বাবার মত একজন সর্বগুণে গুণান্বিত পুরুষও কেন বৈধ সরকারের আদর্শ নাগরিক না হয়ে ওণ্ডা হয়ে গেলেন, এ প্রশ্নের উত্তরও খুঁজে পেয়েছে মাইকেল। যে কোন আত্মমর্যাদা জ্ঞানসম্পন্ন তেজস্বী পুরুষের পক্ষে এই বিভীষিকাময় দারিদ্র, আতঙ্ক আর অবমাননা সহ্য করা বা মেনে নেয়া এক কথায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। যে সব সিসিলীয় আমেরিকায় গিয়ে বসবাস শুরু করেছিল তারাও ধরে নিয়েছিল মার্কিন কর্তৃপক্ষও সিসিলীয় কর্তৃপক্ষের মত অত্যাচারী।
পালার্মোর বেশ্যাপাড়ায় সাপ্তাহিক অভিযান চালান ডাক্তার তাজা, অভিযানের সঙ্গী হিসেবে মাইকেলকেও তিনি সাথে নিতে চান। কিন্তু রাজী হয়নি মাইকেল হঠাৎ করে সিসিলিতে পালিয়ে আসতে হয়েছে বলে ওর ভাঙা চোয়ালের উপযুক্ত চিকিৎসা হয়নি। ক্যাপটেন ম্যাকক্লাস্কির প্রচণ্ড ঘূষির স্মৃতিচিহ্ন এখনও মুখের বা দিকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ও। হাড়গুলো জোড়া লেগেছে বাকা ভাবে, পাশ থেকে তাকালে ভাঙাচোরা দেখায় মূর্খটাকে। শুধু তাই নয়, মুখের এই ভাঙাচোরা, তোবড়ানো চেহারার জন্যে কেমন যেন দুশ্চরিত্র লম্পট বলে মনে হয়:ওকে। নিজের চেহারা নিয়ে মনে মনে সব সময়ই একটা গর্ব অনুভব করত ও, সেজন্যেই দুঃখটা আরও বেশি করে বাজে বুকে, চেহারা নষ্ট হওয়ায় যে এত দুঃখ পাবে তা নিজেও কখনও ভাবেনি।
শুধু যে চেহারাটা বিচ্ছিরি হয়ে গেছে তাই নয়, মর্জি-মাফিক একটা ব্যথাও আসা-যাওয়া করে। অবশ্য ব্যথাটা তেমন ভোগাতে পারে না ওকে, ডাক্তার তাজা। ট্যাবলেট খাইয়ে সেটাকে সামলে দেন। তিনি ওর মুখের চিকিৎসা করে ত্রুটিটা সারিয়ে দিতে চেয়েছেন, কিন্তু মাইকেল এড়িয়ে গেছে। বেশ কয়েকটা মাস সিসিলিতে বসবাস করে এটুকু অন্তত বুঝেছে ও যে এখানকার সবচেয়ে অযোগ্য। আর বাজে ডাক্তার সম্ভবত এই তাজা বুড়ো। প্রচুর পড়াশুনা করেন ভদ্রলোক, কিন্তু তার মধ্যে ডাক্তারি বই-পত্র একটাও নেই। মুক্তকণ্ঠে নিজেই স্বীকার করেন, ডাক্তারি বিষয়ের কিছু তিনি বুঝতেই পারেন না। মাফিয়া সংগঠনের প্রধান নেতার তদবিরে পরীক্ষায় পাস করে ডাক্তারি করার ছাড়পত্র পেয়েছেন তিনি। তার পক্ষে সুপারিশ করার জন্যে নেতাটি পালার্মোয়ও গিয়েছিলেন। ডাক্তার তাজা তখন ছাত্র, পরীক্ষা দিয়েছেন মাত্র। তাকে কত নম্বর দেয়া যায় না যায় তা অধ্যাপকদের সাথে আলোচনা করে স্থির করে আসেন নেতাটি। এধরনের আরও ঘটনা থেকে মাইকেল। বুঝতে পারে, যে-সমাজকে মাফিয়া সংগঠন রক্ষা করে সেই সমাজকেই সংগঠনটি। ক্যাসার রোগের মত কুরে কুরে খাচ্ছে। কাজ, সাধনা, পরিশ্রম–এসবের কোন মূল্যই নেই। সিসিলির সব কটা গডফাদার যাকে তাকে দান করেন পেশা, পাবার: যোগ্য নয় যে সে-ও পেয়ে যায় উপকার আর সাহায্য–অনুগত হলেই হলো। এই রাতি যে কতটা বিপজ্জনক তা এরা কেউ বুঝতে চায় না। এতে যে সত্যিকার কাজের লোকেরা ঠকছে, বঞ্চিত হচ্ছে, তা একবার ভেবে দেখার মত লোক নেই সিসিলিতে।
সমস্ত বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাবার জন্যে হাতে যথেষ্ট সময় রয়েছে মাইকেলের। দিনের বেলাটা বাইরে বাইরে কাটায় ও, পল্লীগ্রামে ঘুরে বেড়ায়। ডন টমাসিনোর জমিদারিতে কাজ করে দুজন রাখাল, মাইকেল বাইরে বেরুলেই লুপারা কন্দুক হাতে ওর সঙ্গী হয় তারা। অনেক সময় মাফিয়াদের হয়ে ভাড়াটে খুনী হিসেবে কাজ করতেও পিছ পা হয় না সিসিলি দ্বীপের রাখালরা, অবশ্য শুধু জীবিকা অর্জনের তাড়নায় এ-কাজ করতে বাধ্য হয় তারা।
আমেরিকাতে তার বাবার মাফিয়া সংগঠনের কথা চিন্তা করে মাইকেল। সংগঠনটার প্রভাব যদি আরও বাড়ে, যদি আরও সাফল্য অর্জিত হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত নির্ঘাৎ এই দ্বীপের সংগঠনের মত ভয়ঙ্কর অবস্থা হবে সেটারও, তার বিষাক্ত প্রভাব আর প্রতিক্রিয়া গোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ক্যানসার রোগের মত কুরে কু? খাবে, সম্পূর্ণ রসাতলে পাঠাবে দেশটাকে। যার চোখ আছে সেই দেখতে পাই এরই মধ্যে একটা ভূতের দেশ হয়ে গেছে সিসিলি। শুধু পেটের জন্যে খাবার যোগাড় করার আশায় কত লোক দেশ ছাড়া হয়ে অচেনা অজানা বিদেশে চলে। গেছে। যোতের মত এখনও বেরিয়ে যাচ্ছে। আরেক দল লোক, যারা নিজের রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে অন্যান্যদের শত্রু অর্জন করেছে, তারাও খুন হয়ে যাবার ভয়ে দেশের মায়া শ্রাগ করে গোপনে গা ঢাকা দিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিদিন বেড়াতে বেরিয়ে পায়ে হেঁটে বহু বহু দূর চলে যায় মাইকেল। সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে ও দেশটার উদার সৌন্দর্য দেখে। এখানে সেখানে অগভীর, চওড়া খাদ, খাদের মধ্যে কমলালেবুর বাগান ছায়া তৈরি করে রেখেছে। বাগানে পানি সরবরাহ করা হয় বিশাল মুখওয়ালা নালার মধ্যে দিয়ে। প্রকাণ্ড দাঁতালো সাপের মুখের মত দেখতে সেগুলো খুব সম্ভব তৈরি করা হয়েছে যীশুর জন্মেরও আগে। দালান কোঠাগুলো প্রাচীন রোমক প্রাসাদ আর বাগান বাড়ির ধাচে তৈরি। বিশাল প্রবেশদ্বারগুলো শ্বেত পাথরের তৈরি, প্রকাণ্ড খিলান দিয়ে সাজানো প্রত্যেকটা কামরা। কিন্তু সব ভেঙেচুরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। বেওয়ারিশ ভেড়ার আস্তানা এখন সব!
দূর-দিগন্তের কাছে দেখা যায় উঁচু পাহাড় শ্রেণী। কঠিন পাথরের পাহাড় ওগুলো, মাংস ছাড়ানো ন্যাড়া হাড়ের সাদা টিবি বলে মনে হয়। চারদিকের এই সাদা মরুভূমির মাঝখানে জ্বল জ্বল করে জ্বলছে যেন উজ্জ্বল সবুজ বাগান আর খেতগুলো প্রকৃতির গলায় যেন পরানো রয়েছে ঝকমকে সবুজ পান্নার হার। কখনও কখনও পায়ে হেঁটে কর্লিয়নি গ্রাম পর্যন্ত চলে যায় মাইকেল। গ্রামের সবচেয়ে কাছের পাহাড়টার গায়ে নতুন বসতির সূচনা হয়েছে। বাড়িঘর তৈরি করে আঠারো। হাজার লোক বাস করে ওখানে। দুর থেকে পাহাড়ের গায়ে লম্বা লম্বা দাগের মত। দেখতে লাগে বাড়িগুলোকে।
