এই পথ ধরেই অদৃশ্য হয়ে গেছে মেয়ের দল।
৪.০১ সিসিলি
শেষ পর্ব
০১.
সিসিলি।
একই ধাঁচে গড়ে উঠেছে সবগুলো গ্রাম। মাঝখানে মস্ত এক ফাঁকা জায়গা, সেখানে বিরাট এক কৃত্রিম ঝর্ণা, ঝর্ণার চারদিক ঘিরে গ্রামের বাড়ি-ঘর। এই গ্রামটা বড় রাস্তার ধারে বলে কয়েকটা মুদি আর মদের দোকান দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। এগুলোর কাছ থেকে সামান্য একটু তফাতে খুদে একটা কাফেও রয়েছে। কাফের সামনে ছোট্ট ঢাল, সেখানে তিনটে টেবিল ফেলা।
রাখালেরা, অর্থাৎ মাইকেল কর্লিয়নির দুই বডিগার্ড, কার্লো আর ফ্যাব্রিযযিয়ো, চাতালে উঠে এসে একটা টেবিল দখল করে বসল। একটু পরই সেখানে এসে জুটল মাইকেল। কিন্তু যে মেয়েগুলোর পিছু নিয়ে এদিকে এসেছে ওরা, তাদের ছায়া পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না কোথাও। গ্রামটাকে নির্জীব, ফাঁকা, আর বৈরী লাগছে মাইকেলের। এদিক ওদিক ঘুর ঘুর করছে ধুলোমাখা কয়েকটা বাচ্চা ছেলে। তারপর চোখে পড়ল ভাবঘুরে চরিত্রের, বিশ্ব-সংসার সম্পর্কে উদাসীন এক গাধা। গ্রামটা যেন এদেরকে নিয়েই। ওদের দেখে বেরিয়ে এল কাফের মালিক! বেঁটে, ছোটখাটো মানুষ, কিন্তু দেখেই বোঝা যায় গায়ে শক্তি রাখে। চেহারায় আন্তরিক আনন্দের ছাপ ফুটিয়ে তুলে অভিবাদন করল সে। এদিকে আপনারা নতুন, তাই আমার ছেলেদের কথা জানেন না, টেবিলে এক প্লেট ভাজা মটর রেখে বলল সে, একটু শুধু চেখে দেখুন, তাহলেই বুঝতে পারবেন কি আশ্চর্য হাত ওদের। এত ভাল মদ ইটালির আর কোথাও পাবেন না। নিজস্ব বাগানের আঙুর দিয়ে আমার ছেলেরা নিজের হাতে তৈরি করেছে এই মদ। এর সাথে আবার লেবু আর কমলা মিশিয়েছে। একবার খেলে ভুলতে পারবেন না।
অর্ডার দিবার আগে মাইকেলের দিকে একবার তাকাল ফ্যাব্রিযযিয়ো।
প্রচুর মদ দরকার এখন ওর, বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না। দরাজ ভঙ্গিতে হাত নেড়ে সবচেয়ে বড় জগ ভরে মদ আনতে বলল সে। জিভে ঠেকতে যা দেরি, সাথে সাথে মালিকের কথা স্বীকার করে নিল ওরা। যতটুকু বলেছে মদটা তার চেয়েও ভাল। রঙটা ঘন বেগুনী, ব্র্যাণ্ডির চেয়েও কড়া।
জানা কথা, বলল ফ্যাৱিষযিয়ো, এদিকের সব মেয়েকে চেনেন আপনি। আসার পথে কয়েকজন সুন্দরী চোখে পড়ল, তাদের একজনকে দেখে, ইশারায় মাইকেলকে দেখাল সে, আমাদের এই মনিব ভদ্রলোকের মাথায় বাজ পড়েছে।
কৌতূহল ঝিলিক দিয়ে উঠল মালিকের চোখে। খুঁটিয়ে দেখছে এখন। মাইকেলকে। এর আগে পর্যন্ত চোয়াল ভাঙা লোকটাকে দেখে তেমন কিছু মনে হয়নি তার। কিন্তু মাথায় বাজ পড়েছে যার, তাকে আর সাধারণ বলে মনে করা যায় না। তার যন্ত্রণায় কাতর হওয়াটাই তো নিয়ম। সত্যি? সত্যি আপনার মাথায় বাজ পড়েছে, বন্ধু? তাহলে আমার একটা পরামর্শ নিন, আরও কয়েকটা বোতল সাথে করে নিয়ে যান, রাতে ঘুমাতে চাইলে এগুলোর সাহায্য দরকার হবে আপনার।
মেয়েটার খোঁজ দিতে পারেন? মাথার চুল অস্বাভাবিক কোকড়া, গায়ের রঙ দুধের সরের মত, খুব কার্লো আর খুব বড় বড় চোখ? শান্ত উদ্বেগের সাথে জানতে চাইল মাইকেল। খুব সুন্দরী, খুব লম্বা, হাসলে টোল পড়ে গালে, মাইকেলের বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়েছে, তা নাহলে লক্ষ করতে ভুল করত না যে তার কথা শুনতে শুনতে কেমন ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে মালিকের হোরা। বান্ধবীদের সাথে এদিকেই তো এল। দেখেছেন নাকি?
না, দেখিনি, গম্ভীর মুখে কথাটা বলে দ্রুত পিছন ফিরল মালিক, হন হন করে হেঁটে কাফের ভেতর গায়েব হয়ে গেল।
ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ওরা, ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে মদ খাচ্ছে। খানিক পরই শেষ হয়ে গেল জগটা, কিন্তু গলা ভেজেনি। আরও মদ চাইছে ওরা। অথচ মালিকের ছায়া পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না কোথাও। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ফ্যাব্রিযুয়িয়ো। খোঁজ নিতে গেল। একটু পরই ফিরে এল সে। চলো, কর্লিয়নির দিকে হাঁটা দেয়া যাক, সেটাই বোধহয় বুদ্ধিমানের কাজ হবে, বলল সে। যা ভেবেছি ঠিক তাই। মেয়েটা ওরই। কাফের পিছনে বসে মাথা গরম করছে এখন সে, আমাদের ক্ষতি করতে চায়।
যৌন ব্যাপারে সিসিলীয়রা সাঙ্ঘাতিক স্পর্শকাতর, কিন্তু এত দিন এই দ্বীপে বসবাস করার পরও এটাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না মাইকেল। তাছাড়া, কাফের মালিক লোকটার আচরণ একজন সিসিলীয়র পক্ষেও বেশি রক্ষণশীল হয়ে যাচ্ছে। সামান্য একটা ব্যাপার, কেউ তো আর তাকে অপমান করেনি, তাহলে এত বাড়াবাড়ি করার কি মানে?
কিন্তু মালিকের আচরণটাকে কার্লো আর ফ্যাব্রিযযিয়ো অতি স্বাভাবিক বলেই ধরে নিচ্ছে। দুর্ভাগ্যক্রমে ভুল জায়গায় টোকা মারা হয়ে গেছে, সুতরাং এ-ব্যাপারে করার আর কিছুই নেই, এই রকম কিছু একটা ভাবছে ওরা। অপেক্ষা করছে। মাইকেল কখন চেয়ার ছেড়ে উঠে রওনা দেবে।
কি বলছিল, জানো? মাইকেলকে বলল ফ্যাব্রিযযিয়ো। ভারি জবরদস্ত দুই ছেলে ওর, তাদের একটা খবর দিলেই নাকি তারা ছুটে এসে আমাদের ছাল ছাড়িয়ে নেবে। হারামজাদার কথা শোনো। কই, ওঠো, এখানে বসে থেকে আর কি লাভ?
চোখ তুলে তাকাল মাইকেল। অমনি মুখের ভেতর জিভ জমে একেবারে বরফ হয়ে গেল ফ্যাব্রিযযিয়োর। ঠাণ্ডা ছুরির মত ধারালো দৃষ্টি মাইকেলের চোখে। পারলে পিছিয়ে যেত ফ্যাব্রিযযিয়ো, কিন্তু হাত-পা অবশ হয়ে গেছে তার। ঘন ঘন ঢোক গিলছে।
