গরীব মানুষেরা আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে ওখানে। পাহাড়ের গা কেটে কার্লো পাথর বের করে নিয়ে তাই দিয়ে তৈরি করেছে বাড়ি ঘর! গোটা এলাকায় প্রায় সবারই অকস্থা করুণ। ছোট্ট এই গ্রামটায় গত বছর ষাটজন লোক খুন হয়েছে। মৃত্যু যেন তার হিম-শীতল ছায়া ফেলেছে এই গ্রামটার উপর।
পাহাড় ছাড়িয়ে আরও দরে চাষের জমি। খেতের চোখ টাটানো একঘেয়ে দৃশ্য। ভেঙে তারপর শুরু হয়েছে ফিকুৎসার বিস্তীর্ণ বনভূমি।
মাইকেলের সাথে যখনই বেরোয়, সাথে অবশ্যই লুপারা বন্দুক নেয় রাখাল বা দেহরক্ষীরা ভয়ঙ্কর শক্তিশালী সিসিলীয় শটগানকে লুপারা বলা হয়। মাফিয়াদের অত্যন্ত প্রিয় অস্ত্র এটা। এই অস্ত্রকে কতটা ভয়ঙ্কর বলে মনে করা হয় তার একটা উদাহরণ দেয়া যায় মুসোলিনীর নিযুক্ত একজন পুলিশ অফিসারের নির্দেশ থেকে।
সিসিলি থেকে মাফিয়া সংগঠনকে সম্পূর্ণ উৎখাত করার জন্যে সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে মুসোলিনী একবার একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাকে পাঠালেন। পুলিশ অফিসারের প্রথম কয়েকটা কাজের মধ্যে একটা হলো, যেখানে যত পাথরের তৈরি উঁচু দেয়াল আছে সব ভেঙে তিন ফুট উচ্চতায় নামিয়ে আনা, পারাধারী খুনীরা যাতে দেয়ালের পিছনে গা ঢাকা দিয়ে পুলিশ মারতে না পারে। তবে, এতে তেমন ফায়দা ঠয়নি অগত্যা, অন্য কোন উপায় নেই দেখে, মাফিয়ার সমর্থক বা সদস্য বলে যাকেই সন্দেহ হয় তাকেই গ্রেফতার করে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়া হলো অন্য কোন দ্বীপে। এই পদ্ধতিতে অবশ্য পুলিশ অফিসারের উদ্দেশ্য সফল হলো।
তারপর মিত্রপক্ষের সৈন্যরা যখন সিসিলিকে মুক্ত করুক, মার্কিন সামরিক সরকারের মনে হলো ফ্যাসিস্ট শাসনামলে যাকেই জেলে ভরা হয়েছে সে নিশ্চয়ই গণতন্ত্রের খাঁটি সমর্থক। মার্কিনীরা মাফিয়া সদস্য আর তাদের সমর্থকদের অসংখ্য লোককে শহর-গ্রামের মেয়রের পদ আর সামরিক সরকারের দোভাষীর পদে নির্বাচিত করল! অপ্রত্যাশিত এই সৌভাগ্য লাভ করে আবার পুনর্গঠিত হওয়ার সুযোগ পেল মাফিয়া সংগঠন। আবার তারা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল।
খানিকটা ঘুমের জন্যে প্রচুর পরিশ্রম আর সাধ্য-সাধনা করতে হয় মাইকেলকে। অনেক দূর পর্যন্ত হাটে ও, রাতে গুরুপাক এক প্লেট পাস্তা এক বোতল কড়া মদ আর প্রচুর মাংস খেতে হয় ওকে। ইতালীয় ভাষায় লেখা অসংখ্য বই আছে ডাক্তার তাজার লাইব্রেরিতে। কলেজে খানিকটা ইটালিয়ান পড়েছে মাইকেল, ইতালির আঞ্চলিক ভাষায় কিছু কিছু কথাও বলতে পারে, তবু বইগুলো পড়তে যথেষ্ট কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে ওকে। তবে এই কষ্টটুকু স্বীকার করায় একটা লাভ হলো। উচ্চারণ আর টান প্রায় নিখুঁত হয়ে এল ওর। এখন আর ওর কথায় বিদেশী টান নেই। কিন্তু তাই বলে নিজেকে স্থানীয় লোক বলে চালানো সম্ভব নয়। সবাই ভাবে, এই অদ্ভুত মানুষটা সুইজারল্যাণ্ড আর জার্মানীর কাছাকাছি সীমানা থেকে এসেছে।
মুখের ভাঙা বাঁদিকটার জন্যে এদিকের লোক বলে মনে হয় ওকে। চেহারায় এ-ধরনের বিকৃতি সর্বত্র প্রচুর সংখ্যায় দেখা যায় সিসিলিতে। তার কারণ, এখানে চিকিৎসার অভাব সবচেয়ে বড়। তাছাড়া, ছোটখাটো ক্ষত বা শারীরিক ত্রুটির চিকিৎসা হয় না টাকার অভাবেও। এখানে ছেলে থেকে বুড়ো পর্যন্ত সবার চেহারায় এমন সব বিকৃতি লক্ষ করা যায় যা সামান্য একটু অপারেশন বা ডাক্তারির সাহায্যে। শুধরে নেয়া যায় আমেরিকায়।
কে-এর কথা প্রায়ই মনে পড়ে মাইকেলের। মনের পর্দায় ভেসে ওঠে তার
মুখের হাসি। চোখ বুজলে তার শরীরটাও দেখতে পায় ও। যখনই মনে পড়ে তার কথা, প্রতিবার বিবেকের দংশন অনুভব করে ও। একটা অপরাধবোধে জর্জরিত হয়। চলে আসার সময় বিদায় জানানো হয়নি, ওদের সম্পর্কের যে এখানেই ইতি সে-কথা বলা হয়নি-সেটাই ওর অপরাধবোধের কারণ। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, দু-দুজন লোককে খুন করে আসায় ওর মনে কোন অপরাধবোধ নেই। ওদের ব্যাপারে বিবেকের দংশন অনুভব করে না ও। তার কারণ, ওরা দুজন ওর ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিল। সলোযো ওর বাবাকে খুন করার চেষ্টা করেছিল, আর ক্যাপটেন ম্যাকক্লাস্কি তো ওর চেহারাই বিকৃত করে দিয়েছে চিরকালের জন্যে।
মাইকেল ব্যথা কমাবার ওষুধ চাইলেই ডা. তাজা ওর ভাঙা মুখের চিকিৎসা করার জন্যে চাপ দেন যত দিন যাচ্ছে আরও ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে ব্যথাটা, সেই সাথে তীব্রতাও বাড়ছে।
এ-ব্যাপারে একটা সবিস্তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ডা. তাজা। চোখের নিচে একটা স্নায় আছে, সেটা থেকে আরও অনেক খুদে স্নায়ু বেরিয়ে এসে ছড়িয়ে থাকে চারদিকে। মাফিয়া গুণ্ডারা সাঙ্ঘাতিক পছন্দ করে মুখের ওই জায়গাটা। বরফ ভাঙার গাইতির দুচের মত সরু ডগা দিয়ে ঠিক ওই জায়গাটা বেছে নিয়ে খোঁচা দেয় ওরা। ওই স্নায়ুটাই জখম হয়েছে মাইকেলের। এমনও হতে পারে, সরু এক চিলতে হাড় ফুটে আছে এখানে। পালামোর হাসপাতালে গেলেই ল্যাঠা চুকে যায়। ছোট্ট একটা অপারেশন। তাতে চিরদিনের মত দূর হয়ে যাবে ব্যথাটা।
কিন্তু মাইকেল তাতে রাজী নয়। ডাক্তার কারণ জানতে চাইলে শুধু একগাল হাসে। একদিন উত্তরে বলল, বাড়ি থেকে সাথে করে আনা জিনিস যে ওটা।
ব্যথাটাকে গ্রাহ্য করে না মাইকেল। খুলির ভিতর স্পন্দনের মত টনটনে একটা ভাব অনুভব করে ও জায়গাটাকে যেন যন্ত্রের সাহায্যে পরিষ্কার করার জন্যে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে।
