আবার থামলেন ডন। তার বিবৃতি শুনতে কারও যদি আপত্তি থাকে সে যেন তা প্রকাশ করতে পারে কিন্তু কেউ তাঁকে বাধা দিচ্ছে না এখনও
সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই যে আমার শরীরটা সেরে উঠেছে। ব্যাপারটা হয়তো মিটিয়ে ফেলতে সাহায্য করতে পারব আমি। আমার ছেলে হয়তো বড় বেশি হঠকারি, বড় বেশি গোঁয়ার ছিল। সেটা আমি অস্বীকার করব না সে যাই হোক, কেন এত কিছু ঘটল সে-ব্যাপারে শুধু এইটুকু বলতে চাই যে সলযো আমার কাছে একটা ব্যবসার প্রস্তাব আনে, আমার টাকা আর পৃষ্ঠপোষকতা চায়। এ ব্যাপারে টাটাগ্লিয়া পরিবারও জড়িত। ব্যবসাটা ড্রাগসের। আমার তাতে কোন আগ্রহ নেই। আমি চুপচাপ থাকতে ভালবাসি, ওসব ব্যবসাতে অনেক রকম ঝামেলা, তাই আমার পছন্দ নয়। তাকে আর টাটাগ্লিয়া পরিবারকে আমার শ্রদ্ধা জানিয়ে, তাকে সব কথাই বুঝিয়ে বলেছিলাম আমি। বিনয় আর সৌজন্যের সাথেই প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। বলেছিলাম, তার ব্যবসা আর আমার ব্যবসার মধ্যে কোন বিরোধ নেই, যে যেভাবে ইচ্ছে টাকা রোজগার করুক, তাতে আমার কোন আপত্তিও নেই। সে কিন্তু আমার কথাটাকে ভালভাবে নিল না, না নিয়ে আমাদের সবার সর্বনাশ ডেকে আনল। জানি, এরই নাম জীবন। এখানে আপনারা যারা এসেছেন, তারা প্রত্যেকেই যার যার দুঃখের কথা বলতে পারেন। আমার নিজের ইচ্ছা তা নয়।
আবার থামলেন ডন কর্লিয়নি, ইশারা করে কিছু ঠাণ্ডা পানীয় আনতে বললেন হেগেনকে। তাড়াতাড়ি পানীয় এনে দিল হেগেন
ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে আবার শুরু করলেন ডন কর্লিয়নি। বললেন, আমি শান্তি চাই। শান্তি ফিরিয়ে আনতেও রাজী আছি। একটি ছেলে গেছে টাটাগ্লিয়ার, আমারও একটি ছেলে গেছে। সব শোধবোধ হয়ে গেছে। সবাই যদি অকারণে মনে মনে বিদ্বেষ পুষে রাখে, পৃথিবীটার কি দশা হবে তাহলে? এটা কি? এটা হলো সিসিলির সেই অভিশাপ। সেখানে লোকেরা প্রতিশোধ নিতে এত বেশি ব্যস্ত থাকে যে স্ত্রী-পুত্র-পরিবারের মুখে একটু রুটি দেবে, তার পয়সা রোজগার করার পর্যন্ত সময় পায় না। এর একমাত্র অর্থ মৃঢ়তা। তাই আমি বলি, আগে যেমন চলছিল সেইভাবেই সব চলুক। ফাঁদ পেতে আমার ছেলেকে কে ধরিয়ে দিল, কে মারল, তা জানবার আমি চেষ্টাও করিনি। কেন? কারণ শান্তি চাই আমি। তাতে যদি শান্তি আসে, তাহলে প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করবও না। আমার এক ছেলে বাড়ি ফিরে আসতে পারছে না। এ ব্যাপারে আমি আপনাদের কাছ থেকে একটা প্রতিশ্রুতি চাই। আমি যখন তার নিরাপদে ফিরে আসার ব্যবস্থা করব, তখন কেউ যেন বাধা দেবেন না, কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোন বিপদের সম্ভাবনা যেন না থাকে। এই প্রতিশ্রুতি চাই আমি পেলে, আমরা অন্য বিষয়ে আলোচনা করতে পারব। তাতে আমাদের সবারই সুবিধে। সবার লাভও হবে। হাত নেড়ে আবেগ আর বিনয়ের ভাব প্রকাশ করলেন ডন কর্লিয়নি, বললেন, এইটুকুই আমি বলতে চাই।
চমৎকার বললেন ইনিই তো সেই আগেকার ডন কর্লিয়নি। যুক্তি মেনে চলেন ইনি অন্যদের সুবিধে করে দেবার জন্য নিজের মত বদলান। কোমল, আপোসের সুরে কথা-বার্তা। কিন্তু উপস্থিত সবাই লক্ষ করল যে শরীর ভাল হয়ে যাবার দাবি করলেন তিনি, অর্থাৎ কর্লিয়নি পরিবারের নানান দুর্ভোগসত্ত্বেও তাকে হেয়জ্ঞান করা চলবে না এও লক্ষ করার বিষয় যে ন কর্লিয়নি বললেন, আগে শান্তি প্রস্তাবটা গ্রহণ করা হোক, তার আগে পর্যন্ত অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা করে লাভ নেই এও লক্ষণীয় যে তিনি আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চান, অর্থাৎ গত এক বছর ধরে নানান বিপর্যয় ভাগ করা সত্ত্বেও কোন রকম লোকসান মেনে নেবেন না।
সে যাই হোক, ডন কর্লিয়নির বক্তব্যের উত্তরে কথা বললেন এমিলিও বার্জিনি, টাটাগ্লিয়া নয়। বক্তব্য-বিষয় সোজা ও সংক্ষেপে পেশ করলেন তিনি। অবশ্য অভদ্র বা অপমানকর কিছু বললেন না।
বার্জিনি বললেন, আপনি যা বললেন তার সবই সত্যি কথা বটে, কিন্তু তাছাড়া আরও কথা আছে। আপনি, ডন কর্লিয়নি, বড়ই বিনয়ী। তবে আসল কথা। হলো আপনার সাহায্য না পেলে সলোযো আর টাটাগ্লিয়াদের পক্ষে তাদের নতুন ব্যবসা চালানো সম্ভব ছিল না। আজও সম্ভব নয়। এমন কি আপনার অস্বীকৃতি, মানেই তাদের ক্ষতি। সেটা অবশ্য আপনার অপরাধ নয় কিন্তু কথা হলো, যে সব বিচারক আর রাজনীতিবিদরা আপনার কাছ থেকে অনুগ্রহ নিতে রাজী রয়েছেন, এমন কি নেশার ওষুধপত্র সংক্রান্ত ব্যাপারেও, তারাই কিন্তু ড্রাগসের বেলায় অন্য। কারও দ্বারা প্রভাবিত হতে প্রস্তুত নন। সলোযোর লোকদের সাথে কর্তৃপক্ষ নরম ব্যবহার করবে, এই আশ্বাস না পেলে সেই বা কি করে কাজ করত? তা যে সব ছিল না, এ তো আমরা সবাই জানি। ড্রাগের ব্যবসা করতে না পারলে আমরা সবাই গরীব হয়ে যাব আজকাল শাস্তির মেয়াদও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ড্রাগ ব্যবসা চালাতে গিয়ে আমাদের কোন লোক যদি ধরা পড়ে, তাহলে বিচারক আর। অ্যাটর্নিরা বড় কঠোর আচরণ করেন। কুড়ি বছরের মেয়াদের ভয়ে সিসিলির। লোকরা পর্যন্ত তাদের ওমো অর্থাৎ নীরবতার নিয়ম ভেঙে সব কথা গড় গড় করে বলে ফেলতে পারে। তা হলে তো চলবে না। এর কলকাঠি, ডন কর্লিয়নি, আপনার হাতে। আপনি সে কলকাঠি আমাদের জন্য না নাড়লে, বন্ধুর কাজ করা হয় না। আমাদের স্ত্রী-পুত্র-পরিবারের মুখ থেকে রুটি কেড়ে নেয়া হয় সময় পাল্টে গেছে, আগেকার সেই দিন আর নেই। একটা সময় ছিল যখন যার যেদিকে মন চাইত সে সেদিকে চলত। এখন যার যা খুশি করার দিন গত হয়েছে। নিউ ইয়র্কের বিচারকরা যদি কর্লিয়নিদের কেনা গোলাম হয়ে থাকে, তাহলে তাদের সেবা পাবার সুযোগ আমাদেরকেও দিতে হবে। কুয়ো থেকে পানি আমাদেরকে তুলতে দিতেই হবে। এই আমাদের এক কথা।
