মাইকেলের এই চেহারা ওদের পরিচিত নয়। এর আগে পর্যন্ত ওকে চুপচাপ থাকতে দেখেছে ওরা। আমেরিকানরা যেমন হয়, সব সময় শান্তশিষ্ট, নম, সাদাসিধে। তবে এটুকু বুঝত, সিসিলিতে এসে যখন গা ঢাকা দিতে হয়েছে, তখন পুরুষোচিত কিছু একটা ঘটিয়েছে তো বটেই। কিন্তু কর্লিয়নি দৃষ্টি কাকে বলে জানা ছিল না ওদের। এই প্রথম দেখছে। ফ্যাব্রিযযিয়ো জানে, এখন একচুল নড়লে বা একটু শব্দ করলে মাইকেলের তরফ থেকে বিপজ্জনক কিছু একটা ঘটে যেতে পারে।
মাইকেলের আসল পরিচয় আর কীর্তির কথা সিসিলিতে একমাত্র ডন টমাসিনো জানেন, জানেন বলে তিনি ওর সাথে সতর্ক আচরণও করে থাকেন। তারই মত একজন বলে মনে করেন ওকে, প্রাপ্য সম্মান আর শ্রদ্ধা দেখাতে ভুল করেন না। কিন্তু এই অশিক্ষিত রাখালেরা ওর সম্পর্কে কিছু জানে না, তবে না জানলেও মনগড়া একটা কিছু ভেবে নিতে তো আর বাধা নেই। তাদের সেই ভাবনাটা মোটেও বিচক্ষণ কিছু নয়। ছুরির মত ধারাল ওই হিম দৃষ্টি ফ্যাকাসে আড়ষ্ট মুখ, বরফ যেমন ধোয়া ছাড়ে তেমনি শরীর থেকে বেরিয়ে আসা রাগের ভাপ–এসব দেখে হ্যাঁৎ করে উঠল ওদের বুক। মাইকেলকে চেনে বলে ধারণা ছিল ওদের, সেই ধারণাটা এক নিমেষে মিথ্যে প্রমাণিত হয়ে গেছে। ওকে এখন অজানা একটা ভীতি বলে মনে হচ্ছে ওদের।
অপেক্ষার মুহূর্তগুলো শেষ হয়েছে মাইকেলের। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে ও, রাখালদের কাছ থেকে যথাযোগ্য মনোযোগ আর সম্মান আদায় করা গেছে। এতক্ষণে মুখ খুলল ও, আমার কাছে নিয়ে এসো ওকে।
একমুহূর্ত দেরি বা ইতস্তত করল না ওরা। দুজনেই কাঁধে তুলে নিল যার যার বন্দুক, দৃঢ় পায়ে সোজা গিয়ে ঢুকল কাফের ভেতর। খানিক পরই বেরিয়ে এল। ওরা। মাঝখানে দেখা যাচ্ছে কাফের মালিককে। একটু সতর্ক দেখাচ্ছে লোকটাকে, কিন্তু ভয়ে একেবারে কেঁচো হয়ে যায়নি।
চেয়ারে হেলান লি মাইকেল। কয়েক সেকেন্ড সময় লি ও, লোকটাকে দেখে নিল ভাল করে। আপনার মেয়ের কথা জিজ্ঞেস করায়, শান্ত গলায় বলল ও, লাম আপনি নাকি রাগ করেছেন। সেজন্যে দুঃখ প্রকাশ করতে পারি আমি, কিন্তু আল ব্যাপার হলো, আমি একজন বিদেশী, এখানকার রীতিনীতি ভাল বুঝি না। আমাকে ভুল বুঝবেন, সেটা আমার কাম্য নয়। আপনাকে বা আপনার মেয়েকে অপমান করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না, এটা আপনাকে বুঝতে হবে।
হতভম্ব দেখাচ্ছে কার্লো আর ফ্যাবিযিয়োকে। কই, ওদের সাথে কথা বলার সময় মাইকেলের গলার আওয়াজ তো এমন শোনায়নি কখনও! অপরাধ হয়ে থাকলে ক্ষমা চাইল মাইকেল, অথচ কথার সুরে ফুটে উঠল কর্তত আর আদেশ। আগের চেয়েও এখন আর সাবধান হয়ে গেল মালিক। মৃদু কাঁধ ঝাঁকাল সে। পরিষ্কার টের পেয়ে গেছে, যার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে, সে কোন চাষাভূষো নয়, কর্তা। গোছের একজন কেউ না হয়েই যায় না।
আপনি কে? জানতে চাইল সে। আমার মেয়ের সাথে কি দরকার আপনার?
আমি একজন আমেরিকান, কোন রকম দ্বিধা বা সতর্কতা দেখা যাচ্ছে না মাইকেলের মাঝে, পুলিশের ভয়ে এখানে পালিয়ে এসে লুকিয়ে আছি। একটা যদি খবর দেন পুলিশকে, সাথে সাথে এক বস্তা টাকা পেয়ে যাবেন আপনি। কিন্তু তাতে লাভ হবে না কিছুই। আপনার মেয়ে তার বাপকে তো হারাবেই, তার ওপর বেচারীর কপালে স্বামীও জুটবে না। একটু সময় দিল ও কথাগুলো যাতে লোকটার মনে ভাল করে গেথে বসে। তারপর বলল, ভদ্রতা বজায় রেখে চলাফেরা করি আমি, ধর্মের ওপরেও আস্থা আছে, সুতরাং আমাকে দিয়ে আপনার মেয়ের কোন ক্ষতি হবে না। তার অসম্মান করা আমার ইচ্ছা নয়। তবে, ওর সাথে কথা বলতে চাই। কথা বলে যদি দেখি, আমাদের মনের মিল হচ্ছে, তাহলে ওকে বিয়ে করব। আর মনের মিল যদি না হয়, এই শেষ, জীবনে কখনও আপনি বা আপনার মেয়ে দেখতে পাবেন না আমাকে। মনের মিল হবে কি হবে না, তা আগে থেকে কিছুই বলা যায় না। যদি হয়, আমার স্ত্রীর বাপের যা যা জানা উচিত তার সবই আপনাকে জানাব আমি।
শুধু কার্লো আর ফ্যাব্রিযযিয়ো নয়, এবার কাফের মালিকও অবাক হয়ে তাকাল মাইকেলের মুখের দিকে। ভক্তি আর শ্রদ্ধার সাথে ফিসফিস করে বলল ফ্যাব্রিযযিয়ো, ঠাট্টা নয়, সত্যি বাজ পড়েছে।
কাফের মালিকের চেহারা থেকে বিতৃষ্ণা আর রাগের ছাপ মুছে গেছে, চিড়, ধরেছে দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে। মাইকেলের দিকে কয়েক সেকেণ্ড তাকিয়ে থাকার পর অত্যন্ত সাবধানে জানতে চাইল সে, আপনি কি বন্ধুদের বন্ধু?
সাধারণ একজন সিসিলীয় মাফিয়া শব্দটা ইচ্ছা করলেই হঠাৎ উচ্চারণ করতে পারে না, তাই মাইকেল মাফিয়া সংগঠনের সদস্য কিনা তা এর চেয়ে সহজ করে জানতে চাওয়ার আর কোন উপায় নেই মালিকের। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সরাসরি প্রশ্নটা কখনোই করা হয় না।
না, বলল মাইকেল। আমি একজন বিদেশী।
মাইকেলের পা থেকে মাথা পর্যন্ত আরেকবার চোখ বুলাল কাফের মালিক। বাঁ চোয়ালটা ভাঙা, এর একটা তাৎপর্য অবশ্যই আছে–তাছাড়া অমন লম্বা পা সচরাচর দেখা যায় না সিসিলিতে। এরপর কাফের মালিক নির্ভয়ে সোজাসুজি দুই দেহরক্ষীর দিকে তাকাল। কাঁধে লুপাল বন্দুক, মাইকেলের নির্দেশের অপেক্ষায় ঠার একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে। হন হন করে কাফেতে ঢুকে তাকে বলেছিল, ওদের মনিব কথা বলতে চায় তার সাথে। খেঁকিয়ে উঠেছিল সে, শালা বানচোত বলে গালাগাল দিয়ে বলেছিল, এই মুহূর্তে তারা যেন চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যায়। কিন্তু ওরা ভয় তো পায়ইনি, উত্তেজিতও হয়নি। বরং শুভানুধ্যায়ীর মত বুঝিয়ে বলার ভঙ্গিতে .ওদের একজন বলেছিল, দয়া করে নিজের অসুবিধে করবেন না। আমার কথা বিশ্বাস করুন, মনিবের কথা শুনলে আপনার কোন ক্ষতি হবে না! একবার বাইরে এসে ওর কথা শুনুন, তাতে আপনার ভালই হবে। দেহরক্ষীর কথা শুনে কন যেন মাথা ঠাণ্ডা রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিল সে, মনে হয়েছিল বাইরে বেরিয়ে এসে লোকটার কথা শুনলেই বোধহয় ভাল হয়।
