কি জানো, প্রত্যেক মানুষকে জীবনে একবার অন্তত নির্বোধের মত কাজ করতে দেয়া উচিত সেই রকম একটা কাজ আমিও করছি। আমি চাই আমাদের উঠানের চারদিকে যত জমি আছে তার সবটা কিনে ফেলা হোক, সমস্ত বাড়ি কিনে ফেলা হোক। কেউ তার জানালা দিয়ে মুখ বাড়ালে আমার বাগান দেখতে পাবে, এ আমি চাই না। এক মাইল দূর থেকেও তা যেন কেউ দেখতে না পায়। আমি উঠানের চারধারে পাচিল চাই, রাতদিন চব্বিশ ঘন্টার জন্যে সতর্ক পাহারা চাই! পাচিলে একটা ফটক চাই। এক কথায়, একটা দুর্গের মত দুর্ভেদ্য জায়গায় বাস করতে চাইছি আমি তোমাদের জানিয়ে রাখছি, কাজ করতে আর কখনও শহরে যাব না। ধরে নাও, আধা-অবসর নিয়েছি। বাগানে কাজ করার ইচ্ছা হয়েছে। আমার নিজের বাড়িতে থাকব যদি কখনও বের হই, শুধু কোথাও ছুটি কাটাতে বের হব। অথবা বিশেষ কোন জরুরী কাজ পড়লে যদি বের হতে বাধ্য হই। তখন আমি আশা করব সব রকম সতর্কতা যেন অবলম্বন করা হয়। দেখো, আমাকে তোমরা কেউ ভুল বুঝো না। ভেবো না আমি কিছু পাকিয়ে তুলছি। আমি শুধু খানিকটা বিচক্ষণ হতে চাইছি। অবশ্য চিরকালই আমি তাই। বেঁচে থাকার মধ্যে অসাবধানতার মত আর কোন জিনিসে আমার অরুচি নেই। মেয়েমানুষ আর শিশুদের অসাবধান হওয়া সাজে, পুরুষদের সাজে না। ধীরে-সুস্থে সমস্ত ব্যবস্থা করো, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আমাদের বন্ধুদের যেন আবার শঙ্কিত করে তুলে না। এমন ভাবে ধীরে-সুস্থে করো, যাতে কারও চোখে কিছুই অস্বাভাবিক না ঠেকে।
এখন থেকে ক্রমশ তোমাদের তিনজনের হাতে বেশি করে কাজের ভার দেব আমি। সান্তিনোর দলটা ভেঙে ওই দলের লোকদের তোমরা নিজেদের দলে নিয়ে নাও। এই আমার ইচ্ছা। এটা লক্ষ করে আমাদের বন্ধুদের আশ্বস্ত হওয়া উচিত, বোঝা উচিত আমি সত্যি সত্যিই শান্তি চাই। টম, আমি চাই তুমি একদল লোককে লাস ভেগাসে পাঠাও। সেখানে সত্যি কি হচ্ছে না হচ্ছে সে-ব্যাপারে একটা পূর্ণচিত্র দেবে তুমি আমাকে। ব্যাপারটা জানতে চাই আমি। আসলে ওখানে কি হচ্ছে জানাবে আমাকে। আমি নাকি নিজের ছেলেকে চিনতেই পারব না। ও নাকি এখন ভাল রাঁধতে পারে, অল্পবয়সী মেয়েদের নিয়ে নাকি ফুর্তি করতে পারে। কি আশ্চর্য, এসব করার বয়স তো কবেই শেষ হয়ে গেছে ওর। অথচ ছোট বেলায় ও বড় বেশি গভীর ছিল, তাছাড়া কোন দিনই আমাদের পারিবারিক ব্যবসাতে ওকে মানায় না। সে যাই হোক, এবার ওখানে কি হচ্ছে না হচ্ছে সেটা জানা দরকার আমার।
ধীর শান্ত গলায় বলল হেগেন, আপনার জামাইকে পাঠাই? ও তো নেভাডারই ছেলে, ও-দিককার হালচাল সব জানে সে।
মাথা নেড়ে বললেন ডন কর্লিয়নি, না। ছেলে-মেয়েরা কেউ কাছে না থাকলে আমার স্ত্রীর বড় একা লাগে। আমি চাই কনি আর তার স্বামীকে উঠানের একটা বাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে আসা হোক। একটা দায়িত্বপূর্ণ কাজ দেয়া হোক কার্লোকে। ওর সাথে হয়তো বড় কর্কশ ব্যবহার করা হয়ে গেছে। তাছাড়া, মুখ বিকৃত করে বললেন ডন কর্লিয়নি, আমার ছেলের অভাব। ওকে জুয়ার ব্যবসা থেকে সরিয়ে এনে ইউনিয়নের কাজে লাগাঁও। কিছু খাতাপত্র দেখতে পারবে, প্রচুর কথাও বলতে পারবে। বেশ সুন্দর কথা বলে। সামান্য একটু তাচ্ছিল্যের সুর শোনা গেল ডনের গলায়।
মাথা দুলিয়ে তাকে সমর্থন করে হেগেন বলল, বেশ। ক্লেমেঞ্জা আর আমি আমাদের সমস্ত লোককে যাচাই করে ভেগাসে পাঠাবার জন্যে কয়েকজনকে নির্বাচন করব। যদি বলেন, কয়েকদিনের জন্য ফ্রেডিকে আনিয়ে নিতে পারি।
মাথা নাড়ালেন ডন। বললেন, কিসের জন্যে? কেন? আমার স্ত্রীই তো আমাদের রান্না করতে পারেন। ও ওখানেই থাকুক।
অস্বস্তির সাথে চেয়ারে নড়েচড়ে উঠল ওরা তিনজনই। এতদিন টের পায়নি ওরা যে ফ্রেডির বাবা ছেলের উপর এতটা অসন্তুষ্ট হয়ে আছেন। ওদের এখন সন্দেহ হচ্ছে, এর পিছনে নিশ্চয়ই এমন কিছু কারণ আছে যা ওদের কারও জানা নেই।
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ডন কর্লিয়নি বললেন, আশা করছি, এই বছর বাগানে কিছু ভাল মিষ্টি লঙ্কা আর টম্যাটো কলাব। আমাদের খেতে যত লাগবে তার চেয়েও বেশি। সেগুলো তোমাদেরকে উপহার দেব। এই বুড়ো বয়সে এবার আমি একটু শান্তি চাই। একটু নির্জনতা চাই। একটু মনের সুখ চাই। ব্যস, এইটুকই তোমাদেরকে বলতে চেয়েছি। ইচ্ছা হয় তো আরেক গ্লাস পানীয় নাও না তোমরা সবাই। ইঙ্গিতে ওদেরকে বিদায় জানাচ্ছেন।
উঠে পড়ল ওরা তিনজন। ক্লেমেঞ্জা আর টেসিওকে তাদের গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে, তাদের সাথে আরও বারকতক আলোচনায় বসার কথা স্থির করে এল হেগেন। ডনের নির্দেশ পালন করতে হলে অনেক খুঁটিনাটি কার্যকর ব্যবস্থা সম্পন্ন করতে হবে ওদেরকে। আবার বাড়ির ভিতর ফিরে এল হেগেন। ডন কর্লিয়নি ওর জন্যে অপেক্ষা করে আছেন, জানে ও।
কোট আর টাই খুলে সোফার উপর শুয়ে পড়েছেন ডন। তাঁর কঠিন চেহারায় ক্লান্তির ছাপ ফুটে এখন আরও নরম দেখাচ্ছে। একটা চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করে ডন বললেন, এবার বলো তো, কনসিলিয়রি, আমার আজকের কথাবার্তার কোনটাতে কি তোমার আপত্তি আছে?
মুখ খুলতে একটু সময় লি হেগেন। তারপর বলল, তা নেই। কিন্তু গোটা ব্যাপারটার মধ্যে সামঞ্জস্যের অভাব দেখতে পাচ্ছি আমি। আপনার সাথে ঠিক যেন মিলছে না। আপনি বলছেন, সান্তিনোকে কিভাবে হত্যা করা হয়েছে তা আপনি জানতে চান না, প্রতিশোধ নিতে চান না। এ আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। কিন্তু এও জানি, আপনি কথা দিয়েছেন শান্তি রক্ষা করবেন, সুতরাং নিশ্চয়ই শান্তি রক্ষা করবেন। তবু আমার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না যে আজ আপাতদৃষ্টিতে যেটাকে আপনার শত্রুদের জয়লাভ বলে মনে হচ্ছে, সেটা আপনি সত্যি সত্যি তাদের। দিচ্ছেন। আমার জন্যে আপনি একটা অপূর্ব হেয়ালির সৃষ্টি করেছেন, আমি তার কোন উত্তরই খুঁজে পাচ্ছি না। তাই বুঝতেই পারছি না আপনাকে আমি সমর্থন করব, নাকি আপত্তি জানাব।
