এক নিমেষে খেপে উঠল জনি। অ্যাই, শয়তানের হাড্ডি! কি ভেবেছ তুমি আমাকে, অ্যাঁ? ভেবেছ আমাকে এখানে আটকে রেখে তুমি আমার গলা ঘাটাঘাটি করবে? এক্সপেরিমেন্ট চালাবে?
জনি ফন্টেনের অপমানকর আচরণেও মুখের হাসি এতটুকু মান হলো না জুলসের। আনন্দে ডগমগ করছে সে এত আনন্দ পাবে, তা সে নিজেও কল্পনা করেনি–পরিষ্কার করে ওকে জানিয়ে দিল, আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছুই করতে যাচ্ছি না আমি। যা খুশি করতে পারেন আপনি। এখান থেকে আপনি চলে যেতে পারেন, তাতে আমি বাদ সাধব না। যাবার আগে শুধু জেনে যান, আপনার স্বরতন্ত্রীতে কিছু একটা গজিয়েছে। তার মানে, আপনার বাগযন্ত্রে। জিনিসটা কি, ক্যানসার নাকি অন্য কিছু তা জানতে হলে এখানে কিছুক্ষণ থাকতে হবে আপনাকে। ক্যানসার হোক বা না হোক, জিনিসটা সরাবার জন্যে অপারেশনের দরকার নাকি শুধু ওষুধপত্র দিয়ে কাজ হবে, তাও পরিষ্কার জানা যাবে। একটু থেমে আবার বলল জুস, অনেকগুলো রাস্তা খোলা রয়েছে আপনার সামনে, যেকোন একটা বেছে নিতে পারেন আপনি। গরজ থাকলে নিজেকে আমার হাতে ছেড়ে দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে, আমেরিকার শ্রেষ্ঠ একজন বিশেষজ্ঞ ডাকা যেতে পারে–যদি আপনি খরচ দেন আর আমি দরকার বলে মনে করি। ভদ্রলোক আমার অনুরোধ পেলে আপনাকে দেখার জন্যে প্লেনে চড়ে এখানে চলে আসবেন। অথবা আপনি এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যেতে পারেন, গিয়ে আপনার সেই ব্যক্তিগত হাতুড়ের হাতে নিজেকে ছেড়ে দিতে পারেন। কিংবা, দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে আর কাউকে দেখাতে পারেন ওরা হয়তো অক্ষম আর কারও কাছে পাঠাবে। আপনাকে। ওটা যদি সত্যি ক্যানসার হয়, ততদিনে আরও বেড়ে যাবে, তখন ওরা আপনার গোটা বাগযন্ত্রটাই কেটে ফেলে দেবার পরামর্শ দেবে, বলবে, তা নাহলে আপনি মারা যাবেন। আরেক কাজ করতে পারেন আপনি। সোজা বাড়ি ফিরে গিয়ে চুপচাপ বসে স্রেফ দরদর করে ঘামতে পারেন। আমার পরামর্শ যদি শোনেন, দয়া করে এখানেই থেকে যান। কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার মাত্র। সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। কি হয়েছে না হয়েছে নিশ্চিতভাবে জানতে পারবেন। একটু থেমে মৃদু হেসে জানতে চাইল জুলস, কোথাও খুব জরুরী কোন কাজ আছে বুঝি আপনার?
দরকার নেই বাবা আর কোথাও গিয়ে, বলল নিনো, জনি, এত করে যখন বলছেন উনি, পরীক্ষাটা করিয়েই নে, বাবা হলরুম থেকে স্টুডিওতে ফোন করে দিচ্ছি আমি। কাউকে কিছু জানাচ্ছি না, শুধু বলব ফিরতে একটু দেরি হবে আমাদের। জনিকে প্রতিবাদের কোন সুযোগ না দিয়ে দ্রুত চলে গেল নিনো ফোন করতে।
লম্বা দুপুর, কাটতেই চায় না। কিন্তু শেষমেষ কাজ হলো বৈকি। রোগটা কি তা নির্ভুলভাবে ধরতে পারলেন হাসপাতালের গলাবিশেষজ্ঞ এক্সরে, সোয়াব ইত্যাদি বিশ্লেষণ-এর রিপোর্ট দেখে রোগটা সম্পর্কে জুসেরও পরিষ্কার একটা ধারণা জন্মাল।
পরীক্ষার সময় যথেষ্ট অসহযোগিতা করল জনি ফস্টেন। ঠোঁটের কোণ বেয়ে আয়োডিন গড়িয়ে পড়ছে, মুখ ভর্তি গজের রোল, ওয়াক ওয়াক করে বমির আওয়াজ তুলতে তুলতে মাঝপথে উঠে যেতে চাইল সে দুই কাধ চেপে ধরে জোর করে ওকে বসিয়ে রাখল নিনো। পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। জনি ফন্টেনের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসছে জুলস, বলল, আঁচিল।
ব্যাপারটা প্রথমে বুঝতেই পারল না জনি। কয়েকটা আঁচিলের মত হয়েছে, বুঝিয়ে দেবার জন্যে আবার বলল জুলন, বড সসেজের ছাল ছাড়াবার মত করে ওগুলোকে ছাড়িয়ে আনা হবে। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবেন আপনি। কয়েক মাস সময় লাগবে অবশ্য।
আনন্দে লাফ মারতে শুরু করল নিনো, গলা ছেড়ে চিৎকার করছে সে।
কিন্তু এখনও ভুরু কুঁচকে রয়েছে জনি। জানতে চাইল, আমার গান গাওয়ার কি হবে? আবার আমি গাইতে পারব?।
শ্রাগ করল জুলস। গান গাইতে পারবেন কিনা তা এখনও গ্যারান্টি দিয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। গান তো আপনি এখনও গাইতে পারছেন না, ভবিষ্যতেও যদি গাইতে না পারেন–মেনে নিতে হবে ব্যাপারটাকে।
আবার জুলসের উপর চটে গেল জনি ফন্টেন। বিরক্তির সাথে বলল, আজব ছোকরা তো! কি বলছ তা তুমি নিজেই জানো না। তোমার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, আমাকে তুমি কত বড় সুখবরই না দিচ্ছ। অথচ আসলে বলতে চাইছ যে আমি হয়তো আর কোনদিনই গান করতে পারব না। কি? ঠিক এই কথাই বলতে চাইছ তুমি, তাই না? গাইতে পারব না আর কোন দিন? জবাব দাও।
এবার রেগে উঠল জুলসও। একজন আদর্শ ডাক্তারের কর্তব্য পালন করেছে। সে। কাজটা করে যথেষ্ট আনন্দও পেয়েছে। যে-কোন নির্বোধও বুঝবে যে হতভাগা লোকটার মস্ত একটা উপকার করেছে সে, অথচ লোকটার ধারণা সে তার সাঙ্ঘাতিক ক্ষতি করে দিয়েছে।
শুনুন, মি. ফন্টেন, ঠাণ্ডা, চাপা গলায় শুরু করল জুলস, একজন পাস করা ডাক্তার আমি, ছোকরা নই। এবার যখন আমাকে সম্বোধন করবেন, ডাক্তার শব্দটা উচ্চারণ করতে ভুল করবেন না, এবং ছোকরা শব্দটা আর কারও জন্যে মুখের ভিতরেই কোথাও জমা করে রাখবেন। আপনাকে আমি বোক বলতে চাই না, কিন্তু যে-কোন লোককে একবার জিজ্ঞেস করলেই বুঝবেন আপনাকে সত্যিই আমি একটা সুখবর দিয়েছি এখানে আপনাকে নিয়ে আসার সময় কি ভেবেছিলাম, জানেন? ভেবেছিলাম গলায় আপনার নির্ঘাৎ ক্যানসার হয়েছে। তার মানে, আমি ধরেই নিয়েছিলাম, আপনার গলার প্রায় সবটা কেটে ফেলে দিতে হবে। তাতে আপনি মারাও যেতে পারতেন। আপনার মৃত্যু অবধারিত; এই কথাটা কিভাবে বলব তাই নিয়ে দুশ্চিন্তা করছিলাম আমি। তাই শুধু আঁচিল শব্দটা উচ্চারণ করার সময় সত্যি ভাষণ আনন্দ হয়েছিল আমার। আনন্দটা শুধু একজন ডাক্তার। হিসেবে নয়, আপনার একজন ভক্ত হিসেবেও উপভোগ করেছিলাম। অকুণ্ঠচিত্তে। স্বীকার করছি, আপনার গান শুনে এক সময় সাঙ্ঘাতিক আনন্দ পেয়েছি। ছাত্র জীবনে তো আপনার গানের জোরেই কত মেয়ে পটিয়েছি। সন্দেহ নেই, আপনি খাঁটি শিল্পী। কিন্তু সেই সাথে একথাও ঠিক যে লাই দিয়ে আপনার মাথাটাও খাওয়া হয়েছে। কি মনে করেন, আপনি জনি ফন্টেন বলে আপনার ক্যানসার হতে পারে না? অথবা আপনার ব্রেনে এমন টিউমার হতে পারে না অপারেশন করে যা বের করে আনার উপায় নেই? হঠাৎ আপনার হাট বন্ধ হয়ে যেতে পারে না? নিজেকে আপনি অমর বলে ধরে নিয়েছেন নাকি? জীবনের সবটাই মধুর সঙ্গীত, এ কথা আপনাকে কে বলেছে? দুঃখ-কষ্ট কাকে বলে তা যদি দেখতে চান, এই হাসপাতালটার ভেতর দিয়ে একবার হেঁটে যান–আঁচিল হয়েছে বলে নিজেকে আপনার মহা-ভাগ্যবান বলে মনে হবে। আঁচিল আপনি কত ভালবাসেন তা রসের গান গেয়ে প্রকাশ করার জন্যে আশ্চর্য একটা অস্থিরতা অনুভব করবেন আপনি। তাই বলছি, ওসব ন্যাকামি বাদ দিয়ে এবার একটু মাটিতে পা রাখতে চেষ্টা করুন। অ্যাডলফ মেনজুর মত দেখতে আপনার ওই ডাক্তারটি যত ভাল সার্জেনই হোক, সে যদি ভুল করেও অপারেশন রুমে ঢোকার চেষ্টা করে, আমার পরামর্শ, ব্যাটাকে ধরে খুনের অভিযোগে পুলিশের হাতে তুলে দিন।
