সব দায়িত্ব ফ্যাব্রিযযিয়োর ওপর ছেড়ে দিলেই হবে, বললেন ডন টমাসিনো। ছোকরা নৌ-বহরে যন্ত্রপাতির কাজ শিখেছিল। ভারি চালাক-চতুর। কাল সকালে পাবে তুমি টাকা, সকালেই সব কথা জানিয়ে তোমার বাবাকে খবর পাঠাব আমি। এ-কাজে বাধা দিতে পারবে না তুমি।
ডাক্তার তাজার দিকে ফিরল মাইকেল।,নাক দিয়ে এই যে অবিরাম সর্দি ঝরছে, এটা বন্ধ করার কোন ওষুধ আছে আপনার কাছে? সারাক্ষণ যদি নাক ঝাড়ি, মেয়েটা ভাববে কি?
কিসসু চিন্তা কোরো না, বললেন ডাক্তার তজা। রওনা হবার আগে একটা ওষুধ লাগিয়ে দেব। জায়গাটা একটু অসাড় হয়ে থাকবে, কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না, তুমি তো আর এখুনি ওকে চুমু খেতে যাচ্ছ না। নিজের রসিকতাটায় নিজেই হো হো করে হেসে উঠলেন তাজা, তার সাথে-যোগ দিলেন ডন টমাসিনো।
রবিবারের জন্যে একটা আলফা রোমিও গাড়ির ব্যবস্থা হলো। একটু পুরানো, কিন্তু কাজ চলবে। বাসে চেপে পালার্মোয় গেল মাইকেল নিজে, মেয়েটি আর তার বাড়ির লোকজনদের জন্যে কিছু উপহার কিনে আনল। ইতিমধ্যে মেয়েটির নাম জানা হয়ে গেছে: অ্যাপলোনিয়া। রবিবার আসার আগ পর্যন্ত রোজ রাতে তার সুন্দর নাম, সুন্দর চেহারার কথা ভাবে সে। ঘুম আসে না, তাই মদ খেতে হয় প্রচুর। বুড়ি পরিচারিকার ওপর নির্দেশ আছে, সে যেন রাতের জন্যে এক বোতল মদ খাটের পাশে রেখে দেয়। প্রতিটি বোতল নিষ্ঠার সাথে শেষ করছে মাইকেল, যাতে একটু অন্তত ঘুম হয়।
রোববার। সিসিলির সব কটা গির্জায় ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজছে। এই সসয় ভিটেলিদের গ্রামে পৌঁছুল মাইকেল। কাফের বাইরে আলফা রোমিও দাঁড় করাল ও। পিছনের সীটে বসে আছে কার্লো আর ফ্যাব্রিযযিয়ো। আগেই বলা আছে, কাফেতে অপেক্ষা করবে ওরা দুজন, মালিকের বাড়িতে যাবে না। কাফের দরজায় তালা ঝুলছে, চাতালের বেড়ায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ওদের জন্যে অপেক্ষা করছে ভিটেলি। করমর্দন এবং কুশলাদি বিনিময়ের পর উপহার তিনটে হাতে নিয়ে তার পিছু পিছু চলল মাইকেল। পাহাড়ের ওপর বাড়িটা দেখে চমৎকৃত হলো ও। বেশ বড় বাড়ি, গ্রামের আর সব কুটিরের মত খেলো নয়। বোঝা গেল ভিটেলি পরিবার সচ্ছল।
বাড়ির ভেতর পরিবেশটা এত ঘরোয়া যে চেনা চেনা লাগছে মাইকেলের। যীশুর মায়ের কয়েকটা মূর্তি দেখা যাচ্ছে, কাঁচ দিয়ে ঘেরা, পায়ের কাছে প্রদীপ জেলে রাখা হয়েছে। ঘরের ভেতর অপেক্ষা করছে ভিটেলির দুই ছেলে, আর সবার মত এরাও রোববারের উপযুক্ত কাপড়-চোপড় পরেছে। শক্তসমর্থ তাগড়া দুই ভাই, বড়জোর সবে উনিশ পেরিয়েছে, যদিও খামারে প্রচণ্ড খাটতে হয় বলে বয়সটা একটু বেশি দেখাচ্ছে। ওদের মায়ের গড়নও বেশ বলিষ্ঠ, স্বামীর মতই মোটা। ঘরে বা ঘরের আশপাশে ছায়া পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না মেয়েটার।
আনুষ্ঠানিকভাবে সবার সাথে মাইকেলের পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো, কিন্তু কারও একটা কথাও কানে ঢুকছে না ওর। যে ঘরটায় নিয়ে এসে বসানো হলো ওকে, সেটা বৈঠকখানাও হতে পারে, আবার খাবার ঘরও হতে পারে। মাঝারি আকারের ঘর, আসবাবে ভর্তি, সিসিলীয় মধ্যবিত্তের সচ্ছলতার ছাপ ফুটে রয়েছে চারদিকে।
সিনর ভিটেলি আর সিনরা ডিটেলিকে নিজের হাতে তাদের উপহার দুটো দিল মাইকেল। মেয়ের বাপের জন্যে সোনার সিগার কাটার আর মায়ের জন্যে এক থান কাপড় পালার্মোর সবেচেয়ে মিহি আর মূল্যবান জিনিস। মেয়েটার উপহার বের করুল না ও। সিনর ভিটেলি আর সিনরা ভিটেলি, দুজনই একবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করল, তারপর সংযত ভঙ্গিতে ধন্যবাদ জানাল মাইকেলকে। নিজের ভুলটা ধরতে পারল ও, আরও দেরি করে দেয়া উচিত ছিল উপহারগুলো। সাধারণ নিয়ম হলো দ্বিতীয় বার আসার আগে কিছু দিতে নেই।
দেশ-গ্রামের লোকেরা রেখে ঢেকে কথা বলতে জানে না, যা বলে পরিষ্কার। স্পষ্টভাবে বলে, ভিটেলিও তাই বলছে। বাড়িতে যে আসবে তাকেই আমরা আদর করে ডেকে নেব, অতটা নগণ্য পরিবার ভেব না আমাদেরকে। তুমি আমাদের বাড়িতে ঢোকার অনুমতি পেয়েছ, তার কারণ ডন টমাসিনো তোমার পক্ষ নিয়ে সুপারিশ করেছে আমাকে। সবাই জানে ডন টমাসিনো এই এলাকার একজন সভ্রান্ত কর্তা ব্যক্তি। তার কথা অবিশ্বাস করার প্রশ্নই ওঠে না। শুধু সেজন্যেই আমরা স্বাগত জানাচ্ছি তোমাকে। কিন্তু একটা ব্যাপারে তুমি যেন ভুল বুঝো না। আমার মেয়ে সম্পর্কে সত্যি যদি তোমার কোন সৎ ইচ্ছা থাকে, তোমার আর তোমার পরিবার সম্পর্কে সব কথা জানতে হবে আমাকে।
সবিনয়ে মাথা দোলাল মাইকেল, যখন যা কিছু জানতে চাইবেন সবই বলব আপনাকে আমি, বলল ও।
হাত নেড়ে বলল ভিটেলি, তার আগে দেখতে হবে সব কথা জানার সত্যি কোন প্রয়োজন আছে কিনা। পরের ব্যাপারে নাক গলানো স্বভাব নয় আমার। আজকের ব্যাপারটা একটু অন্যরকম, ডন টমাসিনোর সুপারিশে আজ আমরা। তোমাকে বন্ধু মনে করে ঘরে ডেকে বসিয়েছি। তিনি যদি বলেন, তোমাকে আমরা নির্ভয়ে পরিবারের একজন বলে গ্রহণ করতে পারি, তাহলে বোধহয় সব কিছু খুঁটিয়ে জানার দরকার হবে না।
নাকের ভেতর ওষুধ লাগানো হয়েছে, ফলে সেটা অসাড় মত হয়ে আছে। মাইকেলের, ওষুধের গন্ধ ছাড়া আর কোন গন্ধ ঢোকার পথ পাচ্ছে না, কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, ওষুধের তীব্র গন্ধকে হারিয়ে অদ্ভুত মিষ্টি একটা সুগন্ধ পেল ও। সাথে সাথে বুঝল, নিঃশব্দ পায়ে কাছেপিঠে কোথাও এসেছে মেয়েটা। ঘাড়। ফেরাতেই দেখল, ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পিছন দিকের খিলান দেয়া দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে সে। ঘন কার্লো কোকড়ানো একরাশ মাথার চুলে কোন ফুল নেই তার, অথচ তাজা লেবু ফুলের গন্ধ নিয়ে এসেছে সাথে করে। পরনে সাদাসিধে কার্লো পোশাক, কোন অলঙ্কার পরেনি সন্দেহ নেই এটাই তার তুলে রাখা সবচেয়ে ভাল পোশাক, শুধু রোববারে পরে ছোট্ট এক টুকরো হলুদ সোনার মত হাসি ফুটল তার মুখে, চোরা চাহনিতে চকিতে একবার তাকাল, চোখ নামিয়ে নিয়ে সলাজ কুণ্ঠার। সাথে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বসল মায়ের পাশে।
