পল্লী-গ্রামে এক এক করে সাতটা মাস কেটে গেছে এবার সত্যি একঘেমে লাগছে মাইকেলের! এই সময়টায় নিজের কাজ-কারবারেও সাঙ্ঘাতিক ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন ডন টমাসিনো আজকাল তাকে বড় একটা দেখা যায় না বাগানবাড়িতে।
নতুন একদল মাফিয়া মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে পালার্মোতে, যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন আর গৃহনির্মাণ কারবারে ঢুকে পড়ে বস্তা বস্তা টাকা রোজগার করছে তারা। পূরানো মাফিয়া নেতাদের গ্রাম্য জমিদারিতে অনধিকার অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে তারা ওই টাকার জোরে। পুরানো, বুড়ো নেতাদেরকে তারা শ্রদ্ধা করে না, গুঁফো সর্দার বলে তাচ্ছিল্য প্রকাশ করে। এদের হাত থেকে নিজের সম্পত্তি রক্ষার কাজেই খুব ব্যস্ত হয়ে আছেন ডন টমাসিনো। ফলে তার সঙ্গ থেকে আপাতত বঞ্চিত হচ্ছে মাইকেল। ওদিকে ডা. তাজা এখনও ওকে গল্প শোনান বটে, কিন্তু ভারও ভাণ্ডার নিঃশেষ হয়ে গেছে, ফলে প্রথম থেকে আবার তিনি পুনরাবৃত্তি শুরু করেছেন।
এর মধ্যে একদিন মনস্থির করল মাইকেল, কর্লিয়নি গ্রাম ছাড়িয়ে আরও অনেক দূর পর্যন্ত বেড়াতে যাবে ও, সেই পাহাড় টপকে আরও ভিতর দিকের গ্রামগুলোয়।
বলাবাহুল্য, সেই রাখাল দেহরক্ষীদেরকেও সাথে লি মাইকেল। সিসিলিতে কর্লিয়নি পরিবারের শত্রু আছে, তাদের ভয়ে দেহরক্ষী নিয়ে চলাফেরা করতে হয় মাইকেলকে, ব্যাপারটা সেরকম নয়। আসল কথা, এলাকাটা সাঙ্ঘাতিক বিপজ্জনক। স্থানীয় নয় এমন যে-কোন লোকের জন্যে একা বাইরে ঘুরে বেড়ানো আত্মহত্যা করার সামিল। অনেক সময় এমন কি স্থানীয় লোকেরাও নিরাপদ নয়, তাদেরও বিপদ ঘটতে পারে। চোর ডাকাত গিজগিজ করছে চারদিকে, তার উপর চলছে নিজেদের মধ্যে মাফিয়া দলগুলোর মারামারি কাটাকাটি। এই সব কারণে সাধারণ লোকেরাও টপাটপ খুন হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া, একা বেরুলে, পাগলিয়াও-চোর বলে মনে করা হতে পারে মাইকেলকে।
খেতের মাঝখানে খড় দিয়ে তৈরি চালের ঘরগুলোকে বলে পাগলিয়াও। এই ঘরগুলোয় চাষবাসের জন্যে যতরকম হাতিয়ার আর যন্ত্রপাতি লাগে তার সবই রাখা হয়। প্রয়োজনে ওখানে বিশ্রাম নিতে পারে শ্রমিকরাও। সিসিলিতে খেতগুলো গ্রাম থেকে অনেক দূরে, রোজ রোজ কৃষি যন্ত্রপাতিগুলো বয়ে নিয়ে আসার ঝামেলা থেকে রেহাই পাবার জন্যে এই ব্যবস্থা। খেতের কাছেপিঠে বসবাস করার অনেক বিপদ। তাছাড়া, ঘর তুলে খেতের জমি নষ্ট করতে চায় না কেউ। চাষীরা সবাই যে-যার গ্রামে থাকে, সূর্য উঠতে যা দেরি, অমনি সবাই খেতের দিকে হাঁটা দেয়। পায়ে হাঁটা ডেলি প্যাসেঞ্জার বলা চলে এদেরকে। কিছুদিন আগে পাগলিয়াও থেকে যন্ত্রপাতি চুরির হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। এতে চাষীর সাঙ্ঘাতিক ক্ষতি হত, তার কারণ সরকার বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চুরি যাওয়া জিনিস কখনোই উদ্ধার করে দিতে পারত না। আইন যখন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো, স্থানীয় মাফিয়া সংগঠন তখন গরীব চাষীদের স্বার্থরক্ষার দায়িত্ব নিতে এগিয়ে এল। তারা নিজেদের আলাদা নিয়মে সমস্যার সমাধান করে ফেলল। অন্যান্য ক্ষেত্রের মত এখানেও তারা প্রায় সম্পর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। গর্তের ভিতর ধোয়া দিয়ে যেমন ইদর বের করা হয় তেমনি কৌশলে যেখানে যত পাগলিয়াও চোর ছিল তাদের সবাইকে তাড়া করে বের করে আনা হতে লাগল ঘরের বাইরে, তারপর গুলি করে মেরে ফেলা তো পানির মত সহজ কাজ। একথা সত্যি যে এই পাইকারী হত্যাযজ্ঞের দরুন বেশ কিছু নিরীহ ভাল মানুষও মারা পড়ল।
তবে, চাষীদের যন্ত্রপাতি এখনও কিছু কিছু চুরি যায়। তাই সদ্য লুঠ করা কোন পাগলিয়াও-এর আশে পাশে ঘুর ঘুর করতে দেখলে মাইকেলকেও ওরা চোর বলে মনে করতে পারে, কিন্তু ওর সাথে স্থানীয় কোন চেনা লোক জামিন হিসেবে থাকলে আলাদা কথা।
সকালটা মিষ্টি রোদে ভরা। খেতের মধ্যে দিয়ে হাঁটছে মাইকেল। রাখাল দুজনও আসছে ওর পিছু পিছু।
রাখালদের একজন খুবই সাদাসিধে, যাকে বলে ভাল মানুষের গাছ। দেখেও মনে হয়, আর আসলেও কথাটা সত্যি-লোকটার মাথায় বুদ্ধি-সুদ্ধি বলতে গেলে একেবারেই নেই। লোকটার নাম কার্লো। মরা মানুষের মুখে যেমন কথা থাকে না, কার্লোর মুখেও কথা নেই, তবে বাবা নয় সে, মুখটা রেডইণ্ডিয়ানদের মত ভাবলেশহীন। বোগা পাতলা লোক, শরীরের বাঁধুনির মধ্যে একটা ক্ষিপ্র ভাব আছে-মাঝ বয়সী সিসিলীয়দের গায়ে চর্বি জমতে শুরু করার আগে যেমন থাকে।
অপর রাখালটা ঠিক তার উল্টো। উদ্যমী, উৎসাহী, প্রাণচঞ্চল এক যুবক। সিসিলি ছাড়াও অন্যান্য দেশ দেখার সুযোগ হয়েছে তার। অবশ্য বেশির ভাগ সমুদ্রই দেখেছে, স্থলভাগ দেখার বিশেষ কোন সৌভাগ্য হয়নি। যুদ্ধের সময় নাবিক হিসেবে ইটালিয়ান নৌবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল সে। জাহাজ ডুবির আগে বেচারা উলকি পরার সময়টুকু পেয়েছিল মাত্র। বৃটিশরা তাকে বন্দী করে। কিন্তু ছাড়া পেয়ে যখন গ্রামে ফিরে এল, ওই উঁকিটার জন্যে মস্ত এক কেউকেটা বনে গিয়েছিল।
সিসিলির লোকদের উলকি পরতে দেখা যায় না বললেই চলে। আসলে, সুযোগ নেই, সেজন্যে ইচ্ছাও নেই। এই রাখালটার নাম ফ্যাৱিষযিয়ো। উলকি সে শখ করে পরেনি, তার পেটের উপর বেটপ আকৃতির লাল একটা জজুল আছে, সেটা ঢাকার জন্যে পরেছিল।
সিসিলীয়রা উলকি না পরলেও রঙচঙে ছবি তারা খুবই ভালবাসে। মাফিয়া, সংগঠনের যে সব সদস্য বা সমর্থক হাটে গিয়ে বেচাকেলনার ব্যবসা করে তাদের কাঠের তৈরি গাড়িতে আশ্চর্য সব আদি রসাত্মক ছবি আঁকা থাকে। প্রচুর শ্রম আর স্নেহ ঢেলে আঁকা হয় রঙচঙে দৃশ্যপটগুলো।
