এই সীমাহীন ক্ষমতার বিরুদ্ধে জোর খাটাতে যাওয়াটা উচিত হয়নি কোচ্চিচ্চিওদের। সশস্ত্র সংগ্রামে গোষ্ঠীর অর্ধেক পুরুষ প্রাণ হারাল! বাকি অর্ধেককে সাজা দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হলো দ্বীপান্তরে। মুষ্টিমেয় যে কয়েকজন বাকি থাকল তাদের জন্য বেআইনি চোরা পথে, কানাডা পৌঁছে, জাহাজ থেকে পালিয়ে, আমেরিকায় আসার বন্দোবস্ত করা হলো। টেনেটুনে প্রায় কুড়ি জন বহিরাগত ইতালীয়, নিউ ইয়র্কের অনতিদূরে, হাডসন ভ্যালির ছোট শহরে শুরু করল বসবাস। সমাজের নিম্নতম স্তরের কাজ থেকে জীবিকা অর্জন শুরু করে ক্রমে নিজেদের অবস্থা উন্নত করল ওরা। শেষ পর্যন্ত একটা আবর্জনা সংগ্রহ সংস্থার মালিক হলো। সেই সাথে নিজেদের কয়েকটা ট্রাকও হলো ওদের। প্রতিযোগিতা করার মত কেউ না থাকায় তাদের অবস্থা দিনে দিনে খুব ভাল হয়ে উঠল। প্রতিযোগিতা না থাকার কারণ হলো, কেউ প্রতিযোগিতা করতে এলেই তাদের ট্রাক পুড়ে যায়, ভেঙে যায়। একজন গোঁয়ার-গোবিন্দ গোছের লোক দাম কমিয়ে ওদের ব্যবসা হাতাবার চেষ্টা করল বটে, কিন্তু তাকে দেখা গেল নিজের সংগ্রহ করা আবর্জনার স্তূপের তলায় চাপা পড়ে দম আটকে মরে রয়েছে।
ক্রমে পুরুষদের সকলের বিয়ে হলো, বলা বাহুল্য সিসিলায় মেয়েদের সাথে তাদের ছেলেপিলে হলো, তখন আবর্জনা সংগ্রহের ব্যবসা দিয়ে খাওয়া-পড়া চলে গেলেও, আমেরিকার যে-সব উন্নত বিলাসদ্রব্য কিনতে পাওয়া যায় তা কিনতে গিয়ে পয়সায় কুলোয় না। কাজেই, বাড়তি রোজগারের উদ্দেশ্যে বাচ্চিচিও পরিবার মধ্যস্থতার ভূমিকা নিয়ে আর জামিন হয়ে, যুদ্ধরত মাফিয়া পরিবারগুলোর মধ্যে। শান্তি স্থাপনের দায়িত্ব নিল।
এই বোচ্চিচ্চিও পরিবারের মধ্যে আবার একটা নির্বুদ্ধিতার ভাব দেখা যায়। তবে সেটা ওদের আদিম স্বভাবও হতে পারে। সে যাই হোক, ওরা নিজেদের দূর্বলতা সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন। ওরা জানে, অন্যান্য মাফিয়া পরিবারের সাথে প্রতিঘোগিতা করে, যে-সমস্ত ব্যবসাতে আরও বেশি বুদ্ধির দরকার, যেমন বেশ্যা ব্যবসা, জুয়া খেলা, মাদকদ্রব্যের ব্যবসা, জনসাধারণকে ঠকিয়ে খাওয়া, সে-সব গড়ে তোলা বা চালানো ওদের বুদ্ধিতে কুলিয়ে উঠবে না। ওদের স্পষ্ট কথা, এর টহলদার পুলিশের লোককে হয়তো কিছু দিয়ে খুশি করতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক দালালদের কাছে এগুতে পারবে না। শুধু দুটো গুণ আছে ওদের, সততা আর হিংস্রতা।
বোচ্চিচ্চিওরা কখনও মিথ্যা কথা বলে না। কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করেনা। জানে এসব করতে গেলে বড় বেশি জটিলতার মধ্যে পড়তে হয়। তবে কেউ যদি বোচ্চিচ্চিওদের কোন অনিষ্ট করে সে-কথা তারা কখনও ভোলে না, প্রতিশোধ নিতেও ছাড়ে না, তার জন্যে যে দামই দিতে হোক না কেন। তাই একেবারে হঠাৎ করেই ওরা যে ব্যবসাটায় ঢুকে পড়ল কালক্রমে দেখা গেল সেটাতেই ওদের সবচেয়ে বেশি লাভ হচ্ছে।
যদি যুদ্ধরত পরিবারগুলো আপোস মীমাংসা করার জন্যে পরস্পরের সাথে মিলিত হতে চায়, বোচ্চিশ্চিও পরিবারকে খবর দেয় তারা। বোচ্চিচ্চিও পরিবারের কর্তা গিয়ে শান্তি-প্রস্তাবের কথা পাড়েন, জামিনের ব্যবস্থা করেন যেমন, মাইকেল যখন সলোযোর সাথে দেখা করতে গিয়েছিল, মাইকেলের নিরাপত্তার জামিন হয়ে বোচ্চিচ্চিও পরিবারের একজন লোক কর্লিয়নিদের কাছে বসে অপেক্ষা করছিল। এই জামিনের টাকা দিয়েছিল সলোযো। সলোযো যদি মাইকেলকে মেরে ফেলত, তাহলে ওই জামিনের লোকটিকে মেরে ফেলত কর্লিয়নিরা। সেক্ষেত্রে, তাদের পরিবারের লোকের মৃত্যুর কারণ হবার জন্যে বোচ্চিচ্চিওরা সলোযোকে খুন করত। বোচ্চিচ্চিওদের মধ্যে একটা আদিম ভাব থাকার দরুন তারা প্রতিশোধ নেবার পথে কোন বাধা মানে না, কোন শাস্তিকে ডরায় না। ওরা স্বচ্ছন্দে নিজেদের প্রাণ দেয়। ওদের সাথে যে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাকে কেউ রক্ষা করতে পারে। বোচ্চিচ্চিওদের কাউকে জামিন রাখা সম্পূর্ণ একটা নিরাপদ জীবনবীমার মত।
শান্তি-সতায় যে সব পরিবারের নেতারা আসবেন, বোচ্চিচ্চিওরা তাদের প্রত্যেকের জামিন হবে, তার পাকাপাকি ব্যবস্থা করলেন কর্লিয়নি। সুতরাং তার আন্তরিকতা সম্পর্কে কোন প্রশ্নই উঠল না। সবাই বুঝল শান্তি-সভাটি হবে বিয়ে বাড়ির মত নিরাপদ।
জামিনের সমস্ত খুঁটিনাটি দিক সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর আলোচনা বৈঠক শুরু হলো ছোট একটা বাণিজ্যিক ব্যাংকের ডিরেক্টরদের কনফারেন্স রুমে। এই ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট কোন কারণে ঋণী হয়ে আছেন ডন কর্লিয়নির কাছে, তিনি ব্যাংকের কিছু শেয়ারের মালিকও বটে, যদিও শেয়ারগুলো ব্যাংকের প্রেসিডেন্টের নামেই রয়েছে। ডন কর্লিয়নিকে তার শেয়ারের মালিকানার প্রমাণস্বরূপ একটা লিখিত দলিল দিতে চেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট, যাতে তার প্রতি কোনরকম বিশ্বাসঘাতকতার সুযোগ না থাকে। সেই মুহূর্তটা প্রেসিডেন্টের কাছে সাঙ্ঘাতিক মূল্যবান হয়ে রয়েছে। আতকে উঠেছিলেন ডন কর্লিয়নি। বলেছিলেন, আপনাকে বিশ্বাস করে আমার সমস্ত সম্পত্তি দিয়ে দিতে পারি। আমার নিজের জীবন, আমার সন্তানদের মঙ্গল কিছুই আপনাকে অদেয় নেই। আপনি আমাকে কখনও ঠকাতে পারেন, কিংবা আর কোনভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন, আমি কল্পনাও করতে পারি না। তাহলে যে আমার সমস্ত জগৎ, আমি মানব চরিত্র বিচার করতে পারি এই বিশ্বাস, সবই মিথ্যে হয়ে যাবে। তবে আমার নিজের টুকে রাখা হিসেবপত্র আছে বটে, যাতে হঠাৎ যদি আমার কিছু হয়, আমার ওয়ারিশরা জানতে পারবে যে আপনি অছি হয়ে ওদের কিছু সম্পত্তি রেখেছেন। কিন্তু এটা আমি অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করি, আমার ছেলেমেয়েদের অধিকার রক্ষা করার জন্যে আমি যদি এই পৃথিবীতে নাও থাকি, তবু আপনি তাদের বঞ্চিত করতে পারবেন না।
