বার্জিনি থামলেন। সবাই চুপ করে আছেন। সীমারেখা টানা হয়ে গেছে। তার মানে আগেকার অবস্থায় ফিরে যাওয়া যাবে না আর।
অবশেষে বার্জিনির কথার উত্তর ডন কর্লিয়নিকেই দিতে হলো। বন্ধুগণ, আমার প্রত্যাখ্যানের পিছনে বিদ্বেষ ছিল না। আপনারা আমাকে চেনেন কবে আমি কার সুবিধে করে দিতে অস্বীকার করেছি? কেন করব? আমার ও রকম স্বভাবই নয়। কিন্তু এবার অস্বীকার না করে উপায় ছিল না কেন? কারণ, আমার মতে এই ড্রাগন-এর ব্যবসাই একদিন আমাদের কাল হবে, আমাদের সর্বনাশ ডেকে আনবে। এদেশে এই ব্যবসা সম্পর্কে জনসাধারণের প্রবল আপত্তি আছে। এ তো আর হুইস্কি, কিংবা জুয়া অথবা মেয়েমানুষের ব্যাপার নয়। এগুলো বেশির ভাগ লোকেই মেনে নেয়। ড্রাগের সাথে যারাই জড়িত হবে, তাদেরই বিপদ হতে পারে। এর জন্য অন্য সব ব্যবসাও বিপন্ন হতে পারে। তাছাড়া, আমাকে একটু বলবার অনুমতি দিন যে বিচার আর আইন-বিভাগের ওপর আমার এত প্রভাব, এ কথা শুনে আমি খুশি হলেও, কথাটা সত্যি হলে আরও ভাল হত। খানিকটা প্রভাব যে নেই তা নয়, কিন্তু যারা আমার পরামর্শকে শ্রদ্ধা করে, তারা যদি জানে যে আমি ড্রাগের সাথে জড়িত, তাহলে তাদের অনেকেরই শ্রদ্ধা হারাব তারা এই ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়তে ভয় পায়, এর সম্পর্কে তাদের মনোভাব অত্যন্ত বিরূপ। এমন কি যে-সব পুলিশ আমাদের জুয়া খেলা ইত্যাদিতে সাহায্য করে, ড্রাগ ব্যবসায় সাহায্য করতে তারাও রাজী হবে না। সুতরাং এ বিষয়ে আপনাদেরকে সুবিধা করে দিতে বলার মানে দাঁড়াচ্ছে, আমাকে আমার নিজের অসুবিধে করতে বলা তবে আপনারা সবাই যদি তা সত্ত্বেও মনে করেন যে অন্যদের সমস্যা সমাধান করতে হলে এটুকু আমার করা দরকার, বেশ, তাহলে আমি তাও করব।
ডন কর্লিয়নির কথা শেষ হতেই ঘরের আবহাওয়া সম্পূর্ণ বদলে গেল। সকলে আশ্বস্ত হয়ে ফিসফিস আলোচনা, কথা কাটাকাটি শুরু করে দিয়েছে : প্রধান শর্তে ডন কর্লিয়নি রাজী হয়ে গেছেন। ড্রাগসের কোন সংগঠিত ব্যবসা চললে, তিনি সেটাকে রক্ষা করার চেষ্টা করবেন। অর্থাৎ সলোযোর মূল প্রস্তাবের প্রায় সবটুকুই মেনে নেবেন-যদি আজকের এই জাতীয়সভা সে-প্রস্তাব সমর্থন করে। তবে এটাও বুঝে নিতে হবে যে ব্যবসার উপর তার কোন অংশ থাকবে না, তার টাকা পয়সাও তাতে খাটবে না। তিনি শুধু আইনের সাথে সংঘর্ষ হলে তাদেরকে রক্ষা করার জন্যে প্রভাব বিস্তার করবেন কিন্তু সেটাও কিছু কম পাওয়া নয়।
এবার কথা বললেন লস অ্যাঞ্জেলেসের ডন, ফ্রাঙ্ক ফ্যালকনি, এই ব্যবসা থেকে আমার লোকদের হটাবার কোন উপায় নেই। তারা নিজেদের দায়িত্বে কাজ চালাতে লেই বিপদে পড়বে। এ ব্যবসাতে এত বেশি লাভ যে লোভ সামলানো অসম্ভব। তাই এতে না নামলে আরও বেশি বিপদ। ব্যবৰা পরিচালনার দায়িত্ব যদি আমাদের হাতে থাকে, তাহলে রক্ষণাবেক্ষণটা অন্তত আরও ভাল হবে, সংগঠনের। কাজ আরও ভাল হবে, যাতে গোলমাল কম হয় তার ব্যবস্থাও করা সম্ভব হবে। ব্যবসাটা তুলনাহীন, কিন্তু এর পরিচালনা দরকার, একে রক্ষা করা দরকার, এর। শক্তিশালী সংগঠন দরকার, এক দঙ্গল নৈরাজ্যবাদীর মত শুধু যা ইচ্ছে তাই করে। বেড়ালে তো আর চলবে না।
কর্লিয়নিদের প্রতি অন্যদের চেয়ে ডেট্রয়টের ডন একটু বেশি বন্ধু ভাবাপন্ন। কিন্তু যুক্তির খাতিরে তিনিও এখন বন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে কথা বললেন, ড্রাগসের ওপর আমার কোন আস্থা নেই। বহু বছর ধরে আমার লোকরা যাতে এই ব্যবসাটাতে না ঢোকে, সেজন্যে তাদের বেশি করে টাকা দিয়েছি আমি। কিন্তু। তাতে লাভ হয়নি কিছুই, কোন সুবিধে হয়নি। অন্য লোকরা এসে তাদের বলছে, কিছু গুঁড়ো আছে আমার কাছে, তোমরা যদি তিন চার হাজার ডলার খাটাতে পারো, তাহলে লাভের অংশ পঞ্চাশ হাজার ডলার ভাগ করে নিতে পারব আমরা। এমন লাভের প্রস্তাব কজন লোক ফিরিয়ে দিতে পারে! নিজেদের এই বাঁ হাতের ব্যবসা নিয়েই আমার লোকরা ব্যস্ত থাকে। আমার যে-কাজের জন্যে তারা মাইনে খায়, তা করার সময় পায় না। ভাগ বিজনেসে লাভ ঢের বেশি। শুধু তাই নয়, লাভের অংক ক্রমে বেড়েই চলেছে। ব্যবসাটা বন্ধ করার আসলে কোন উপায়ই নেই, সুতরাং ব্যবসাটা নিজেদের হাতে রেখে ওর মান বাঁচানোর চেষ্টা করাই উচিত। কোন স্কুলের কাছে-পিঠে ব্যবসাটা চলুক, তা আমি চাই না। সে বড় জঘন্য কাজ হবে। আমাদের শহরে, ব্যবসাটাকে আমি কার্লো মানুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। আশ্চর্য ভাল খদ্দের ওরা, গোলমাল বাধায় সবচেয়ে কম, এমনিতেও জানোয়ার বই তো নয়। নিজেদের, স্ত্রীদের, নিজেদের পরিবারের, কারোই সম্মান রাখে না ওরা। ড্রাগ ব্যবহার করে যাক না গোল্লায়।
ডেট্রয়টের ডনের বক্ততা থামতে না থামতেই চাপা গলায় বাহবা দিচ্ছে সবাই। ঠিক জায়গায় টোকা দিয়েছেন তিনি। টাকা দিয়েও তো লোককে ড্রাগ ব্যবসা থেকে সরিয়ে রাখা যাচ্ছে না। আর ওই যে স্কুলের ছেলেমেয়েদের কথা বললেন তিনি, ওটা তো তার সেই বিখ্যাত স্পর্শকাতরতা, তার কোমল হৃদয়ের ব্যাপার-স্যাপার। যে যাই বলুক, ছেলেপুলেদের কাছে কে আবার ড্রাগ বেচতে যাচ্ছে? ছোটরা টাকা পয়সাই বা পাবে কোথায়? আর ওই যে কার্লো মানুষদের কথা বললেন, ও তো কেউ কান পেতে শুনলই না। নিগ্রোদের কেউ কোন মূল্যই দেয় না, ওদের সেঁন শক্তিও নেই। সমাজ যে ওদেরকে মাটিতে পিষে ফেলতে পারছে, তা থেকেই তো প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে যে ওদের কোন মনুষ্যত্ব নেই বলেই এমনটি সম্ভব হচ্ছে। ওদের কথা উত্থাপন করে ডেট্রয়টের ডন প্রমাণ করে দিলেন, ভাবছে সবাই, ওর মনটা সব সময় অবান্তর বিষয়ের দিকে ঝোঁকে। তারপর সব ডনরা কথা বলতে শুরু করলেন, সকলেই দুঃখ করতে লাগলেন এই বলে যে ডাগের ব্যবসা বড় খারাপ ব্যবসা, কিন্তু ওটা বন্ধ করার কোন উপায় নেই। এ ব্যবসায় বড় বেশি লাভ কিনা, তাই সব রকম ঝুঁকি নিয়েও এতে হাত দেবেই লোকেরা। মানুষের স্বভাব যে কি তা তো আর কারও অজানা নেই।
