লোক দুজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল লুসি। সাথে সাথে একজনকে চিনতে পারল জুলস। লোকটা হলো সেই বিখ্যাত গাইয়ে, ইদানীং যে অভিনয় করে খুব নাম করেছে। জনি ফন্টেন। তার সাথের লোকটা প্রকাণ্ডদেহী, ভোতা চেহারার একজন ইতালীয়। নাম নিনো ভ্যালেন্টি। পরিচয় করিয়ে দেবার সময় ওরা দুজনেই জুলসের করমর্দন করল, কিন্তু পরমুহূর্ত থেকে ওরা আর তার দিকে ফিরেও তাকাল না। লুসির সাথে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করছে ওরা। নিউ ইয়র্কে ফেলে আসা পুরানো দিনের গল্প করছে। অজানা-অচেনা ঘটনা আর লোকজন সম্পর্কে কথা বলছে, যার সাথে কোন সম্পর্ক নেই জুলসের।
পরে আসব আমি, লুসিকে বলল জুলস। ডাক্তার কেলনারের সাথে দেখা করার কাজটা সেরে ফেলি আগে।
এতক্ষণে ওর দিকে নজর দিল জনি ফন্টেন। তার আচরণে মাধুর্য ফুটে উঠল এই যে, ভাই, একটু থামুন। পালাবার সময় হয়ে গেছে আমাদের, আপনিই এখন সঙ্গ দেবেন লুসিকে। একটা কথা, বড় আদরের আর পুরানো সাথী ও আমাদের, ওর যত্ন নিতে যেন ভুল করবেন না, ডাক্তার।
জনি ফন্টেনের কণ্ঠস্বরটা কেমন যেন কর্কশ, কানে বাজল জলসের। গলা ভেঙে গেলে যেমন হয়, অনেকটা সেই রকম। পরমুহূর্তে মনে পড়ে গেল, প্রকাশ্যে এক বছরের উপর গান গায়নি লোকটা। এই বয়সে তবে কি গলা ভেঙেছে লোকটার? কিন্তু তা যদি হয়, খবরের কাগজে ব্যাপারটা নিয়ে লেখালেখি হয়নি কেন? তারা চেপে গেছে? সবাই চেপে গেছে? মনটা খুঁতখত করছে জুলসের। ওর মধ্যে কৌতূহলী একটা স্বভাব আছে, কোথাও কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখলেই কারণ অনুসন্ধানের জন্যে হন্যে হয়ে ওঠে। কান পেতে আছে ও, জনির গলার আওয়াজ গভীর মনোযোগের সাথে শুনছে। আশা, ত্রুটিটা যদি ধরতে পারে। মনে পড়ছে, গান গেয়ে নয়, অভিনয় করে অস্কার পেয়েছে লোকটা! অথচ গানের জন্যে পুরস্কারটা পেলে বেশি মানাত। অতিরিক্ত পরিশ্রমের দরুন গলার এই অবস্থা হতে পারে, ভাবছে জুলস। অথবা প্রচুর ধূমপান আর ধুমসে মদ গিললে এমন করুণ অবস্থা হওয়া বিচিত্র নয়। আবার মেয়েমানুষের শরীর নিয়ে খুব বেশি ঘাটাঘাটিও এর কারণ হতে পারে। গলাটা বসে গেছে, কেমন যেন বিশ্রী একটা কণ্ঠস্বর–আর যাই হোক, লোকটাকে এখন আর কেউ মধুর গাইয়ে বলবে না।
কিছু যদি মনে না করেন, মদু কণ্ঠেবলল জুলস, আপনার কি সর্দি লেগেছে?
ভদ্রতার সাথেই জবাব দিল ফন্টেন, সর্দি? আরে না। স্রেফ অতিরিক্ত খাটাখাটনির ফল, কাল রাতে গাইবার চেষ্টা করেছিলাম কিনা। কি জানেন, গলাটা যে আমার বদলে গেছে তা আমি কোনমতে মেনে নিতে পারছি না। বুড়ো হচ্ছি, গলা তো বদলাবেই। কিছুতেই কিছু এসে যায় না, এই রকম একটা ভঙ্গি করে নিঃশব্দে হাসল জনি।
ডাক্তার দেখিয়েছেন? হালকা সুরে জানতে চাইল জলস। আপনি যা ভাবছেন হয়তো নয়, হয়তো সামান্য একটু অসুখ, সারানো যায়।
জুলসের সাথে এবার আর মিষ্টি ব্যবহার করল না জুনি ফন্টেন। ঠাণ্ডা চোখে কয়েক সেকেণ্ড তাকিয়ে থেকে বলল সে, গলাটা যখন ভাঙে, আজ থেকে দুবছর আগে, সবচেয়ে আগে তাই করেছিলাম, কয়েকজন ডাক্তারকেই দেখিয়েছিলাম। তারা সবাই দেশের সেরা ডাক্তার, হাতুড়ে নয়। আমার ব্যক্তিগত ডাক্তারকেও তো সবাই শ্রেষ্ঠ একজন বিশেষজ্ঞ বলে মনে করে। তারা সবাই একবাক্যে জানিয়েছে, বিশ্রাম নিতে হবে। এর জন্যে বয়স দায়ী। বয়স হলে মানুষের কণ্ঠস্বর তো বদলাবেই।
কথা শেষ করে মুখ ফিরিয়ে নিল জনি, দ্বিতীয়বার আর ফিরেও তাকাল না জুলসের দিকে। লুসির দিকে তাকিয়ে ঠাট্টা মস্করায় মেতে উঠল সে, সব মেয়ের সাথেই যেমন করে। অনর্গল কথা বলছে, আর তার কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে নছে জুলস। ভাবছে লোকটার স্বরতন্ত্রীতে নিশ্চয়ই কিছু একটা গজিয়েছে, তা না হয়েই যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিশেষজ্ঞরা সেটা ধরতে পারেনি কেন? একটা আশঙ্কা দেখা দিল জুলসের মনে–যা গজিয়েছে সেটা কি তবে ম্যালিগন্যান্ট? অপারেশনের বাইরে? তা যদি হয়ও, তারও তো আরেক ধরনের চিকিৎসা আছে।
লুসির সাথে কথা বলতে মগ্ন হয়ে আছে জনি ফন্টেন, তাকে বাধা দিয়ে বলল জুলস, আপনার গলা শেষবার কবে পরীক্ষা করিয়েছেন?
চেহারা দেখেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, জুলসের উপর মহা বিরক্ত হয়েছে জনি। কিন্তু লুসির বন্ধু জুলস, তাই ভদ্রতা বজায় না রেখেও পারছে না। ঠাণ্ডা গলায় বলল, মাস আঠারো আগে।
আপনার ব্যক্তিগত ডাক্তারকে দিয়ে মাঝে মধ্যে পরীক্ষা করান না? জানতে চাইল জুলস। সহজে ছেড়ে দেবার পাত্র নয় সে।
এবার কণ্ঠস্বরে অসন্তোষ প্রকাশ পেল জনি ফন্টেনের। একটু ব্যঙ্গের সুরে বলল সে, করাই বৈকি। প্রত্যেকবার কোডিন স্প্রে লাগিয়ে ভাগিয়ে দেন। কোন প্রশ্ন করলে বলেন, আগেই তো জানিয়েছি, স্বরযুটার বয়স বাড়ছে। তাছাড়া, অতিরিক্ত মদ, সিগারেট এসব তো আছেই। জুলসের দিকে তীব্র দৃষ্টি হানল জনি। আপনি বোধহয় আরও ভাল একজন ডাক্তার, তারচেয়েও বেশি বোঝেন?
তার নামটা জানতে পারি? খোঁচাটা গায়ে না মেখে প্রশ্ন করল জুলস।
টাকার, গর্বের সুরে বলল জনি, ড. জেমস টাকার। তাঁর সম্পর্কে কি ধারণা আপনার?
টাকার নামটা পরিচিত জুলসের। যতসব নামকরা ফিল্ম স্টারদের চিকিৎসা করে, তাছাড়া বিখ্যাত একটা স্যানাটোরিয়ামের সাথে জড়িত। এক গাল হাসল জুলস, বলল, খুব সাজগোজ করেন ভদ্রলোক।
