কনসিলিয়রিকে সাথে করে এনেছেন জালুচিও। দুজনেই সবার আগে ডন কর্লিয়নির কাছে এলেন, আলিঙ্গন করলেন তাকে। গলার স্বর আমেরিকানদের মত গম গম্ করে জালুচির, তাতে খুব সামান্য একটু টান আছে পোশাক-আশাকে প্রাচীনপন্থী, কট্টর ব্যবসাদারের মত হাবভাব, আবার প্রয়োজনে অমায়িক সহৃদয়তার পরিচয় দিয়ে থাকে। ডন কর্লিয়নিকে তিনি বললেন, শুধু আপনার ডাক শুনেই এসেছি আমি। মাথা নিচু করে ধন্যবাদ জানালেন ডন কর্লিয়নি। সমর্থনের জন্যে তিনি নির্ভর করতে পারবেন জালুচির উপর।
এরপর এলেন, পশ্চিম তীরের দুজন ডন। একসাথে এক গাড়িতেই এসেছেন তারা! কাজকর্মও করেন একসাথে। নাম, ফ্র্যাঙ্ক ফ্যালকনি আর অ্যান্টনি মলিনারি, আর সবাই যারা এই সভায় যোগ দিতে এসেছেন, তাদের চেয়ে এঁদের দুজনের বয়স কম, চল্লিশের কোঠার গোড়ার দিকে। এদের পোশাক-পরিচ্ছদ অন্যদের চেয়ে কম কেতাদুরস্ত, ধরন ধারনে কিঞ্চিৎ হলিউডি কায়দা, যতটা হলেই চলে আচার ব্যবহারে তার চেয়ে একটু বেশি অমায়িক আর বন্ধুত্বের ভাব। ফ্র্যাঙ্ক ফ্যালকনির হাড়ে আছে চলচ্চিত্র শ্রমিক সংঘগুলো। তাছাড়া আছে স্টুডিওর জুয়া খেলা আর একটা বেশ্যা ব্যবসা চালানোর সংগঠন, সেখানে থেকে সুদুর পশ্চিমেরগণিকালয়ে বেশ্যা সরবরাহ করা হয়। কোন ডনের পক্ষে শো বিজ-এ জড়িয়ে পড়া সম্ভব নয়, শো বিজ হলো নাচ-গান-অভিনয় ইত্যাদি, তবু ফ্যালকনির একটু ঝোঁক আছে সেদিকে। তাই অন্যান্য ডনরা তাকে বিশ্বাস করেন না।
স্যান ফ্রান্সিস্কোর তীরভূমি পরিচালনা করেন অ্যান্টনি মলিনারি। খেলাধুলা সংক্রান্ত জুয়ায় তাঁর খুব প্রতিপত্তি। ইতালীয় জেলে বংশের ছেলে তিনি। স্যান ফ্রান্সিস্কোর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সী-ফুড রেস্তোরাঁর মালিক। সেখানে নানারকম উপাদেয় সামুদ্রিক খাবারদাবার ছাড়া আর কিছু পরিবেশন করা হয় না। লোকে বলাবলি করে যে ওই রেস্তোরাঁ নিয়ে লোকটা সাঙ্ঘাতিক গর্বিত গর্বটা এতই বেশি যে সেখানে একেবারে পানির দামে ভাল খাবার পরিবেশন করা হয়। ব্যবসাটাই লোকসান দিচ্ছে। পেশাদার জুয়াড়ীর মত ভাবলেশহীন মুখ তার। সবাই জানে, মেক্সিকোয় সীমান্তের ওপার দিয়ে আর পুব সাগরের অলিগলি দিয়ে যে সব জাহাজ যাতায়াত করে তাদের কাছ থেকে নিয়ে মলিনারি কিছু ড্রাগসের চোরা কারবারও করেন। এদের সহকারীদের বয়স বেশি নয়। বলিস্ট গড়ন, দেখেই বোঝা যাচ্ছে সহকারীটারী নয়, স্রেফ বডিগার্ড। তবে, এ ধরনের সভায় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আনার সাহস ওদেরও নেই। সবাই জানে, এই বডিগার্ডরা কারাতে জানে। বাপারটা আর সব ডনদের হাসির খোরাক। ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, ক্যালিফোর্নিয়ার ডনরা যদি পোপের আর্শীবাদ দেয়া মাদুলীও বেঁধে আসতেন, তার চেয়ে একটুও বেশি শঙ্কিত হতেন না কেউ। যদিও একটা লক্ষণীয় বিষয় হলো এই যে এদের মধ্যে কেউ কেউ অত্যন্ত ধার্মিকও বটে, সৃষ্টিকর্তার উপর প্রবল বিশ্বাস রাখেন।
তারপর বোস্টন পরিবারের প্রতিনিধি এলেন। একমাত্র তাঁকেই অন্যরা একটুও শ্রদ্ধা করেন না। তিনি নিজের লোকদের সাথে ন্যায্য ব্যবহার করেন না বলে যথেষ্ট দুর্নাম আছে তার। তিনি তাদের নির্মমভাবে ঠকান। তাও ক্ষমা করা যায়, কেননা সব মানুষের লোভের মাত্রা তো আর সমান নয়। যেটা ক্ষমা করা যায় না সেটা হলো নিজের এলাকায় তিনি শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারেন না। তার এলাকা বোস্টনে বড় বেশি খুন, ক্ষমতা নিয়ে বড় বেশি স্থল ঝগড়াঝাটি, বড় বেশি স্বাধীন অনুমোদিত ক্রিয়াকলাপ, বড় বেশি বেয়াড়াভাবে আইন ভাঙাভাঙি। শিকাগোর মাফিয়ারা যদি বুনো জঙ্গলী হয়ে থাকে, বোস্টনের লোকদের বলা চলে অমার্জিত অসভ্য বর্বর। স্রেফ গুণ্ডা। বোস্টনের ডনের নাম ডনেমিক পাঞ্জা বেঁটে, গাট্টাগোট্টা চেহারা। একজন ডনের ভাষায়, স্রেফ একটা চোরের মত দেখতে।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী নিছক জুয়াখেলার সংগঠন বোধ হয় ক্লীভল্যাণ্ডের সংঘটাই। তাদের প্রতিনিধি সূক্ষ্ম অনুভাবনশীল চেহারার একজন প্রৌঢ়, চোখ মুখ বসে গেছে, ধপধপে সাদা চুল। তাঁর সামনে কিছু না বললেও, পিছনে সবাই তাকে ইহুদী বলে। তার কারণ, সিসিলীয় নোক না রেখে, নিজের চারপাশে ইহুদী মোতায়েন রাখেন তিনি। এমন কি লোকমুখে এ কথাও আটকায় না যে যদি সাহসে কুলাত তাহলে উনি কনসিলিয়রির পদেও একজন ইহুদীকেই বহাল করতেন। মোট কথা, হেগেন থাকায় ডন কর্লিয়নির পরিবারকে যেমন বলা হয়, আইরিশ দঙ্গল, তেমনি আরও যুক্তিসঙ্গত কারণে ডন ভিনসেন্ট ফরলেঞ্জার পরিবারকে বলা হয় ইহুদী পরিবার। তবে তাঁর সংগঠনটি পরিচালিত হয় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। ডনের মুখের ওই সুবোধ চেহারা সত্ত্বেও, রক্ত দেখে কখনও তিনি মূৰ্ছা গেছেন বলে শোনা যায়নি। তাঁর ওই মখমলের রাষ্ট্রনৈতিক দস্তানার ভিতরে রয়েছে প্রচণ্ড লৌহমুষ্টি।
সবার শেষে এলেন নিউ ইয়র্কের পাঁচ পরিবারের প্রতিনিধিরা। সাথে সাথে টম হেগেন লক্ষ করল, মফঃস্বল থেকে আসা ওই সব পাড়াগেঁয়ে নেতাদের চেয়ে এদের ব্যক্তিত্বের জোর কত বেশি, কত বেশি শ্রদ্ধা করার মত চেহারা প্রত্যেকের। প্রথম কথা হলো, নিউ ইয়র্কের পাঁচজন ডনই প্রাচীন সিসিলীয় ঐতিহ্যের অনুগামী। পেটওয়ালা মানুষ তারা–অর্থাৎ আলঙ্কারিক ভাষায় বলা হচ্ছে, যেমন প্রতাপ তেমনি সাহস তাদের, আর সাদামাঠা ভাষায় বলা হচ্ছে, গায়ে-পায়ে তাদের মাংস আছে। সত্যি কথা বলতে কি, সিসিলীতে ওই দুটো বৈশিষ্ট্যকে এক করেই দেখা হয়। নিউ ইয়র্কের পাঁচজন ডনের সবার চেহারা শক্ত, মেদবহুল। সিংহের মত বিশাল মাথা প্রত্যেকের, প্রকাণ্ড মুখাবয়ব, মাংসল রাজকীয় নাক, পুরু ঠোঁট। খুব একটা কায়দাদস্তুর ভাবে সাজগোজ করেননি কেউ, তাদের দেখলেই মনে হয় বাবুয়ানী-বর্জিত কাজের মানুষ সবাই, বাজে কাজে নষ্ট করার মত সময় নেই কারও।
