রফা হয়ে গেল শেষ পর্যন্ত। ড্রাগের ব্যবসা চলবে। পূর্বাঞ্চলে ওদেরকে কিছু আইনের আশ্রয় দেবেন ডন কর্লিয়নি। স্থির হলো, বার্জিনি আর টাটাগ্রিয়া পরিবার ব্যবসার বেশির ভাগটা হাতে রাখবে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত একটা সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। তারপর অন্যান্য আরও ব্যাপক সুবিধে সম্পর্কে আলোচনা আরম্ভ হলো। কিছু জটিল সমস্যার সমাধান করা দরকার। স্থির হলো, লাস ভেগাস আর মিয়ামি হবে মুক্ত শহর, সেখানে যে কোন ব্যবসা চলতে পারবে সকলেই সায় দিয়ে বললেন, জায়গা দুটোর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। আরও স্থির হলো শহর দুটোয় কোন হিংসাত্মক ক্রিয়াকলাপ চলবে না বা কোন ছোটখাট দুষ্কৃতকারীদের ওখানে যেতে উৎসাহিত করা হবে না সেই সাথে সিদ্ধান্ত নেয়া হলে যে কোন গুরুপূর্ণ বড় ব্যাপারে, যাতে জনসাধারণের প্রবল আপত্তি রয়েছে বা থাকবে, কিছু করার আগে এই সভার অনুমোদন পাওয়া চাই। সকলে একমত হলেন যে সবার সমস্ত সশস্ত্র কর্মী আর সৈনিকরা কোন ব্যক্তিগত কারণে পরস্পরের উপর কোন হিংসাত্মক ব্যবস্থা কিংবা প্রতিশোধ কখনও নেবে না কোন মাফিয়া পরিবার অনুরোধ করলে অন্য পরিবারগুলো তাকে সাহায্য দেবে। যেমন ঘাতকের ব্যবস্থা করার কোন বিশেষ দায় থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে জুরিকে ঘুষ দেয়া ইত্যাদি ব্যাপারে পেশাদারি সহযোগিতা করবে। কোন কোন সময় তো এ ধরনের সাহায্যের উপর মানুষের প্রাণ পর্যন্ত নির্ভর করে। এই রকম আরও অনেক বিষয়ে আলোচনা হলো বন্ধুতুপর্ণ পরিবেশে, অতি উঁচু পর্যায়ের সৎ উদ্দেশ্যে অনুপ্রাণিত হয়ে। এতে সময়ও লাগল যথেষ্ট। মাঝখানে লাঞ্চ আর বুফে বার থেকে পানীয় গ্রহণের জন্যে বিরতি।
অবশেষে আলোচনা সভার সমাপ্তি ঘটাবার চেষ্টা করে ডন বার্জিনি বললেন, এই তো সমস্ত বিরোধ মিটে গেল। শান্তি কায়েম হয়েছে, এবার আমার শ্রদ্ধা জানাই ডন কর্লিয়নিকে। আমি অনেক বছর ধরে চিনি তাকে। কথা দিলে তিনি কথা রাখেন। এর পর যদি আবার কোন মতভেদ হয় তাহলে আমরা আবার মিলিত হতে পারি, আরও মৃঢ়তার পরিচয় দেবার কোন প্রয়োজন নেই। মীমাংসা হয়ে গেল, এর চেয়ে খুশির ব্যাপার আমার জন্যে আর কিছু হতে পারে না।
একমাত্র ফিলিপ টাটাগ্লিয়ার মনে এখনও দুশ্চিন্তা। আবার যদি লড়াই বাধে, তাহলে সান্তিনো কর্লিয়নিকে হত্যা করার জন্যে তার অবস্থাটা কাহিল হবে সবচেয়ে বেশি। শেষ পর্যন্ত এই প্রথম মুখ খুললেন তিনি।
আমি সব কিছুতে রাজী আছি। আমি নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভুলে যেতে রাজী আছি। কিন্তু ডন কর্লিয়নির কাছ থেকে আশ্বাস পেতে চাই আমি। তিনি কি ব্যক্তিগতভাবে কখনও প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করবেন? আরও কিছু সময় গেলে, তাঁর অবস্থা হয়তো তখন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, তখন কি তিনি ভুলে যাবেন যে আমরা বন্ধুত্বের শপথ নিয়েছি? কি করে বুঝব যে আরও তিন চার বছর পর তার মনে হবে না ওঁর সাথে অন্যায় ব্যবহার করা হয়েছে, জোর করে ওকে দিয়ে এই চুক্তি সই করানো হয়েছে, অতএব এসব শর্ত ভাঙার অধিকার আছে তার। আমাদেরকে কি চিরকাল পরস্পর সম্পর্কে সতর্ক হয়ে চলতে হবে? নাকি সত্যি সত্যি স্বস্তি এবং শান্তি নিয়ে এখান থেকে যেতে পারব? আমি আমার তরফ থেকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, কর্লিয়নিও কি তার তরফ থেকে প্রতিশ্রুতি দেবেন?
এবার তার সেই অবিস্মরণীয় বক্তৃতা দিলেন ডন কর্লিয়নি। উপস্থিত সকলের মধ্যে তিনিই যে সব চাইতে দূরদর্শী পলিটিশিয়ান, এই বক্তৃতায় তা প্রমাণ হয়ে গেল! এত সাধারণ অথচ গভীর বুদ্ধি, এত আন্তরিকতা আর কোথায় পাওয়া যাবে? বিষয়টার মুলে গিয়ে কে এমন আঘাত করতে পারে? এই বক্তৃতাতেই তিনি একটা বাকাংশ রচনা করলেন, সেটি পরে প্রায় চার্চিলের লৌহ যবনিকার মতই বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল, যদিও আরও দশ বছর পর কথাটি সাধারণ লোকের কানে পৌঁছেছিল।
এই প্রথম উঠে দাঁড়িয়ে সভাকে সম্বোধন করলেন ডন কর্লিয়নি।
কেমন মানুষ আমরা, যদি বিচার বৃদ্ধি হারাই? তাহলে বনের পশুর চেয়ে কিসে আমরা ভাল? না, বিচার বুদ্ধি আছে আমাদের। আমরা পরস্পরের সাথে যুক্তি দিয়ে আলোচনা করতে পারি। নিজেদের সাথেও পারি। কি উদ্দেশ্যে আমি আবার ওই গণ্ডগোল, ওই হিংসাত্মক কাজ কারবার, ওই অশান্তি শুরু করব? ছেলে আমার মারা গেছে, সেই বড় দুঃখ। কিন্তু সে দুঃখ আমাকে সইতে হবে, তার জন্যে আমার চারদিককার নির্দোষ জাতিটাকে কষ্ট দিলে চলবে কেন? তাই আমি বলছি, ধর্ম সাক্ষী করে বলছি, কখনও প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা আমি করব না, অতীতে যে-সব কাণ্ড হয়ে গেছে, সে-বিষয়ে কিছু জানবার চেষ্টাও করব না। নির্মল চিত্তে এখান থেকে বিদায় নেব আমি।
আমাকে এ-কথা বলতে দিন যে আমরা সব সময় নিজেদের স্বার্থটাই দেখব। আমরা কি সেই মানুষ নই, যারা বোকা বনতে রাজী হইনি? যারা ওপরওয়ালাদের হাতের সুতোয় বাঁধা পুতুলের মত নাচতে অস্বীকার করেছি? এদেশে এসে আমাদের কপাল খুলে গেছে। এরই মধ্যে আমাদের সন্তানেরা উন্নততর জীবনের আস্বাদ পেয়েছে। আমাদের ছেলেরা অধ্যাপক হয়েছে, বৈজ্ঞানিক, সঙ্গীতশিল্পী হয়েছে। আমরা সৌভাগ্যবান। হয়তো আমাদের নাতি-নাতনিরা আগামী দিনে এই দেশের কর্তাব্যক্তি হবে। আমরা কি কেউ চাই আমাদের ছেলেরাও আমাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করুক? না, চাই না। এ বড় কঠিন জীবন। ওরা অন্যদের মত হতে পারে, পারে নিরাপদ, সহজ জীবনের অধিকারী হতে। ওদের পদমর্যাদা আর নিরাপত্তা আমাদের সৎসাহসের ফল হিসেবেই চিহ্নিত হবে। আমার এখন নাতি নাতনি হয়েছে, আমি আশা করছি, কে জানে হয়তো একদিন তাদের ছেলেরাই গভর্নর হবে, প্রেসিডেন্ট হবে কিছুই অসম্ভব নয় এই আমেরিকায়। অবশ্য সময়ের সাথে সাথে আমাদেরও এগিয়ে যেতে হবে। গোলাগুলি, হত্যা আর খুনের দিন গত হয়েছে। ধূর্ত হতে হবে আমাদেরকে। ব্যবসায়ীদের তাইতো হওয়া উচিত, তাতে আরও টাকা রোজগার হবে আমাদের সন্তানদের জন্যে, তাদের সন্তানদের জলেও সেটাই তো ভাল।
