তবে, একথা সত্যি, গ্রামে ফিরে এসে ফ্যাব্রিযযিয়ে তার উঁকিটাকে নিয়ে খুব বেশি গর্ব করত না। কিন্তু উলকিতে আঁকা ছবিটার বিষয়বস্তু অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সিসিলীয়দের আত্মসম্মান জ্ঞানের সাথে জড়িত একটা ব্যাপার। ফ্যাব্রিযযিয়োর পেটটা লোমশ। উঁকির ছবিতে দেখা যায়, একজোড়া নরনারী, দুজনেই সম্পূর্ণ বিবস্ত্র, জড়াজড়ি করে রয়েছে–ওদেরকে ছোরা মারছে একজন লোক, সে হলো মেয়েটার প্রতারিত স্বামী।
ছোকরা চটপটে, রসিকতা পছন্দ করে! সুযোগ পেলেই মাইকেলের সাথে ঠাট্টা-তামাশা করে সে, কৌভূহল মেটাবার জন্যে নানা প্রশ্ন করে আমেরিকা সম্পর্কে। মাইকেলের আসল ঠিকানা এই দুজন রাখালের কাছ থেকে গোপন করে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে মাইকেলেব প্রকৃত পরিচয় ওদেরকেও জানানো হয়নি। আমেরিকা থেকে এখানে এসেছে লুকিয়ে থাকার জন্যে, এর বেশি কিছু জানে না তারা। আর জানে, এই লোক সম্পর্কে কাউকে কিছু বলা চলবে না।
প্রায়ই পনির এনে দেয় ফ্যাব্রিযযিয়ো মাইকেলকে। জিনিসটা এত টাটকা যে ঘামের মত পনিরের গায়ে বিন্দু বিন্দু দুধ লেগে থাকে।
ধুলোয় মোড়া পাড়াগাঁর পথ ধরে হাঁটছে ওরা। ওদের পাশ ঘেঁষে এগোচ্ছে রঙচঙে ছবি আঁকা গাধায় টানা গাড়ি! যেদিকে তাকাচ্ছে ওরা সেইদিকেই দেখা যাচ্ছে গোলাপী ফুল, কমলা লেবুর বাগান, জলপাই আর কাগজি বাদামের কুঞ্জবন। যত দেখে ততই অবাক হয় মাইকেল যত বই পড়েছে ও, সব কটাতে ফলাও করে সিসিলীয়দের দারিদ্রের কথা সবিস্তারে লেখা আছে। তাই মনে করেছিল, যত সামনে এগোবে ততই বন্ধ্যা, অনুর্বর নিঃস্ব জমি দেখতে পাবে সে। কিন্তু বেড়াতে বেরিয়ে দেখছে দেশটার চারদিকে শুধু প্রাচুর্য উপচে পড়ছে। পায়ের তলায় এত ফুলের গালিচা। লেবু-ফুলের সুবাস ঢুকছে নাকে। কী সুন্দর এই দেশ! অথচ এই দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায় কিভাবে মানুষ? সে-দুঃখ সয় কিভাবে? ভেবে কোন কূল পাচ্ছে না মাইকেল। হঠাৎ উপলব্ধি করল ও, মানুষ যে মানুষের ওপর কতটা নির্মম অত্যাচার চালাতে পারে তার একটা পরিমাপ পাওয়া যায় এই নন্দনকানন ছেড়ে দল বেঁধে চিরকালের জন্যে অন্য কোথাও লোকজনের চলে যাওয়া থেকেই।
ইচ্ছা ছিল পায়ে হেঁটে মাজারা গ্রাম পর্যন্ত যাবে ও গ্রামটা সমুদ্রতীরে। তারপর বিকেলের দিকে কর্লিয়নিতে ফিরে আসবে বাসে চেপে। এতটা পরিশ্রমে শরীর নিশ্চয়ই ক্লান্ত হবে, তাতে নির্ঘাৎ চোখে ঘুম আসবে রাতে। চিন্তার কিছু নেই, প্রচুর রুটি আর পনির আছে রাখালদের পিঠে ঝোলানো থলিতে। পথে কোথাও থেমে মধ্যাহ্নভোজন সেরে নিলেই হবে। লুপারা বন্দুক গোপন করে রাখার কোন চেষ্টা নেই খালদের মধ্যে, দেখে যাতে মনে হয় শিকারের তল্লাশে সারাটা দিন কাটাতে যাচ্ছে ওরা।
আশ্চর্য সুন্দর লাগছে আজকের সকালটা। ছোটবেলার কথা, একদিন খুব ভোরে উঠে মাঠে বল খেলতে গিয়েছিল মাইকেল, সেদিন অদ্ভুত এক পুলকে শরীর আর মন পুলকিত হয়ে উঠেছিল ওর–সেই রকম রোমাঞ্চকর পূলক আজও অনুভব করছে সে। সেই ছোটবেলার প্রতিটি সকাল দেখে মনে হত নতুন করে ধুয়ে সাফসুতরো করে কে যেন রঙ দিয়ে কি সুন্দর ভাবে এঁকে দিয়েছে। আজকের সকালটাকেও ঠিক সেই রকম লাগছে।
জমকালো ফুলের গালিচা পাতা সিসিলি। বাতাস ভারী হয়ে আছে কমলা আর লেবু ফুলের গন্ধে। সে-গন্ধ এত তীব্র যে দীর্ঘদিন বুজে থাকা গন্ধনালী ভেদ করে ভিতরে ঢোকার পথ করে নিতে পারল, সেই মন মাতানো গন্ধ বুকে টেনে নিয়ে পুলকিত হয়ে উঠল মাইকেল।
ওর ভাঙা মুখের ক্ষতটা সম্পূর্ণ সেরে গেছে, তবে হাড়টা জায়গামত জোড়া গেনি। তাছাড়া, সাইনাসগুলোর উপর একনাগাড়ে চাপ লাগায় বা চোখে ব্যথা অনুভব করে। শুধু তাই নয়, সবচেয়ে বিচ্ছিরি ব্যাপার হলো, অনবরত পানি ঝবে নাক দিয়ে, রুমালটা ভিজে জবজবে হয়ে যায় শ্লেষ্ময়-গেয়ো, অসভ্য চাষাদের মত, নাক ঝাড়তে হয় মাটির উপর। অথচ ছোটবেলার কথা মনে আছে মাইকেলের, রুমাল ব্যবহার করা নাকি ইংরেজি বাবুগিরি, তাই বুড়ো ইতালীয়রা ওটা ব্যবহার করত না, পিচঢালা রাস্তার ওপর দাড়িযে ড্রেনে নাক ঝাড়–সে দৃশ্য সাঙ্ঘাতিক ঘৃণার উদ্রেক করত ওর মনে।
আরেকটা ব্যাপার। মুখটা আগের চেয়ে অনেক ভারী হয়ে গেছে, অস্বস্তির সাথে অনুভব করে মাইকেল। অজায়গায় জোড়া লেগেছে হাড়, তাতে চাপ পড়ছে। সাইনাসে, সেটাই নাকি এর কারণ বলেছেন ডা. তাজা ডিমের খোলা ভাঙন, ডাক্তারি ভাষায়, তিনি জানিয়েছেন, জাইগোমার। তার বক্তব্য, হাড় জোড়া লাগার আগে ভাল একজন ডাক্তারকে দেখানো উচিত ছিল, চামচের মত একটা যন্ত্র দিয়ে সেই ডাক্তার যদি ঠেলে হাড়টাকে যথাস্থানে বসিয়ে দিত, তাহলে আর এই অবস্থার সৃষ্টি হত না। এখন এর একমাত্র উপায়, ডা. তাজা জানিয়েছেন, পালার্মোতে যেতে হবে, সেখানের একটা হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে মাইকেলাকে। অপারেশন ছাড়া এর চিকিৎসা নেই। এই বিশেষ অপারেশনটার নামও বলে দিয়েছেন ডা. তাজা–ম্যাক্সিলো-ফেশ্যাল-সার্জারি। বড়সড় একটা সার্জারি, ঠিক জায়গায় জোড়া নাগাবার জন্যে আবার ভেঙে নিতে হবে হাড়টাকে। এই শেষ কথাটাই মাইকেলের জন্যে যথেষ্ট। প্রবল আপত্তি জানিয়ে অপারেশন করাবার ধারণাটাকেই বাতিল করে দিয়েছে ও। ওদিকে ব্যথা বা নাকে সর্দি আসার চেয়ে বেশি কষ্ট দেয় ওকে মুখের ওই ভারী ভাবটা।
