প্রায় প্রত্যেক সন্ধ্যায় প্রকাণ্ড বাগানে মাইকেলকে সঙ্গ দেন ডন টমাসিনো আর ডাক্তার তাজা। শ্বেত পাথরের অসংখ্য স্ট্যাচু রয়েছে বাগানে। দেখে মনে হয় এখানের মিঠেকড়া রসে ভরপুর কার্লো আঙ্গুরের গাছগুলোর মত মূর্তিগুলোও যেন। মাথাচাড়া দিয়ে জেগে উঠেছে মাটির নিচে থেকে। মাফিয়াদের সম্পর্কে, তাদের শত শত বছরের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে মজার মজার গল্প বলতে ভালবাসেন ডাক্তার তাজা। তার মৃগ্ধ শ্রোতা হলো মাইকেল কর্লিয়নি। এমন একজন আদর্শ শ্রোতা পেয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠেন ডাক্তার তাজা। এবং মাঝে-মধ্যে সবুজের গা জুড়ানো মিষ্টি মধুর শীতল বাতাস, ফুলের গন্ধে ভরাট কড়া মদ আর বাগানটির প্রশান্ত পরিবেশের প্রভাবে ডন টমাসিনো পর্যন্ত অভিভূত হয়ে পড়েন। তখন তিনিও নিজের দুএকটি অভিজ্ঞতার গল্প শোনান মাইকেলকে।
কত যুগ, কত শতাব্দী আগে তৈরি হয়েছে বাগানটা। এর সাথে কত শত আনন্দ আর করুণ ঘটনার স্মৃতি জড়িত। এখানে বসে মাইকেল কর্লিয়নি বুঝতে পেরেছে তার বাপের বংশের মূল শিকড়টা কোথায়।
মাফিয়া শব্দটার কথাই ধরা যাক। শব্দটার আদি অর্ধ ছিল আশ্রয় স্থল। পরে শব্দটার অর্ধ বদলে যায়। নতুন মানে দাঁড়ায় একটি সংগঠন। এই সংগঠন আপনা আপনি গড়ে উঠেছিল। যে সরকার দেশে অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়ে দেশের লোকদেরকে শত শত বছর ধরে শোষণ আর নিষ্পেষন করে এসেছে সেই সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্যে এই সংগঠনের জন্ম। পৃথিবীর ইতিহাস আঁটলে দেখা যাবে সিসিলির মত আর কোন দেশকে এমন পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠে নিভাবে ধর্ষণ করা হয়নি। ধনী-দরিদ্র সবাইকে রোমক ইনকুইজিশন অর্থাৎ ধর্মযাজকদের প্রশাসন অত্যাচার করেছে নির্বিচারে।
এখানকার রাখাল আর চাষী সমাজের উপর বড় বড় জমিদার আর ক্যাথলিক চার্চের রাজপুরুষদের একচেটিয়া প্রভাব প্রতিপত্তি। এই সব প্রভাবশালীদের হাতের পুতুল হলো পুলিশ বিভাগ। সে জন্যেই সিসিলিতে সবচেয়ে জঘন্য আর অশ্লীল গালি বলতে, পুলিশম্যান বোঝায়।
পুলিশের সাহায্যে পরিপুষ্ট এই প্রচণ্ড পাশবিক ক্ষমতার মুখোমুখি হয়ে নিষ্পেষিত দেশবাসীরা একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আতঙ্কে বাধ্য হয়ে নিজেদের রাগ, ঘৃণা আর বিদ্বেষ গোপন করে রাখতে শিখেছে। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এ শিক্ষাও হয়েছে তাদের যে শত্রু তাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, ওদেরকে শাসানো বা মুখ ফুটে ওদের বিরুদ্ধাচারণ করা নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছু নয়–এতে কোন লাভও নেই, কারণ পাল্টা আক্রমণ সাথে সাথেই আসে। তারা সবাই হাড়ে হাড়ে টের পায়, সমাজ ওদের পরম শত্রু। অন্যায়ের প্রতিকার যদি চাইতেই হয়, গোপনে বিদ্রোহীদের কাছে যেতে হয়। বিদ্রোহী মানে মাফিয়ারা ন্যায্য বিচার করে দেয়।
ওদিকে মাফিয়া সংগঠনের কাজও দিনে দিনে এগিয়ে চলেছে ওমের্তা অর্থাৎ নীরবতার কঠোর নিয়ম চালু করে নিজেদের নিরাপত্তা আর ক্ষমতার ভিত্তি আরও মজবুত, আরও নিচ্ছিদ্র করে এনেছে তারা সিসিলির যে কোন একটা পাড়াগাঁয়ের কথা ধরা যাক, অচেনা কোন লোক এসে যদি জিজ্ঞেস কার সবচেয়ে কাছের শহরে কোন পথ ধরে যেতে হবে, স্থানীয় লোকেরা সাথে সাথে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেবে, উত্তর দেবার ভদ্রতাটুকুও দেখাবে না! মাফিয়া সংগঠনের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুতর অন্যায় কি? পুলিশের কাছে সাহায্য চাওয়া। সংগঠনের কোন সদস্য যদি গুলি খায়; যদি তার উপর অকথ্য অত্যাচার চালানো হয়–তবু সে পুলিশের কাছে গিয়ে মুখ খুলতে পারবে না। পুলিশের সাহায্য না চাইলে লাভ হয়, সবাই টের পেল ব্যাপারটা। ফলে স্থানীয় লোকদের আদর্শ, ধর্ম হয়ে দাঁড়াল ওমের্তা। একটা মেয়ের স্বামী যদি খুন হয়ে যায়, মেয়েটি তার স্বামীর হত্যাকারীর পরিচয় পুলিশকে জানায় না। ছেলে খুন হলে মাও তার খুনীর পরিচয় প্রকাশ করে না। যুবতী, কুমারী মেয়ের সতিত্ব নষ্ট করেছে যে তার নামও পুলিশের সামনে উচ্চারণ করা হয় না।
সমাজে ন্যায় বিচার বলে কোন জিনিসের অস্তিত্ব কোন কালেই ছিল না, আজও নেই। এটাই হলো একমাত্র সত্য। কর্তৃপক্ষ বা বৈধ সরকার নিজেদের আর নির্দিষ্ট মহলের ভাগ্য-উন্নয়নে সাঙ্ঘাতিক ব্যস্ত। আরও একটা কাজে তারা ব্যস্ত বটে, সেটা হলো নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার। তাদের কাছ থেকে ন্যায় বিচার পাবার আশা করা বাতুলতা মাত্র। কেউ কোন দিন কখনও পায়নি। তাই রবিনহুডের মত দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন করে যারা সেই মাফিয়াদের কাছেই গোপনে আসে দেশের লোকেরা। মাফিয়া সংগঠনও ন্যায় বিচার করে দিয়ে দেশবাসীর আস্থা অর্জন করে। কেউ কোন বিপদে পড়লেই মাফিয়া সংগঠনের নেতার কাছে ছুটে আসে। তিনিই দীন-দুঃখীদের আদর্শ সমাজপতি, তিনিই তাদের রক্ষাকর্তা। বস্তা। ভর্তি টাকা, ঝুড়ি ভর্তি খাবার আর গাদা গাদা চাকরি হাতে নিয়ে সারাক্ষণ তৈরি হয়ে থাকেন তিনি সবার জন্যে। কেউ এসে চাইলেই ন্যায় বিচার দেন। তিনিই তো সবার রক্ষাকর্তা।
কিন্তু মাফিয়া সংগঠনের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে একটা কথা উল্লেখ করেননি ডাক্তার তাজা। সংগঠন সম্পর্কে এই সত্যটা মাইকেল নিজে আবিষ্কার করেছে। তাতে অবশ্য বেশ কয়েক মাস সময় লেগেছ তার! ওর আবিষ্কারটা হলো, সিসিলির মাফিয়া সংগঠনগুলো ইদানীং ধনী জমিদার আর বড় বড় ব্যবসায়ীদের বে-আইনী খাদেমে পরিণত হয়েছে। এমনকি এদেশের বৈধ সরকারি নিয়মের আওতায় যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে, তার নিয়ম-কানুন মেনে নিয়ে এরাও এক একজন রাজনৈতিক পাণ্ডা হয়ে উঠেছে বললে ভুল বলা হবে না। সিসিলীয় মাফিয়া সংগঠন এখন একটা আদর্শচ্যুত ধনিক স্বার্থ রক্ষাকারী সংগঠনে। নেমে এসেছে। এরা এখন আর গণতন্ত্রের রক্ষক নয়, বরং গণতন্ত্র বিরোধী। এদের মধ্যে উদারতার অভাব দেখা যাচ্ছে। এমন লোভী হয়ে উঠেছে যে যে-কোন রকম ব্যবসার উপর ট্যাক্স ধরে বসে এরা, সে ব্যবসা যত ছোট আর নগণ্যই হোক না কেন। অর্থাৎ সিসিলীয় মাফিয়া সংগঠন বৈধ সরকার বা আইনসঙ্গত কর্তৃপক্ষের চেয়েও জঘন্যতর কাজ করতে শুরু করেছে।
