ব্যাংকের সভাপতি, সিসিলীয় না হলেও, দারুণ অনুভূতিশীল। ডনের কথার মর্ম সাথে সাথে বুঝে নিয়েছিলেন। এখন গড ফাদার কিছু অনুরোধ করলে, প্রেসিডেন্টের কাছে, সেটা আদেশ স্বরূপ। তাই আজ শনিবার সকালে, নিউ ইয়র্কের পাঁচ পরিবারের প্রয়োজনে ব্যাংকের কনফারেন্স রুমে বড় বড় চামড়া-বাঁধানো চেয়ার আঃ একান্ত নিজনার ব্যবস্থা হয়েছে!
নিরাপত্তা এবং প্রহবার দায়িত্ব দেয়া হলো বাছাই করা একদল লোককে! ব্যাংক-গার্ডদের ইউনিফর্ম পরে আছে তারা। শনিবার সকাল দশটা। সভাঘরে লোক জমা হতে শুরু করেছে। নিউ ইয়র্কের পাঁচ পরিবার ছাড়াও এসেছে দেশের চাবদিক থেকে দশটা পরিবারের প্রতিনিধিরা। নিমন্ত্রণ করা হয়নি শুধু শিকাগোর পরিবারগুলোকে। এদের জগতে শিকাগোর লোকদেরকে কলঙ্ক বলে মনে করা হয়। ওদেরকে শিষ্টাচার শেখাবার চেষ্টাও বাকিরা ছেড়ে দিয়েছে। এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশে ওদেরকে ডাকার কোন মানেই হয় না, এ-ব্যাপারে সবাই একমত।
একটা বার খোলা হয়েছে মদ পরিবেশনের জন্যে। খাবার সাজানো হয়েছে বুফে টেবিলে। প্রত্যেক সদস্যকে আলোচনা সভায় একজন করে সহকার সাথে নিয়ে আসার অনুমতি দেয়া হয়েছে। সহকারী হিসাবে সব ডনই তাদের কনসিলিয়রিদের এনেছেন। তার ফলে সভায় কমবয়সী লোক নেই বললেই চলে। অল্পবয়সীদের মধ্যে টম হেগেন একজন। তাছাড়া উপস্থিত ভদ্রলোকদের মধ্যে একমাত্র সে-ই সিসিলীয় নয়। কৌতূহলের সাথে সবাই দেখেছে তাকে, সে যেন আজব কোন চিড়িয়া।
সবিনয় সৌজন্য কাকে বলে হেগেন তা ভালই জানে। সে কথাও বলছে না, হাসছেও না। রাজার প্রিয় পাত্র কোন অর্লি যে-ভাবে রাজার পরিচর্যা করে, টম হেগেনও সেভাবে গড ফাদারের পরিচর্যা করছে। তার জন্য ঠাণ্ডা পানীয় এনে দিচ্ছে, তাঁর চুরুট ধরিয়ে দিচ্ছে, তার এ্যাশট্রেটা ঠিক জায়গায় সরিয়ে রাখছে। সবটাই শ্রদ্ধার সাথে, কিন্তু স্কুল হোশামুদে চাকরের ভঙ্গিতে নয়।
গাঢ় রঙের কাঠের প্যানেল দেয়া দেয়ালে যাদের ছবি ঝুলছে, তাদের পরিচয়। একমাত্র হেগেনই জানে। দামী তেলরঙে আঁকা অর্থনৈতিক জগতের স্বনামধন্য কয়েকজন লোকের প্রতিকৃতি ওগুলো। একটি ছবি ট্রেজারী সচিব হ্যাঁমিলটনের। হেগেন জানে, একটা ব্যাংক ভবনে এ ধরনের শান্তি-সভা বসেছে জানলে খুশি হবেন না হ্যামিলটন।
উপস্থিতির সময় সকাল সাড়ে নটা থেকে দশটা পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।
এক অর্থে ডন কর্লিয়নিকে এই অনুষ্ঠানের হোস্ট বলা যেতে পারে, কারণ এই শান্তি-আলোচনার প্রস্তাব তিনিই উত্থাপন করেছেন। এসেছেন তিনি সবার আগে। তার বহুবিধ গুণের মধ্যে সময়নিষ্ঠা হলো একটা। তার পরেই এলেন কার্লো ট্রামন্টি। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অংশটাকে নিজের এলাকা বলে বেছে নিয়েছেন তিনি। ভদ্রলোক মাঝবয়সী, তাকিয়ে থাকার মত সুপুরুষ, সিসিলীয়দের পক্ষে মাথায় খুব। উঁচু, গায়ের রঙ রোদে পোড়া। পোশাক-পরিচ্ছদ, কেশ-বিন্যাস নিখুঁত। দেখে ইতালীয় মনে হয় না। পত্রিকাতে যে সব কোটিপতিদের ছবি বেরোয়, নিজেদের সৌখিন ইয়টে আরাম করে বসে মাছ ধরছে, ভদ্রলোক বরং তাদের মত দেখতে। ট্রামন্টি পরিবারের টাকা আসে জুয়া খেলা থেকে। কিন্তু তাদের ডনকে দেখলে কেউ ধারণাও করতে পারবে না কি হিংস্র, রক্তারক্তি সংগ্রাম করে রাজ্য লাভ করতে হয়েছে তাকে।
ছোট বেলায় সিসিলি থেকে চলে এসে ফ্লোরিডাতে বসবাস করেছেন। তিনি বড় হয়েছেন সেখানেই। দক্ষিণ অঞ্চলের ছোট শহরগুলোতে যারা রাজনীতি করে, তাদের একটা সংগঠন আছে, তারা জুয়া খেলা নিয়ন্ত্রণ করে। ট্রামন্টি তখন তাদের একজন কর্মী। ভারি শক্তিশালী লোক সব, ওখানকার ক্ষমতাশালী পুলিশ কর্মচারীরা ওদের পৃষ্ঠপোষকতা করে, ওরা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি যে বিদেশ থেকে আনকোরা কঁচা আমদানী হওয়া এই হোকরা তাদের পরাস্ত করতে পারবে। তার ওই হিংস্রতার জন্য ওরা তৈরি হবারই সময় পায়নি, তাঁর সামনে ওরা দাঁড়াতেই পারেনি। কারণ ওদের মতে এত সামান্য লাভের জন্যে এত বেশি রক্তপাতের কোন মানে হয় না। বেশি করে লাভের অংশ দিয়ে ট্রামন্টি পুলিশের লোকদের দলে টেনে নিলেন। লাল মুখো গুণ্ডাগুলোর একটুও কল্পনাশক্তি নেই, এরা আবার সংগঠন চালাবে। ট্রামটি এদের সমূলে উৎখাত করলেন। কিউঃ আর বাটিস্টা সরকারের সাথে ট্রামন্টিই যোগাযোগ করলেন। হাভানাব সুখের নিবাসগুলোয় যত জুয়ার আড্ডা আর বেশ্যা বাড়ি আছে, সবখানে এলে টাকা ঢাললেন ট্রামন্টি, যাতে আমেরিকার জুয়াড়ীদের আকৃষ্ট করতে পারেন। এখন ট্রামন্টি বহু লক্ষ ডলারের মালিক, মিয়ামী বীচের সবচেয়ে সৌখিন একটা হোটেলের মালিক।
সভাঘরে এলেন ট্রামন্টি, পিছন পিছন এল তারই মত রোদে পোড়া তার কনসিলিয়রি। ঢুকেই ডন কর্লিয়নিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন ট্রামন্টি, ডনের ছেলের মৃত্যুর জন্যে শোক প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে মুখে সমবেদনার ভাব ফুটিয়ে তুললেন।
অন্যান্য ডনও এসে পৌঁছুতে শুরু করেছেন। সবাই সবার পরিচিত, বহু বছরের দেখা-শোনা কখনও সামাজিক অনুষ্ঠানে, কখনও ব্যবসা ক্ষেত্রে। এরা কেউই কাউকে পেশাদারি সৌজন্য দেখাতে ভুল করেন না। এবং বয়স যখন আরও কম আর শরীর আরও, হালকা ছিল তখন পরস্পরকে নানাভাবে সাহায্যও করেছেন। ট্রামন্টির পরপরই এলেন ট্রেয়ট থেকে জোসেফ জালুচি। উপযুক্ত বেনাম ও ছদ্মবেশ নিয়ে ডেট্রয়ট অঞ্চলের একটা ঘোড়দৌড়ের মাঠের মালিক জালুচি পরিবার। তাছাড়া জুয়া খেলারও একটা বড় আয় আছে তাদের। অমায়িক চেহারা জালুচির। ডেট্রয়টের সৌখিন গ্লোস পয়েন্ট অঞ্চলে এক লাখ ডলার দামের একটা বাড়িতে বাস করেন। তার এক ছেলের বিয়ে হয়েছে একটা প্রাচীন খ্যাতনামা আমেরিকান পরিবারে। ডন কর্লিয়নির মত জালুচিও খুব কায়দাদুরস্ত। সিসিলীয় পরিবার পরিচালিত যতগুলো শহর আছে তার মধ্যে ডেট্রয়ট শহরে হিংসাত্মক ঘটনার সংখ্যা সবচেয়ে কম। গত তিন বছরের মধ্যে মাত্র দু-জনকে প্রাণদণ্ড দেয়া হয়েছে। তিনিও ড্রাগ ব্যবসা সমর্থন করেন না।
