আজ থেকে পাঁচ মাস আগে হৃদ্মবেশ পরিয়ে পালার্মে বন্দর থেকে সিসিলি দ্বীপের অভ্যন্তরে নিয়ে আসা হয়েছে মাইকেলকে। ব্যবহার করা পুরানো পোশাক পরানো হয়েছিল ওকে, মাথায় বসিয়ে দেয়া হয়েছিল ঠোঁট লাগানো টুপি।
জায়গাটা একটা প্রদেশের মাঝখানে, প্রদেশটা পরিচালনা করে একটা মাফিয়া সংগঠন। মাফিয়া সংগঠনের নেতা ডন কর্লিয়নির কাছে ঋণী, ডন কর্লিয়নির কাছ থেকে তিনি বড় ধরনের একটা উপকার পেয়েছিলেন এক সময়। কর্লিয়নি গ্রামটা এই প্রদেশেরই একটা অংশ। অনেক বছর আগে মাইকেলের বাবা যখন দেশ ছেড়ে আমেরিকায় চলে গিয়েছিলেন তখন তিনি তার জন্মস্থানের নামটা নিজের নামের সাথে গেঁথে নিয়েছিলেন।
তবে ডন কর্লিয়নির আত্মীয়-স্বজনরা এখন আর কেউ জীবিত নেই এখানে। মেয়েরা সবাই বুড়ো হয়ে মারা গেছে। আর পুরুষরা হয় নিহত হয়েছে গৃহযুদ্ধে, নয়তো আমেরিকা, ব্রাজিল অথবা ইটালিরই অন্য কোন প্রদেশে চলে গেছে।
আরও পরে মাইকেল জানতে পারল, এই দরিদ্র গ্রামটায় খুনোখুনির হার সারা দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
মাফিয়া সংগঠনের নেতার এক চিরকুমার কাকা আছেন, তার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে মাইকেল। সত্তর বছর বয়স কাকার, ভদ্রলোক এই এলাকার জনপ্রিয় ডাক্তারও বটে।
মাফিয়া সংগঠনের নেতা ডন টমাসিনোর বয়স প্রায় পঞ্চাশ, সিসিলির সবচেয়ে অভিজাত আর ধনী পরিবারের যাবতীয় সয়-সম্পত্তি দেখাশুনা করেন তিনি। এই পরিবারটির প্রধান তত্ত্বাবধায়ক তিনিই, পদমর্যাদার স্বীকৃতিস্বরূপ স্থানীয় ভাষায় তাঁকে গ্যাবেলোটো বলা হয়। গ্যাবেলোটোর কাজের মধ্যে একটা হলো, সর্বহারা বা সুযোগসন্ধানীরা যাতে পতিত জমি দখা করে না ফেলে, বা অবৈধভাবে মালিকের জমিতে শিকার না করে কিংবা ফসল কেটে নিয়ে না যায় সেদিকে নজর রাখা। সংক্ষেপে, মাফিয়াদেরই প্রতিনিধিত্ব করছে গ্যাবেলোটোরা। গরীব আর সাধারণ লোকদের ন্যায্য অন্যান্য সব রকম দাবি আর অধিকার থেকে তাদেরকে। বঞ্চিত করে ধনী মনিবদের স্থাবর সম্পত্তি রক্ষা করাই এদের কাজ। বিমিয়ে এরা মনিবের মোটা টাকা খায়। কখনও যদি জমিহীন গরীব কৃষক আইনের সাহায্য নিয়ে। পতিত জমিতে ফসল বোনার চেষ্টা করে তাহলেই কাজ শুরু হয়ে যায় গ্যাবেলোটোদের। মারধর করে, খুন করার ভয় দেখিয়ে চাষীদেরকে ভাগিয়ে দেয়। তারা। পানির মত সহজ কাজ। তেমন ঝক্কি-ঝামেলা নেই।
ডন টমাসিনো এলাকার পানি ভাগ-বাটোয়ারার মালিকও বটে রোমক সয়াট যদি এখানে কোন নতুন বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা করেন, তিনি সেটা এক কথায় বাতিল করে দেন। বাঁধ তৈরি হলে তার মস্ত ক্ষতি হবে, সুতরাং আর সব কিছু তিনি মেনে নেবেন, কিন্তু বাধ তৈরি হতে দেবেন না। অসংখ্য আর্টেজায় কুয়ো আছে। তার হাতে। ওই সব কুয়োর পানি বেচে বস্তা বস্তা টাকা কামান তিনি। বাধ তৈরি হলে একেবারে সস্তায়, পানির দরে বিক্রি হবে পানি-তার এত লাভের ব্যবসাটা। ধ্বংস হয়ে যাবে। তা তিনি কিভাবে হতে দিতে পারেন? যুগ যুগ নয়, শত শত বছর ধরে পানি সরবরাহের একটা একচেটিয়া কারবার কত সহস্র লোকের পরিশ্রমের ফলে তিলে তিলে গড়ে তোলা হয়েছে। বৃদ্ধি এবং ভাগ্যের জোরে আজ তিনি এটির মালিক। এমন একটা ঐতিহ্যকে, প্রচণ্ড সাধনার ফলকে কিভাবে তিনি ধ্বংস হতে দিতে পারেন?
তবে যে যাই বলুক, ডন টমাসিনো ড্রাগস বা নারী ব্যবসা ছুঁয়েও দেখেন না। সবাই জানে, এসব ব্যাপারে তিনি অত্যধিক সেকেলে, রক্ষণশীল স্বভাবের মানুষ। ওদিকে পালার্মো আর অন্যান্য বড় শহরে নতুন নতুন যে-সব মাফিয়া নেতার উদয় হচ্ছে তাদের উপর ইটালিতে নির্বাসিত মার্কিন গুণ্ডাদের প্রভাব বড় বেশি-বেশ্যা বা ড্রাগস কেন, কোন ব্যবসাতেই তাদের অরুচি নেই।
সাঙ্ঘাতিক মোটা মানুষ ডন টমাসিনো। স্থানীয় ভাষায় যাকে বলে পেটওয়ালা মানুষ। আক্ষরিক অর্থে তো বটেই, আবার আলঙ্কারিক অর্থেও বলা হচ্ছে–যাকে সবাই সভম আর ভয় করে। এই রকম একজন নেতার আশ্রয়ে রয়েছে মাইকেল। ভয়ের কোন কারণ নেই, সবদিক থেকে নিছিদ্রই বলা যায় ওর নিরাপত্তা। কিন্তু তবু ওর পরিচয় গোপন রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ডনের কাকার নাম ডা. তাজা। তার পাচিল ঘেরা বাগান বাড়ির ভিতরই সময় কাটে মাইকেলের।
অস্বাভাবিক লম্বা আকৃতির মানুষ ডাক্তার তাজা। পুরো ছয় ফুট, সিসিলীয়দের তুলনায় একটু বেশিই লম্বা। মুখটা টকটকে লাল, মাথায় ধবধবে সাদা চুল। বয়স সত্তরের উপর হলে হবে কি, হপ্তায় একবার অন্তত পালার্মোয় যানই তিনি-ওখানেই তত সেরা তরুণী বেশ্যা মেয়েদের আড্ডা। মেয়েগুলোর একনিষ্ঠ ভক্ত তিনি। তাদের বয়স যত কম হবে, ততই আকৃষ্ট হবেন তিনি। সাঙ্ঘাতিক রসিক মানুষ। তার আরও একটা দুর্বলতা আছে। সেটি হলো বই পড়া। ব্যাপারটা নেশার মত, বা তার চেয়েও বাড়া। বইগুলো গ্রোসে গেলেন বললেও কম বলা হয়। যত পান। তত পড়েন। কোন বাছবিচার নেই। ছাপার অক্ষরে যেখানে যত কিছু আছে সবই তাঁর পাঠ্য বিষয়। শুধু যে পড়েই ক্ষান্ত হন, তা নয়। পড়া বিষয়গুলো মজার গল্পের আকারে গ্রামের লোকজন, নিজের নিরক্ষর চাষী, রোগী আর জমিদারের রাখালদেরকে শোনান তিনি। তার স্বভাবের জন্যে স্থানীয় লোকেরা তাকে পণ্ডিত, বুদ্ধ ইত্যাদি উপাধি দিয়েছে।
