আবার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল মাইকেলের। রক্তে বাণ ডেকেছে ওর, শরীরের। প্রতিটি অঙ্গে দাউ দাউ আগুন জ্বলে উঠেছে। এ ঠিক কামনা নয়, ভোগ স্পৃহা নয়, এ হলো মেয়েটাকে আয়ত্ত করার উন্মত্ত প্রতিজ্ঞা, বাধ ভাঙা আকাঙ্ক্ষা। বহু-কথিত ইটালীয় পুরুষদের সেই প্রাচীন ঈর্ষা এই প্রথম অনুভব করছে মাইকেল। এই মুহূর্তে ভুল করেও কেউ যদি স্পর্শ করে এই মেয়েকে, দ্বিতীয়বার চিন্তা না করে সাথে সাথে তাকে হত্যা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে ও। হাড় কিপটে যেভাবে স্বর্ণমুদ্রার অধিকারী হতে চায়, বর্গাচাষী যেভাবে তার ফসলের ভাগ চায়, মাইকেলও সেভাবে অধিকার করতে চাইছে মেয়েটাকে ও জানে, ওর উন্মত্ত আকাক্ষা থেকে কেউ ওকে এক চুল টলাতে পারবে না, এই মেয়ের স্বামী তাকে পেতেই হবে, কেউ বঞ্চিত করতে পারবে না। সম্পূর্ণ দখল করতে হবে ওকে, ঘরের ভেতর তালা-চাবি দিয়ে আটক করতে হবে, শুধু নিজের জন্যে বন্দিনী করে রাখতে হবে। এ এমন এক মুহূর্ত, এখন যদি কেউ অ্যাপলোনিয়ার দিকে তাকায়, মাথার ভেতর বিস্ফোরণ ঘটে যাবে মাইকেলের। দুনিয়ার সমস্ত পুরুষ এখন মাইকেলের ঘৃণা আর সন্দেহের পাত্র। নিজের আর অ্যাপলোনিয়ার অস্তিত্ব ছাড়া দুনিয়ার আর কারও উপস্থিতি অসহনীয় বলে মনে হচ্ছে ওর কাছে। মেয়েটা হাসি মুখে একবার ভাইদের একজনের দিকে ফিরে তাকাল। সাথে সাথে নিজের অজান্তেই ছেলেটার দিকে এমন কটমট করে দৃষ্টি হানল মাইকেল, ঘরের কারও বুঝতে বাকি থাকল না যে এ হলো সেই প্রাচীন বাজ পড়ার ঘটনা, যেমন খাঁটি তেমনি শক্তিশালী বুঝতে পেরে আশ্বস্ত হলো সবাই। কোন সন্দেহ নেই, ছেলেটা এখন থেকে বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত মেয়েটার হাতে একদলা কাদা-মাটির মত নরম হয়ে থাকবে। এ অবস্থা বেশিদিন থাকবে না, সবকিছুর মত এটারও পরিবর্তন ঘটবে, কিন্তু কিই বা এসে যায় তাতে!
পালার্মো থেকে নতুন কেনা পোশাক পরে এসেছে মাইকেল, আজ আর ওকে মোটা কাপড় পরা গেঁয়ো চাষা দেখাচ্ছে না। ডন বা সমমানের কোন পদের অধিকারী ও, অনুমান করে নিল ওরা। মুখটা ভাঙা বলে, মাইকেলের ধারণা তার চেহারায় আর কোন সৌন্দর্য নেই, আসলে কিন্তু অতটা খারাপ দেখায় না ওকে। আরেক পাশ থেকে তাকালে ভয়ঙ্কর সুদর্শন পুরুষ বলে মনে হয়, বিকৃতিটা মানুষের মনে কৌতূহল জাগিয়ে তোলে। সবাই জানে সিসিলি এমন একটা দেশ যেখানে বিকলাঙ্গ উপাধি পেতে হলে নির্দয় খুনে স্বভাবের বিরাট একদল লোকের সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হয়। সিসিলিতে শারীরিক ত্রুটির আলাদা একটা মর্যাদা আছে।
মেয়েটার দিকে সরাসরি তাকিয়ে আছে মাইকেল। সুগোল মুখের অপরূপ সৌন্দর্য দেখে মাথা ঘুরছে ওর। ঠোঁট জোড়ায় অতি বেশি রক্তের চাপ, ফলে সে দুটোর রঙ হয়ে উঠেছে ঘন নীল। নামটা উচ্চারণ করবে, সে সাহস হলো না মাইকেলের। ঝাঁ ঝাঁ করছে সমগ্র অস্তিত্ব। সেদিন তোমাকে কমলা বনের ধারে দেখলাম। পালিয়ে গেলে তুমি। আশা করি ভয় পাওনি আমাকে দেখে, বলল ও
মুহূর্তের জন্যে চোখ তুলে তাকাল মেয়ে। দ্রুত অথচ সংক্ষিপ্ত ভাবে মাথা নাড়ল শুধু একবার। কিন্তু চোখ দুটো এত সুন্দর, সেই সৌন্দর্যে মগজ ঝলসে যাবে ভেবে তাকিয়ে থাকতে পারল না মাইকেল, মেয়েটা চোখ নামিয়ে নেবার আগেই দৃষ্টি সরিয়ে নিল ও।
অ্যাপলোনিয়া, ঝাঁঝের সাথে বলল মা, বেচারার সাথে কথা বলো। কত দূর থেকে এসেছে তোমাকে দেখার জন্য।
তবু ঘন কালো চোখের পাপড়িগুলো পাখির ডানার মত সযত্নে ঢেকে রেখেছে অ্যাপলোনিয়ার চোখ দুটোকে।
উপহারটা সোনালী কাগজে মোড়া, সেটা তার হাতে দিল মাইকেল নিয়েই কোলের ওপর ফেলে রাখল অ্যাপলোনিয়া।
আহা, মেয়ে, বলল, ওর বাবা, দেখোই না খুলে।
হাত দুটো তবু নড়ে না। ছোট ছোট হাত, জ্বাল দেয়া ঘন দুধের সরের মত রঙ!
ক্ষীণ অসহিষ্ণুতা ফুটে উঠল মায়ের চেহারায়, হাত বাড়িয়ে মেয়ের কোল থেকে প্যাকেটটা তুলে নিল! খুব যত্নের সাথে, যাতে মূল্যবান কাগজটা ছিঁড়ে না যায়, খুলে ফেলল প্যাকেটটা। ভেতরে লাল রঙের মখমল দিয়ে তৈরি গহনার বাক্স, দেখেই হাত দুটো থেমে গেল মায়ের। এ-ধরনের জিনিস আগে কখনও দেখেনি সে, হাতে নেয়া তো দূরের কথা, কিভাবে খুলতে হয় জানবে কোত্থেকে! তবে সহজাত উপস্থিত বুদ্ধির সাহায্যে বাক্স খুলে বের করে ফেলল উপহারটা।
সোনার একটা নেকলেস, খুব ভারী। হকচকিয়ে গেল ওরা সবাই অসম্ভব মূল্যবান একটা জিনিস, কিন্তু সেটা কারণ নয়, এদের সমাজে সোনা উপহার দেয়ার একটা অর্থ-সম্পর্কটাকে পবিত্র রূপ দেয়ার একান্ত গভীর ইচ্ছা প্রকাশ। সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার চেয়ে কম নয় ব্যাপারটা, অন্তত বিয়ের প্রস্তাব দিতে উদগ্রীব হয়ে আছে মাইকেল, উপহারটার মাধ্যমে এ-কথা পরিষ্কারভাবে জানাচ্ছে সে। সমস্ত দ্বিধা-সঙ্কোচ কাটিয়ে উঠল পরিবারটি, মাইকেলের উদ্দেশ্যটা যে সৎ তা বুঝতে পারল। সেই সাথে তার আর্থিক সঙ্গতি সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা জন্মাল ওদের মনে।
এখনও উপহারটা হাত দিয়ে ছোয়নি অ্যাপলোনিয়া। নেকলেসটা ওকে দেখাবার জন্যে একটু তুলে ধরল ওর মা। চোখের দীর্ঘ পাতা তুলে নেকলেসটার দিকে নয়, সরাসরি মাইকেলের দিকে তাকাল মেয়ে। হরিণীর মত চোখ, গাঢ় রঙের মায়াময় গভীরতায় ভরপুর এই প্রথম তার কণ্ঠস্বর শোনার সৌভাগ্য হলো মাইকেলের সে-রে তারুণ্যের সজীবতা, মখমলের মত লজ্জার কোমলতা–কান দিয়ে ঢুকে ওর শরীরে আর রক্তে তুমুল আলোড়ন তুলল।
