ডনের প্রকৃত অভিপ্রায় একমাত্র হেগেন অনুমান করতে পেরেছে। শান্তি-প্রস্তাব দিয়ে পাঁচ পরিবারের কাছে যখন দূত পাঠালেন ডন, এতটুকু আশ্চর্য হলো না সে। শুধু মাত্র শান্তি-প্রস্তাব নয়, সেই সাথে নিউ ইয়র্কের পাঁচ পরিবারের সাথে একটি আলোচনা-প্রস্তাবও করলেন তিনি। সেই সভায় যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত পারিবারিক সংগঠনকে ডাকা হলো। দেশের মধ্যে শুধু নিউ ইয়র্কের মাফিয়া পরিবারগুলোই সবচেয়ে প্রতাপশালী, তাই সবাই জানে যে তাদের মঙ্গলই দেশের মঙ্গল।
প্রথম দিকে কারও কারও মনে সন্দেহ দেখা দিল বৈকি। ফাঁদ পাতবার তালে নেই তো ডন কর্লিয়নি? শত্রুদের চোখে ধূলো দেবার চেষ্টা করছেন না তো? ছেলের মৃত্যুর বদলা নেবার জন্যে পাইকারী হত্যার বন্দোবস্ত করছেন? কিন্তু এটি যে তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টা অচিরেই তা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিলেন ডন কর্লিয়নি। আলোচনা সভার শুধু যে সমস্ত মাফিয়া পরিবারকে ডাকলেন তাই নয়, লড়াইয়ের জন্য নিজের লোকদের প্রস্তুত করার, কিংবা মিত্র সংগ্রহ করার কোন চেষ্টাই করলেন না। তারপর তার শেষ সদিচ্ছা প্রকাশের ব্যবস্থাও করলেন, যার ফলে তার অভিপ্রায়ের আন্তরিকতা যথার্থ এবং নির্ভেজাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। সেই সাথে মহাসভায় যারা উপস্থিত থাকবে সেই সব সদস্যদের নিরাপত্তার গ্যারান্টিও পাওয়া গেল। বোচ্চিচ্চিও পরিবারের সহযোগিতা চাইলেন তিনি।
এই বোচ্চিচ্চিও পরিবারের আশ্চর্য একটা বৈশিষ্ট্য আছে। সিসিলিতে এক সময় ওরা একটা ভয়ঙ্কর হিংস্র মাফিয়া দল হিসেবে পরিচিত হলেও, আমেরিকায় এসে অবধি ঝগড়া বিবাধ মিটিয়ে দিয়ে শান্তি-শৃঙ্খলা কায়েমে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়ে আসছে। এক সময়ে যারা বুনো গোয়ার্তুমির সাহায্যে জীবিকা নির্বাহ করত, এখন তারা যাকে বলা যায় সাধু ও সৎ উপায়ে সংসার চালায়। এদের বড় একটা গুণ, পরিবারটা রক্তসম্পর্কের সুদৃঢ় ঘনিষ্ঠ বাঁধনে একজোট যে-সমাজে স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ততার চেয়েও পরিবারের প্রতি বিশ্বস্ততার গুরুত্ব বেশি, তাদের তুলনায়ও বোচ্চিচ্চিও পরিবারের একতা অনেক বেশি দৃঢ় আর মজবুত।
এক সময় বোচ্চিচ্চিও পরিবারের চাচাতো ফুফাতো ভাই আর তাদের নাতিদের গোণার মধ্যে ধরলে দাঁড়াত প্রায় দুশো, দক্ষিণ সিসিলির একটা ছোট্ট অংশের সমগ্র অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত তখন ওরা। গোটা পরিবারের আয়ের উৎস ছিল চার-পাঁচটি ময়দার কল, সেগুলোর মালিকানা সকলের হাতে সমান ভাবে না থাকলেও, পরিবারের কাউকেই খাওয়া চাকরি বা খানিকটা নিরাপত্তার জন্যে ভাবতে হত না। তার উপর নিজেদের মধ্যে বিয়ে-থা হওয়াতে ওরা সবাই মিলে একজোট হয়ে শত্রুপক্ষের মোকাবিলা করতে পারত।
সিসিলির ওই অঞ্চলে ওদের সাথে রেষারেষি করার জন্যে কাউকে ময়দার কল, কিংবা বাধ তৈরি করতে দেয়া হত না, যাতে প্রতিযোগীরা পানি না পায়, কিংবা ওদের পানি বিক্রির আয়ে কেউ ভাগ না বসায়। একবার একজন প্রতিপত্তিশালী জমিদার শুধুমাত্র নিজের প্রয়োজন মেটাবার জন্যে একটা ময়দার কল বসাবার চেষ্টা করল। কলটা পুড়িয়ে ফেলা হলো। জমিদার তখন পুলিশের কাছে সাহায্য চাইল। তারা বোচ্চিচ্চিও পরিবারের তিনজনকে গ্রেফতারও করল। কিন্তু তাদের বিচার হবার আগেই জমিদারের বাড়িতে আগুন ধরে গেল। নালিশ অভিযোগ তুলে নিতে আর দেরি করেনি জমিদার। এর কয়েক মাস পরে, ইতালীয় সরকারের শ্রেষ্ঠ পদাধিকারীদের একজন সিসিলিতে এসে এই দ্বীপের বারোমেসে পানির অভাব মেটাবার জন্যে প্রকাণ্ড একটা বার তৈরির পরিকল্পনা করল। রোম থেকে স্থপতিরা এল মাটি পরীক্ষা করার জন্যে। স্থানীয় অধিবাসীরা মুখ কার্লো করে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। এরা সবাই বোচ্চিচ্চিও পরিবারের সদস্য। বিশেষভাবে নির্মিত ব্যারাকে পুলিশের লোকদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাটাকে পানিতে ডুবিয়ে দেয়ার কাজও শেষ।
সবাই ধরে নিল এবার বাধ তৈরি ঠেকাতে পারবে না কেউ। রসদ, মাল মসলা, যন্ত্রপাতি জাহাজ থেকে নামানো হলো পালার্মোতে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। ইতিমধ্যে বন্ধু মাফিয়া নেতাদের সাথে যোগাযোগ করে, তাদের কাছ থেকে সাহায্য চেয়ে রেখেছে বোচ্চিচ্চিওরা। ভারি ভারি যন্ত্রপাতি যথাসময়ে ধ্বংস করা হলো সব, আর হালকা জিনিসগুলো সব চুরি হয়ে গেল। ওদিকে ইতালীয় সংসদে মাফিয়াদের প্রতিনিধিরা বাধের প্রস্তাবকারীদের বিরুদ্ধে আমলাতান্ত্রিক প্রতি-আক্রমণ চালাতে শুরু করেছে। এভাবে চলল দীর্ঘ কয়েকটা বছর। তারপর ক্ষমতাসীন হলেন মুসোলিনি। ডিক্টেটর সাহেব নির্দেশ দিলেন, বাধ তৈরি করতেই হবে। তবু করা গেল না। মুসোলিনি জানতেন মাফিয়ারা তার শাসন ব্যবস্থা বিপন্ন করার চেষ্টা চালাবে, তার রাজ্যে ওদের নিজেদের প্রভাবাধীন একটা আলাদা এলাকা সৃষ্টি করবে। একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মচারীকে পূর্ণ ক্ষমতা দিলেন মুসোলিনি। সে লোকটি সবাইকে জেলে ভরে, নয়ফ্লো দ্বীপান্তরে পাঠিয়ে সাথে সাথে সমস্যার সমাধানও করে ফেলল। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে মাফিয়াদের শিরদাঁড়া ভেঙে দিল সে, যাকেই মাফিয়াদের সমর্থক বলে সন্দেহ হয় তাকেই ধরে বন্দী করে। এতে অসংখ্য নিরীহ পরিবারেরও সর্বনাশ ঘটল।
