বন্ধুদের মাঝখানে পৌঁছুল মেয়েটা। আঙ্গুরের গুচ্ছ ধরা হাতটা বাড়িয়ে কমলা-বনের দিকটা দেখিয়ে দিল তাদেরকে। সাথে সাথে পুরুষদেরকে দেখতে পেয়ে খিলখিল করে মিষ্টি সুরে হেসে উঠল সব কটা মেয়ে। কালবিলম্ব না করে ছুটে পালাচ্ছে ওরা। পিছন পিছন যাচ্ছে কার্লো পোশাক পরা মোটাসোটা বয়স্কা দুজন গিন্নী, ওদেরকে ধাওয়া করে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, খই ফুটছে মুখে, বকা-ঝকা করছে দস্যি মেয়েগুলোকে।
আর মাইকেল কর্লিয়নির কি অবস্থা? তার কথা আর কিইবা বলা যায়। কখন, কিভাবে উঠে দাঁড়িয়েছে, নিজেও সে তা জানে না। মাথাটা ঘুরে উঠল, তারপর এই এতক্ষণে আবিষ্কার করল, দাঁড়িয়ে আছে সে ধড়াস ধড়াস করে বাড়ি খাচ্ছে বুকের খাঁচায় হৃৎপিণ্ড। মাথাটা এখনও ঘুরছে একটু একটু। রক্তে তার বান ডেকেছে, শিরায় শিরায় প্লাবন বয়ে যাচ্ছে-শরীরের সর্বশেষ সীমানায় পৌঁছে হাত আর পায়ের আঙুলের ডগায় আছাড় খেয়ে পড়ছে রক্ত মোত। দ্বীপের যত সুগন্ধ বাতাসে ভর করে সব তার নাকে উড়ে এলো-কমলা-ফুল, লেবু-ফুল, পাকা আঙ্গুর আর কুসুম সারের সমস্ত সুগন্ধ। তারপর রাখালদের হাসি ঢুকল ওর কানে।
মাথায় বাজ পড়ল, সত্যি কিনা? বলল ফ্যাবিযিয়ো। সস্নেহে মাইকেলের কাঁধে একটা হালকা চাপড় মারল সে।
বোকা হারা কার্লো পর্যন্ত বিমুঢ় হয়ে পড়েছে মাইকেলের করুণ অবস্থা দেখে। পরম বন্ধুর মত সেও মাইকেলের হাত ধরে একটু নাড়া দিল। আদরের সুরে বলল, মাথা ঠাণ্ডা রাখো, ব্যাটা, শান্ত হও।
ঝড়ের বেগে ধাবমান একটা মোটর গাড়ি যেন দুম করে ধাক্কা মেরেছে। মাইকেলকে। পরিস্থিতি বুঝে, বুদ্ধি করে একটা মদের বোতল বাড়িয়ে ধরল ফ্যাব্রিযযিয়ো বোতলটা প্রায় ছো মেরে কেড়ে নিয়ে সেটা থেকে ঢক ঢক করে কয়েক ঢোক মদ খেলো মাইকেল। পরিষ্কার হয়ে গেল মাথাটা।
অ্যাই, হতভাগা! তোরা কি বলতে চাইছিস?
দুজন রাখালই হাসছে।
হঠাৎ ভালো মানুষ কার্লোর ভাবলেশহীন মুখটা আষাভাবিক গম্ভীর হয়ে উঠল। ভারিক্কী ভঙ্গিতে বলল সে, দেখো হে, মাথায় যদি কারো বাজ পড়ে, তা আর লুকোবার জো নেই-তাকালেই দেখতে পায় সবাই। তায় যী, এতে আবার লজ্জা কিসের? মানুষ তো মাথায় বাজ পড়ার আশায় সাধনা-করে, গির্জায় প্রার্থনার আয়োজন করে। এ তো তোমার পরম সৌভাগ্য!
এতো সহজে ওর মনের অবস্থা রাখালরা বুঝে ফেলেছে লক্ষ করে মোটেই সন্তুষ্ট নয় মাইকেল। ভাবছে, এমন ঘটনা এই প্রথম ঘটল ওর জীবনে। কিশোর বয়সে একে তাকে এক-আধটু ভাল লাগত বৈকি, কিন্তু এর সাথে সে-সবের কোন মিলই নেই। এতোদিন কে-কে ভালবেসে এসেছে ও, সেই ভালবাসার সাথেও এর কোন মিল নেই। কে-এর স্বাভাবিক মাধুর্য, তার সরলতা আর বুদ্ধি মত্তা, এই সবই। ছিল তাকে ভালবাসার আসল কারণ। একজনের কার্লো চুল, আরেকজনের সোনালী, সেটাও একটা আকর্ষণ ছিল!
কিন্তু এটা সম্পূর্ণ অন্য রকম। দেখামাত্র দুর্দমনীয় বাসনা জেগে উঠেছে, যেভাবে হোক অধিকার করতে হবে অপরূপ সৌন্দর্য আর যৌবনের আধারটাকে। ওকে পাবার জন্যে দুনিয়াটাকে পায়ে দলতে হয়, যদি নিজের গায়ের মাংস কেটে বিক্রি করতে হয়–হাসি মুখে তা করতে পারবে মাইকেল। মেয়েটার মুখের ছবি গেথে গেছে ওর মগজে। ও বুঝতে পারছে, মেয়েটাকে না পেলে অসহায় একটা পর মত, মানবেতর জীবন যাপন করতে হবে তাকে, নিজের কাছে এত হেয় হয়ে যাবে যে কোন দামই থাকবে না নিজের অস্তিত্বের। সারাটা জীবন, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ফেলার আগে পর্যন্ত মেয়েটার স্মৃতি পীড়া দেবে ওকে।
সেই সাথে অনুভব করছে মাইকেল, আশ্চর্য সহজ হয়ে গেছে তার জীবনটা। তার সমস্ত অস্তিত্ব এখন কেন্দ্রীভূত হয়েছে একটা মাত্র বিন্দুতে। ওই মেয়েটা, সেই ওর সম্পূর্ণ জীবন। বাকি আর যা কিছু রয়েছে সেগুলোর কোন মূল্য নেই, তাৎপর্য নেই-মনে হচ্ছে, দুনিয়ার আর সব ব্যাপার এতই তুচ্ছ যে সেগুলো সম্পর্কে এক সেকেণ্ড চিন্তা করারও কোন দরকার নেই। সমস্ত কিছুই চিন্তার অযোগ্য।
সিসিলিতে এই নির্বাসনের দিনগুলোয় প্রায়ই কে-র কথা ভাবে মাইকেল। ও বুঝতে পারে, সেই প্রেমের সম্পর্ক ওদের মধ্যে আর কখনও ফিরে আসবে না। কে-র সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্কও আর সম্ভব নয়। যতভাবেই চাপা দেবার চেষ্টা করা হোক, সে একজন খুনী তো বটে। এখন সে একজন ম্যাফিয়োনো যার পৌরুষের পরীক্ষা হয়ে গেছে, পাস করেছে সে। এর ফলে কে-কে হারাতে হয়েছে তাকে, চিরকালের জন্যে। তবু কে-র স্মৃতি মন থেকে মুছে যায়নি এতোদিন। কিন্তু আজ এই একটু আগে যা ঘটে গেল, মাইকেলের চেতনা থেকে কে-এর সমস্ত স্মৃতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল এক নিমেষে।
চলো, গ্রামে যাই, মেয়েটার খবর আনি, ব্যাকুল ব্যস্ততার সাথে বলল ফ্যাৱিযযিয়ো। যা মনে হচ্ছে তা হয়তো নয়–ততটা হয়তো নাগালের বাইরে নয়। বাজ যখন পড়েছেই, তার চিকিৎসা তো করতে হবে, কি বলো, কার্লো? বাজ পড়ার ওই একটা চিকিৎসাই তো আছে। চলো, যাই। গিয়ে দেখাই যাক না কতটা ধরাছোঁয়ার বাইরে ওই মেয়ে।
এখন আরও গম্ভীর দেখাচ্ছে কার্লোকে। নিঃশব্দে মাথা দোলাল শুধু কথা বলে পরিবেশের গাম্ভীর্য নষ্ট করল না।
মাইকেল কিন্তু সায়ও দিল না, আপত্তিও জানাল না। দুই রাখাল যখন পাশের গ্রামে যাবার জন্যে হাঁটা ধরুল, সে-ও, নিঃশব্দে ভিজে বেড়ালের মত পিছু নিল ওদের।
