আর আমাদের কীর্তিকলাপের কথা যদি বলেন, ওই সব নব্বই ক্যালিবারের হোমরাচোমরাদের কাছে মোটেও আমরা দায়ী নই। তারা মনে করে, আমাদের জীবন নিয়ে আমরা কি করব না করব তা ওরা আমাদেরকে সমঝে দেবে। তারা লড়াই বাধিয়ে দিয়ে ভাবে, তাদের সম্পত্তি রক্ষা করার জন্যে আমরা বুঝি লড়াই করব। কে বলেছে যে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা আর আমাদের ক্ষতি করার জন্যে ওরা যে সব আইন তৈরি করেছে, আমাদেরও সে সব মানতে হবে? কক্ষনো না। আমরা আমাদের ব্যবস্থা নিজেরা করলে, তাতে ওদের কি? তারা নাক গলাতে আসে কোন অধিকারে? এ-সব আমাদের ব্যাপার, আমরা বুঝব। আমাদের জগৎটা আমাদের, এই জগৎটাকে আমরাই সামলাব। তাই বাইরে থেকে যারা অনধিকার প্রবেশ করে, তাদের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের সকলকে একজোট হয়ে দাঁড়াতে হবে। তা না হলে আমাদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাবে ওরা, যে-ভাবে নেপলস আর ইতালির লক্ষ লক্ষ লোকের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে।
এই সব কারণেই আমি আমার ছেলের খুনের প্রতিশোধ নিতে চাই না। প্রতিশোধের দাবি ছেড়ে দিচ্ছি, সবার স্বার্থে, সবার কল্যাণের জন্যে। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমার পরিবারের আচরণের জন্যে যতদিন দায়ী থাকব আমি, ততদিন ন্যায্য কারণ কিংবা গুরুতর প্ররোচনা ছাড়া উপস্থিত কারও বিপক্ষে আমাদের কেউ একটি আঙুল তুলবে না। সবার স্বার্থে আমর বৈষয়িক স্বার্থ পর্যন্ত আমি ছেড়ে দিতে রাজী। আমার কথা রইল, ধর্ম সাক্ষী রইল। এখানে যারা উপস্থিত রয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকেই জানেন, আমি কখনও কথার বা ধর্মের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করি না।
তবে আমার একটা স্বার্থপর উদ্দেশ্যও আছে বৈকি। আমার ছোট ছেলেটাকে এখান থেকে পালাতে হয়েছে, কারণ সলোযো আর একজন পুলিশ ক্যাপটেনকে খুন করার জন্যে তাকে দায়ী করা হচ্ছিল। এখন যাতে তার ওপর থেকে ওই সব মিথ্যে অভিযোগ তুলে নেয়া হয় আর সে যাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসতে পারে, তার ব্যবস্থা আমাকে করতে হবে। হয় আল অপরাধীকে ধরে দিতে হবে, নয়তো আমার ছেলের নির্দোষিতা সম্পর্কে সরকারকে নিচ্ছিদ্র প্রমাণ দিয়ে আশ্বস্ত করতে হবে। অথবা সাক্ষী আর ইনফর্মাররা যাতে তাদের মিথ্যে কথা ফিরিয়ে নেয় তার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু, আবার বলি, এগুলো আমার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে, আমার বিশ্বাস, আমার ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে পারব আমি।
তবু একটি কথা বাকি থেকে যায়। সেটা না বললেই নয়। কুসংস্কারে বিশ্বাস করি আমি, জানি ওটা একটা হাস্যকর দুর্বলতা, তবু কথাটা স্বীকার করতে হচ্ছে। যদি আমার ছেলের কোন আকস্মিক, অশুভ দুর্ঘটনা ঘটে, যদি কোন পুলিশ অফিসারের পিস্তল থেকে আচমকা গুলি ছুটে ওর গায়ে লাগে, যদি নিজের সেলে নিজের গলায় দড়ি দেয় ও, যদি নতুন সাক্ষী ওর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবার জন্যে দেখা। দেয়, স্রেফ কুসংস্কারের বশে মনে হবে আমার, এখানকার কারও কারও মনে আমার ওপর বিদ্বেষ রয়ে গেছে বলেই অমনটি হলো। আরেকটু বলি। আমার ছেলের মাথায় যদি বাজ পড়ে, তা হলেও হয়তো এখানকার কাউকে কাউকে দায়ী করব আমি। যদি ওর প্লেন সমুদ্রে পড়ে, ওর জাহাজ যদি ঢেউয়ের নিচে তলিয়ে যায়, ওর যদি কোন মারাত্মক জ্বর হয়, ওর গাড়ি যদি ট্রেনের সাথে ধাক্কা খায়-এমনি আমার কুসংস্কার যে আমি মনে করব এখানকার কারও না কারও, অশুভ ইচ্ছার জন্যেই অমন হয়েছে। ভদ্রমহোদয়গণ, সেই অশুভ ইচ্ছাকে, সেই দুর্ভাগ্যকে কখনও ক্ষমা করতে পারব না আমি। শুধু এইটা বাদ দিলে, আমার নাতি-নাতনিদের। আত্মার দিব্যি, আজ যে শান্তি স্থাপন করলাম এ-শান্তি আমি কখনও ভাঙব না। যে যাই বলুক, ওই সব হোমরাচোমরা যারা আমাদের জীবনকালেই অগুণতি কোটি লোকের মৃত্যু ঘটিয়েছে, তাদের চেয়ে আমারা ভাল, না কি ভাল না?
কথা শেষ করে তার জায়গা থেকে উঠে টেবিলের ধারে যেখানে ডন ফিলিপ টাটাগ্লিয়া বসে রয়েছেন সেখানে এলেন ডন কর্লিয়নি। উঠে দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন করলেন টাটাগ্লিয়া। তারা পরস্পরকে আলিঙ্গন করে পরস্পরের গালে চুমো খেলেন। ঘরে অন্য ৬ন যারা উপস্থিত রয়েছেন তারা জয়ধ্বনি দিচ্ছেন, উঠে পড়ে সামনে যাকে পাচ্ছেন তার সাথেই হণ্ডশেক করছেন এবং ডন কর্লিয়নিকে আর ডন টাটাগ্লিয়াকে তাদের নতুন বন্ধুত্বের জন্যে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। দুনিয়াতে হয়তো এর চেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব আরও আছে, তারা হয়তো বড় দিনের সময়। পরস্পরকে শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে উপহার পাঠাবেন না, তবে পরস্পরকে খুনও করবেন না। এদের দুনিয়াতে এইটুকুকেই যথেষ্ট বন্ধুত্ব বলা যায়, এর বেশি কিছুর দরকার পড়ে না।
ডন কর্লিয়নির ছেলে ফ্রেডি পশ্চিমাঞ্চলে মলিনারি পরিবারের হেফাজতে আছে, সুতরাং সভা ভেঙে যাবার পর ডন কর্লিয়নি স্যান ফ্রান্সিস্কোর ডনকে ধন্যবাদ। জানাবার জন্যে একটু অপেক্ষা করলেন। মলিনারি ভাঁকে যতটুকু বললেন, তা থেকে ডন কর্লিয়নি বুঝলেন যে ফ্রেডি সেখানে তার উপযুক্ত কাজই খুঁজে পেয়েছে। সুখেই আছে সে, মহিলাদের সাথে তার নাকি খুব ভাব। মনে হলো হোটেল পরিচালনার ব্যাপারে তার জন্মগত প্রতিভা আছে। বিস্মিত হয়ে মাথা নাড়লেন ডন কর্লিয়নি। নিজের ছেলের মধ্যে অগত্যাশিত গুণ আছে শুনলে অনেক বাপই এভাবে মাথা নাড়েন। গউ ফাদার ৩
