একনাগাড়ে কথাগুলো বলে দ্রত কামরা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে জুলস। পিছন থেকে কথা বলে উঠল নিনো।
চমৎকার, অপূর্ব! চেঁচিয়ে উঠল নিনো। দারুণ বলেছেন, ভায়া।
চরকির মত আধ পাক ঘুরে দাঁড়াল জুলস। মি. ভ্যালেন্টি, বোজ বেলা বারোটার আগেই কি মাতাল হয়ে পড়েন আপনি?
নিশ্চয়ই, বলল নিনো। নির্মল সতর্কতার সাথে, দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসছে সে।
রাগটা পানি হয়ে গেল জুলসের। যতটা রূঢ় ভাবে মন্তব্য করতে যাচ্ছিল তার চেয়ে নরম গলায় বলল, তাহলে আর পাঁচ বছর বাঁচবেন আপনি, তার আগেও শেষ হয়ে যেতে পারেন-কথাটা মনে রাখলে ভাল করবেন।
ছোট ছোট পা ফেলে, প্রায় নাচের ভঙ্গিতে জুলসের দিকে এগিয়ে এল নিনো। ডাক্তারকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল সে। নিঃশ্বাসের সাথে ভুরভুর করে মদের গন্ধ বের হচ্ছে। দিল খোলা হাসি মুখে বলল, পাঁচ বছর? হাসির মাত্রাটা বেড়ে গেল তার। এত বেশি দিন বেঁচে থাকতে হবে, ডাক্তার? তুমি আমাকে এতবড় দুঃসংবাদ দিচ্ছ?
.
এক মাস পরের ঘটনা।
লাস ভেগাস। হোটেল। সুইমিং পুলের কিনারায় বসে রয়েছে লুসি ম্যানচিনি। হাতে একটা ককটেলের গ্লাস। ওর কোলে রয়েছে জুলসের মাথা। আরেক হাত দিয়ে জুলসের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে লুসি।
এত ভয় পাবার কোন দরকার নেই, ঠাট্টার সুরে বলল জুলস। তোমার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করছ। ঘরে আমাদের জন্যে শ্যাম্পেনের বোতল অপেক্ষা করছে।
তোমার আর ধৈর্য মানছে না, না? বলল লুসি। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি কিছু করতে গেলে কোন ক্ষতি হবে না তো?
তুমি ভুলে যাচ্ছ আমি একজন ডাক্তার, বলল জুলস। সময় হয়নি মনে করলে এত তাগাদা দিতাম? কোন ভয় নেই তোমার। আজই আমাদের সেই পরম রজনী। একটা ব্যাপার বুঝতে পারছ, ডার্লিং?
কি?
ডাক্তারি ইতিহাসে আমিই একমাত্র ডাক্তার যে তার নিজের হাতের কাজ নিজেই হাতেকলমে পরীক্ষা করবে। পরীক্ষার আগে, এবং পরীক্ষার পরে। বিষয়টা নিয়ে পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখতে কি যে মজা লাগবে আমার। সবুর, ব্যাপারটা একটু বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। বক্তৃতা দেবার ঢঙে শুরু করুল জুলস, চিকিৎসক তথা গবেষক-সুলভ দক্ষতা এবং হৃদয়গত কারণে যদিও আগের অনুষ্ঠানটি পরম আনন্দদায়ক ছিল, কিন্তু অপারেশনের পরের অনুষ্ঠানটি আগেরটার চেয়ে অবশ্যই অনেক বেশি উপভোগ্য হতে বাধ্য…। ব্যথায় চিৎকার করে উঠল জুলস, ভীষণ জোরে তার চুল টেনে ধরেছে লুসি।
মাথা নিচু করে আছে লুসি। চোখ দুটো নত। কিন্তু একটু একটু হাসছে ফিস। ফিস করে বলল, আজ যদি ভাল না লাগে, মনে করতে হবে তুমিই দায়ী-তোমারই ব্যর্থতা।
প্রশ্নই ওঠে না ব্যর্থতার, দৃঢ় আস্থার সাথে বলল জুলস। সেন্ট পার্সেন্ট গ্যারান্টি দিচ্ছি আমি কেলনার ব্যাটাকে হাতের কাজটুকু করতে দিলেও পরিকল্পনাটা তো আমার। এখন একটু বিশ্রাম নেয়া একান্ত কর্তব্য। সারারাত ধরে গবেষণা চলবে আজ।
আজকাল এক সাথেই থাকে ওরা। হাত ধরাধরি করে এক সময় নিজেদের কামরায় ফিরে এল। লুসি আবিষ্কার করল, তাকে চমকে দেবার আয়োজন করে রেখেছে জুলস। দুজন মাত্র মানুষ, কিন্তু বারোজনের খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করেছে সে। শুধু তাই নয়, শ্যাম্পেনের বোতলগুলোর পাশেই দেখা যাচ্ছে একটা বাক্স। দেখেই চিনতে পারল লুসি, ওটা একটা গয়নার বাক্স। সেটা খুলতেই প্রকাণ্ড হীরে বসানো বাগদানের একটা আংটি দেখতে পেল লুসি।
এ থেকেই কি প্রমাণ হয় না, নিজের কাজে আমার কতটা আস্থা? বলল জুলস। আমি তোমাকে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছি। বিয়ে করার আগে নিজের বউকে মেরামত করিয়ে নেবার আর কোন ঘটনা আছে কিনা আমার জানা নেই। এখন দেখা যাক, আমার স্ত্রী হবার যোগ্যতা কি পরিমাণে রয়েছে তোমার মধ্যে।
গভীর মমতায় আপ্লুত হয়ে উঠেছে জুলসের মনটা। আশ্চর্য কোমল ব্যবহার করছে সে লুসির সাথে। কিন্তু তবু ভয় ভয় করছে লুসির। গায়ে জুলসের মৃদু একটু ছোঁয়া লাগলেই শিউরে উঠছে, জড়োসড়ো হয়ে পড়ছে। তবে, খানিক পর সমস্ত ভয় কাটিয়ে উঠল সে।
কিভাবে, তা সে নিজেই টের পেল না শুধু অনুভব করল, তার সারা শরীর জুড়ে বিদ্যুতের মত তীব্র কামনার হোত বইতে শুরু করেছে এমন প্রচণ্ডভাবে আর কখনও আক্রান্ত হয়নি সে।
হাতের কাজটা আমার ভালই হয়েছে, বুঝলে? লুসির কানে কানে বলল জুলস। প্রথমবারই পরম তৃপ্তি পেয়েছে সে।
লুসি জবাবে ফিসফিস করে বলল, ভাল, হ্যাঁ নিশ্চয়ই,•••এত ভাল, এই ভাল, এতটা আমি আশা করিনি।
দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসছে ওরা। তারপর আবার শুরু হলো ওদের একান্ত গোপনীয় খেলা গবেষণার সাফল্য আত্মহারা করে তুলেছে জুলসকে। আর লুসি খুঁজে পেয়েছে তার হারানো মানিক। তার জীবনে আজ আর কোন অপূর্ণতা নেই। যে জিনিস হারালে আর কোন দিন ফিরে পাওয়া যায় না, সেই জিনিস ফিরে পেয়েছে সে।
৩.১১ নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছে মাইকেল কর্লিয়নি
১১.
সিসিলি। নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছে মাইকেল কর্লিয়নি। পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোয় এখন মাইকেল তার বাবাকে চিনতে শিখেছে, বুঝতে পেরেছে তার চরিত্র আর নিয়তিকে। এখানে এসে জীবন সম্পর্কে তার ধারণা একটু। একটু করে বদলে গেছে। এখন তার মনে হয় জীবনের কঠোর বাস্তব দিকটা সম্পর্কে তার কোন ধারণাই ছিল না-বলতে গেলে এক রকম অন্ধই ছিল সে। এখন সে শুধু বাবাকে নয়, লুকা ব্রাসিকেও বুঝতে পারে। বুঝতে পারে পাষাণ হৃদয় ক্যাপোরেজিমি ক্লেমেঞ্জাকে। বুঝতে পারে মায়ের আত্মসমর্পণের কারণ, আর তার। নির্ধারিত ভূমিকার তাৎপর্য এরা সবাই যোদ্ধা, ভাগা এদের শত্রু। ভাগ্যের সাথে। যুদ্ধ না করলে এরা সবাই অনেক আগেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত দুনিয়ার বুক থেকে। সিসিলিতে না এলে এই জ্ঞান হত না মাইকেলের। একটাই মাত্র নিয়তি থাকে মানুষের, ডনের এই কথাটার অর্থ এবং তাৎপর্য কি, এখন তা পরিষ্কার বুঝতে পারে সে। কর্তৃপক্ষ বা বৈধ, আইনসঙ্গত সরকারকে কেন অমান্য করা হয়, যারা ওমের্তা লঘন করে, নীরবতার শপথ ভঙ্গ করে, কেন তাদেরকে ঘৃণা করা হয়-সময়ের সাথে সাথে এসবেরই অর্থ বুঝতে পারছে মাইকেল।
