এই সাক্ষাৎকারের কদিন পরই হোটেলের আবাসিক চিকিৎসকের পদে বহাল হয়ে এল ড. জুলস সীগল। রোগা, খুব সুদর্শন, মার্জিত চালচলন, ডাক্তার হবার পক্ষে বয়সটা যেন খুবই কম, অন্তত লুসির সেই রকম মনে হলো! ওর সাথে প্রথম দেখা হলো একটা ঠেকায় পড়ে। লুসির হাতের কব্ধির উপরে কি যেন একটা গোল হয়ে ফুলে উঠেছে। কয়েকটা দিন তাই নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে কাটাবার পর, একদিন সকালে হোটেলের ভিতর ডাক্তারের অফিসে এসে হাজির হলো লুসি। কোরাসের দুজন নাচিয়ে গাইয়ে মেয়েও অপেক্ষা করছে ওয়েটিং রূমে। নিজেদের মধ্যে গল্প করছে তারা। সোনালি চুল, পীপ ফলের মত রূপ তাদের। এরকম চেহারা দেখলে ঈর্ষা হয় লুসির। দেখতে যেন দেবীদের মত সুন্দরী। লুসি নল একজন আরেকজনকে বলছে, সত্যি বলছি, আরেক ডোজ যদি দেয় আমাকে, আমি নাচা ছেড়ে দেব।
দরজা খুলে একজন মেয়েকে ড. জুলস যখন ডেকে নিলেন, লুসির ইচ্ছা হলো চলে যায়। ড, সীগলের পরনে স্ন্যাকস আর বুক খোলা শার্ট রয়েছে। চোখে শিং এর তৈরি ফ্রেমের চশমা। তাতে শান্ত গভীর একটা ভাব ফুটে উঠেছে চেহারায়। তবু দেখে মনে হচ্ছে; মানুষটার হাবভাবে কেমন যেন একটা ঘরোয়া ভঙ্গি, লুসি মনে-প্রাণে সেকেলে, তাই ওরও বিশ্বাস, চিকিৎসকদের ভাব-ভঙ্গিতে ঘরোয়া ভাব থাকতে নেই।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন ডাক্তারের খাস কামরায় পৌঁছল, লোকটার ব্যবহারের মধ্যে এমন একটা আশ্বাস টের পেল যে ভয়ভীতিগুলো সাথে সাথে দূর হয়ে গেল মন থেকে। এখনও প্রায় কিছুই বলেনি ডাক্তার, অবশ্য আচরণের মধ্যে রূঢ় ভাবও নেই। বেশ সময় নিয়ে ওকে দেখছে। লুসি জানতে চাইল, ফোলাটা কি ব্যাপার? ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে বলল ডাক্তার, ওটা খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার। কোষ ফুলে গেছে। এতে ক্যান্সারের কোন ভয়ই নেই, সুতরাং দুশ্চিন্তা করবেন না। তারপর মোটা একটা ডাক্তারী বই হাতে তুলে বলল, হাতটা একটু বাড়ান তো দেখি।
ভয়ে ভয়ে হাতটা বাড়াল লুসি। ওর দিকে তাকিয়ে এই প্রথম একটু হাসল ডাক্তার। একটা অপারেশনের ফী থেকে নিজেকে বঞ্চিত করছি। এই বই দিয়ে একটা বাড়ি দিলেই ওটা চ্যাপ্টা হয়ে চামড়ার সাথে সমান হয়ে যাবে। পরে আবার গজাতে পারে, তা ঠিক। কিন্তু কাটাকুটি করতে গেলে, আপনার টাকাও খরচ হবে, আবার ব্যাণ্ডেজ বেঁধেও ঘুরে বেড়াতে হবে। কি করবেন, বলুন?
এখন ওর দিকে ফিরে লুসিও হাসছে। যে কারণেই হোক, প্রবল বিশ্বাস জন্মে গেছে তার ডাক্তারের উপর। বলল, বেশ।
পর মুহূর্তেই চিৎকার করে উঠল লুসি। কারণ ডাক্তার সেই ভারী বইটা দিয়ে দুম করে ওর হাতে এক ঘা বসিয়ে দিয়েছে। ফলে সাথে সাথে ফোলা জায়গাটা প্রায় সমান হয়ে গেছে।
খুব লাগল নাকি? নিরীহ ভঙ্গিতে জানতে চাইল ডাক্তার।
না, মুখ ভার করে বলল লুসি।
ডাক্তার ওর কেসের হিস্ট্রি লিখছে, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে লুসি। ব্যস হয়ে গেল?
ডাক্তার মাথা দুলিয়ে জানাল, হা হয়ে গেল। ওর দিকে আর নজর দিল না সে। বিদায় নিয়ে চলে এল লুসি।
এক হপ্তা পর কফির দোকানে আবার দেখা। ডাক্তার এসে লুসির পাশে বসে জানতে চাইল, হাত কেমন আছে?
ভাল, একটু হেসে বলল লুসি। আপনার পদ্ধতিটা বিচিত্র বটে, কিন্তু কাজ দেয়।
একগাল হাল ডাক্তার। আপনি ভাবতেও পারবেন না আমি কতটুকু নিজের নিয়মে চলি। আর আমিও জানতাম না আপনি এত ধনী মানুষ। ভেগাসের সান পত্রিকাতে হোটেলের মালিকানার ফর্দ বেরিয়েছে, তাতে দেখছি দশ পয়েন্ট রয়েছে। আপনার। ওই ফোলাটাকে পুঁজি করে বেশ দুপয়সা করে নিতে পারতাম।
হঠাৎ হেগেনের সতর্কবাণীটা মনে পড়ে গেল লসির। কোন উত্তর দিল না ও। আবার দাঁত বের করে হাসল ডাক্তার। কোন চিন্তা নেই, অভয় দিয়ে বলল সে, আমি ব্যাপারটা বুঝি, আপনি যে একটা পুতুল। এই ধরনের পুতুলের কোন অভাব নেই, লাস ভেগাসে। যাবেন নাকি আমার সাথে আজ রাতে একটা শো দেখতে? ডিনার খাওয়াব আপনাকে। তারপর ক্যাসিনোতে রুলেত খেলার চিপসও কিনে দেব।
ইতস্তত করছে লুসি। কিন্তু ডাক্তার জেদাজেদি করতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত লুসি বলল, যেতে তো আপত্তি নেই। কিন্তু রাতটা যে ভাবে শেষ হবে তা দেখে শেষে না আপনি হতাশ হন। আমি এখানকার আর সব মেয়ের মত যা তা করে বেড়াই না।
সেই জন্যেই তো সাথে চাইছি তোমাকে, আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠে বলল ডাক্তার। সম্বোধনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ আপনজনের সুর ফুটে উঠল। আমি নিজের জন্যেও একরাত বিশ্রামের প্রেসক্রিপশন লিখে রেখেছি কিনা।
ওর দিকে তাকিয়ে হাসল লুসি। একটু অসহায় ভঙ্গি করে বলল, আমি কি অতটা চোখেপড়ার মত?
মাথা ঝাঁকাল ডাক্তার।
লুসি বলল, বেশ। তাহলে সাপার খেতে যাব। কিন্তু রুলেতের চিপস আমি নিজেই কিনব।
সাপার খেতে আর শো দেখতে গেল ওরা। জুলস ওকে খুব এক চোট হাসাল ডাক্তারী পরিভাষায় মহিলাদের নগ্ন উরু আর বুকের বর্ণনা দিয়ে। তাই বলে তাচ্ছিল্যের সাথে কিছু বলেনি, রসিকতার সাথেই বলল। পরে ওরা রুলেত খেলে একশো ডলারের কিছু বেশি জিতল। আরও পরে চাঁদের আলোয় গাড়ি নিয়ে বোর বাধে বেড়াতে এল। এখানে ডাক্তার একটু প্রেম করার চেষ্টা চালাল বটে, কিন্তু দুটো একটা চুমো খাওয়ার পর লুঙ্গি আপত্তি জানাতেই ক্ষান্ত হলো সে, বলল, আসলে এসব সে-ও চায় না। পরাজয়টা হাসি মুখেই মেনে নিল। মুখের ভাব অপরাধীর মত করে লুসি বলল, বলেই তো ছিলাম, ওসব আমার সাথে চলবে না।
