আজ আর সমুদ্র তীর পর্যন্ত বেড়ানো হলো না ওদের মাইল পনেরো বাকি থাকতে একটা কমলা বনের সবুজ শীতল কোমল ছায়ায় বসে পড়ল মাইকেল, ওর দেখাদেখি অনুগত ভৃত্যের শত বসল রাখলি দুজনও। মদ আর খাবার দিয়ে পেট ভরাবে এখন। সেই কখন থেকে বক বক করে চলেছে ফ্যাব্রিযযিয়ো, এখনও সমানে চালিয়ে যাচ্ছে। তার একটাই বক্তব্য, একদিন সে যেভাবে হোক যাবেই। আমেরিকায়।
পান এবং আহারের পর গাছের ঠাণ্ডা ছায়ায় শুয়ে পড়ল মাইকেল, দেখাদেখি রাখাল দুজনও। শার্টের বোতাম খুলে একটা খেলা দেখাচ্ছে ফ্যাব্রিযযিয়ো, পেটের পেশী সঙ্কুচিত করে জ্যান্ত করে তুলছে উল্কির ছবিটাকে। বিবস্ত্র প্রেমিক-প্রেমিকার শরীর রতিক্রিয়ার ভঙ্গিতে নড়েচড়ে উঠছে, যে ছোরাটা ওদের শরীরে গেথে দিয়েছে। প্রতারিত স্বামী সেটা কাঁপছে থরথর করে। আরেক রাখাল কার্লো আর মাইকেল তাই দেখে খুব মজা পাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রলয়কাণ্ড ঘটে গেল মাইকেলের মগজে। সিসিলির লোকেরা যাকে মাথায় বাজ পড়া বলে ঠিক তাই হলো মাইকেল কর্লিয়নির। এক নিমেষে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড ভেঙে পড়ল যেন ওর মাথায়।
সামনে কমলাকুঞ্জ, তার পিছনে জমিদারের খেত। খেতের চারধারে সবুজ লতাপাতা আর ঘাসের পাড়। কুঞ্জবন থেকে সামান্য একটু দূরে দেখা যাচ্ছে। একটা বাগানসহ বাড়ি বাগানবাড়িটার আকার-আকৃতি এত বেশি রোমক-ধাচের যে একবার তাকালেই বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে পম্পিয়াইয়ের ধ্বংসাবশেষ থেকে খুঁড়ে বের করে তারপর এখানে তুলে এনে বসিয়ে দেয়া হয়েছে ছোটখাটো একটা প্রাসাদই বলা চলে। গাড়ি বারান্দাটা বিশাল, শ্বেতপাথরের তৈরি। প্রকাও থামগুলোর গায়ে গ্রীসীয় ধাচে খাজ কাটা। দুটো থামের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে এল গ্রামের একদল মেয়ে, সাথে মোটা নোটা দুজন বয়স্কা গিন্নি মহিলা, পরনে কার্লো পোশাক। অবশ্যপালনীয় একটা কর্তব্য সম্পাদনের জন্যে গ্রাম থেকে এসেছে ওরা। বাগানবাড়িটা জমিদারের, সেটা সাফসুতরো করে রাখা ওদের দায়িত্ব, যাতে শীতকালটা কাটাতে এসে সব কিছু ঝকঝকে তকতকে দেখতে পান জমিদার।
এখন মাঠের দিকে যাচ্ছে মেয়ের দল, সেখান থেকে ফুল তুলে আনবে ওরা, বাগানবাড়ির ঘরে ঘরে সাজিয়ে রাখতে হবে। গোলাপী রঙের সুলা-র, বেগুনী রঙের উইস্টারিয়ার সাথে লেবু ফুল, কমলা ফুল। তিন তিন জন পুরুষ মানুষ কমলা-বনে বিশ্রাম করছে, মেয়েদের চোখে ব্যাপারটা ধরাই পড়েনি। দ্রুত আরও কাছে চলে আসছে ওরা।
মেয়েদের গায়ের সাথে আঁটসাট ভাবে লেপ্টে আছে সস্তা ছিট কাপড়ের পোশাক। সবার বয়স কুড়ির নিচে, কিন্তু এই কম বয়সেই মেয়েদের শরীরে পরিপূর্ণ যৌবন বিকশিত হয়ে উঠেছে, রোদের দেশের যা নিয়ম। দলের তিন চারটে মেয়ে অপর একটা মেয়েকে তাড়া করছে, তাড়া খেয়ে হরিণীর মত ছুটছে মেয়েটা, সোজা এই কমলা-বনের দিকেই এগিয়ে আসছে। বেগুনী আঙ্গুরের মস্ত,একটা গুচ্ছ দেখা যাচ্ছে তার হাতে, তা থেকে একটা করে আর ছিঁড়ছে সে, ছুঁড়ে মারছে পিছন দিকে, তাকে যারা ধাওয়া করছে তাদেরকে লক্ষ্য করে। তার হাতের ওই আঙ্গুরের মতই গাঢ় বেগুনী রঙের একরাশ চুল মুকুটের মত শোভা পাচ্ছে তার মাথায়। মেয়ে নয়, পরী! তার শরীরের বর্ণনা দিতে হলে মহাকাব্য রচয়িতার মুন্সিয়ানাতেও বুঝি কুলাবে না। তুকের মোড়ক ছিঁড়ে লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে যৌবন।
কমলা-বনে প্রায় পৌঁছে গেছে মেয়েটা। এই সময় হঠাৎ থমকে দাঁড়াল সে। সবুজ বনে পুরুষদের শার্টের বেমানান রঙ চোখে পড়ে গেছে তার। অকস্মাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল মেয়েটা, কিন্তু তার এই দাঁড়াবার ভঙ্গির মধ্যেও কি এক অদ্ভুত শিল্প রয়েছে। পায়ের আঙুলগুলোর ডগা কে কষল যেন, ক্ষুরের মত ধারাল কিছুর উপর দাঁড়িয়ে ভারসাম্য রক্ষা করছে যেন, এস্তা হরিণীর মত ছুটে পালাবে এখুনি। কিন্তু এরই মধ্যে খুব কাছাকাছি চলে এসেছে সে। মাইকেল কর্লিয়নি তার মুখে প্রতিটি খো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
শরীরের রেখা আর ভাজগুলো গোল, ডিম্বাকৃতি। চোখজোড়া টানা টানা। সৃষ্টিকর্তা যেন কত রাত জেগে কি ভীষণ পরিশ্রম করে এমন নিখুঁত, এমন অবিশ্বাস্য সুন্দর একটা মুখ গড়েছেন। ছোট সুডৌল কপালে যে সৌন্দর্য দেখতে পাচ্ছে, মাইকেল, লক্ষ-কোটি হীরে-জহরত মণি-মাণিক্য দিয়েও এর সমান সৌন্দর্য সৃষ্টি করা কখনও সম্ভব হবে না। গাঢ়, ঘন ঘি-এর মত আশ্চর্য গভীর তার গায়ের রঙ। গাঢ় বেগুনী, অথবা বলা যায় কালচে রঙের সুদীর্ঘ চোখের পাপড়ি, ভীষণ সুন্দর মুখের ওপর ছায়া ফেলেছে। আয়ত লোচন। পরিপুষ্ট এক জোড়া ঠোঁট, কিন্তু সুল নয়; মিষ্টি অথচ দুর্বল নয়। রসালো আঙ্গুরের মত টসটসে।
এ কেমন সৌন্দর্য! এ কেমন অবিশ্বাস্য রূপ! ফ্যারিযযিয়োর মনে হলো, দম ফেটে মারা যাচ্ছে সে। নিজের অজান্তেই চাপা স্বর বেরিয়ে এলো তার গলার ভেতর থেকে, মরে গেলাম, প্রভু যীও! তুমি আমাকে তুলে নাও। ফ্যাব্রিযযিয়ের কথা শুনতে পেয়েই বুঝি শরীরের ভার আঙুলের ডগা থেকে নামিয়ে, চরকির মত আধপাক ঘুরে এস্তা হরিণীর মত বান্ধবীদের কাছে ফিরে গেল মেয়েটা। ছাপা কাপড়ের আঁটো পোশাকের নিচে বুনো প্রাণীর সহজ সাবলীল হাঁটার ভঙ্গি, প্রকৃতির কন্যার মতই নিষ্পাপ কামনাময়, নির্মল আর আদিম।
