর থেকে কখনও হোঁচট খায়নি। সেটাই হাসির কারণ। হাসিটা আরও বড় হলো এই কথা ভেবে যে এই হোঁচট খাওয়ার ছুতোয় যতটা পারা যায় মেয়ের গায়ে হাত দিতে পারবে ছোকরা, বিয়ের আগে আর কোন সুযোগ সুটছে না ওর কপালে।
পরবর্তী দুহপ্তা চলল এইভাবে ধীরে ধীরে সঙ্কোচ কেটে যাচ্ছে মাইকেলেরও, রোজই কিছু না কিছু একটা উপহার নিয়ে আসে অ্যাপলোনিয়ার জন্যে। তবে মুরুব্বি স্থানীয় কেউ একজন উপস্থিত না থাকলে দেখা হয় না ওদের। হাজার হোক গ্রামের মেয়ে, কোনরকম অক্ষরজ্ঞান হয়েছে মাত্র, দুনিয়া সম্পর্কে ভাল মন্দ কোন ধারণাই নেই তার। কিন্তু আশ্চর্য একটা প্রাণচাঞ্চল্য আছে, আছে প্রাণের উচ্ছ্বাস আর সজীবতা, সেই সাথে ভাব প্রকাশে ভাষার বাধা, তাই আরও রহস্যময়ী লাগে ওকে। মাইকেলের অনুরোধে বিয়ের তারিখ খুব তাড়াতাড়ি স্থির করা হলো। ইতিমধ্যে অ্যাপলোনিয়ার জানা হয়ে গেছে মাইকেল যে শুধু ওকে দেখে মুগ্ধ তাই নয়, সে একটা বিরাট ধনী পরিবারের ছেলেও বটে। দুহপ্তা পর এক রবিবারে ধার্য হলো বিয়ের তারিখ।
এবার কাজে হাত দিলেন ডন টমাসিনো। আমেরিকা থেকে তাকে জানানো হয়েছে কোন আদেশ বা বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে না মাইকেলকে, কিন্তু সম্ভাব্য সমস্ত প্রাথমিক সতর্কতা যেন অবলম্বন করা হয়। নিজের বডিগার্ড দিয়ে মাইকেলকে ঘিরে রাখার জন্যে বর-কর্তা হলেন তিনি। বরযাত্রী হয়ে কর্লিয়নি থেকে গেল কার্লো আর ফ্যাব্রিযযিয়ো, ওদের সাথে ডাক্তার তাজাও গেলেন। আগেই ঠিক করা হয়েছে, বিয়ের পর স্ত্রীকে নিয়ে মাইকেল পাথরের পাচিল ঘেরা ডাক্তার তাজার বাড়িতেই থাকবে।
বিয়েটা সম্পন্ন হলো চাষী পরিবারের রীতি অনুযায়ী। বরযাত্রী, বর-কনে আর নিমন্ত্রিত মেহমানদের গায়ে ফুল ছুঁড়ে মারল গ্রামবাসীরা। গির্জা থেকে পায়ে হেঁটে ফিরল সবাই কনের বাড়ি। বিয়ের শোভাযাত্রাটা হলো দেখবার মত, যেমন দীর্ঘ তেমনি রঙচঙে। চিনি মাখানো কাগজি বাদাম আর চিনির মিষ্টি ছুঁড়ে মারা হলো প্রতিবেশীদের দিকে। অবশিষ্ট মিষ্টি দিয়ে তৈরি হলো ফুলশয্যার ওপর চিনির ঢিপি। এটা শুধু নিয়মরক্ষার জন্যে করা, কারণ কর্লিয়নি গ্রামের বাইরে ডাক্তার তাজার। বাগানবাড়িতে কাটবে বর-কনের প্রথম রাতটা। বিয়ের সোজ চলবে মাঝরাতের পরও, কিন্তু বর-কনে আলফা রোমিওতে চড়ে বিদায় নেবে অনেক আগেই।
