এত পরিচ্ছন্নভাবে সব কিছু চিন্তা করতে পেল্পেও পরবতী একটা ঘণ্টাকে সর্বান্তঃকরণে ভীষণ ভয় পাচ্ছে টমহেগেন। নিজের ভূমিকাটা কি হবে সে ব্যাপারে মাথা ঘামাতে হচ্ছে তাকে। মনে মনে একটা ছকও তৈরি করে ফেলল। হ্যাঁ অবশ্যই, নিজের অযোগ্যতার কঠিন বিচার করতে হবে তাকে যে ভুল সে করেছে। তা অস্বীকার করার কথা একবারও উদয় হলো না হেগেনের মনে তরে, বিশ্লেষণ করে এ-কথাও ভাবল সে যে নিজেকে বেশি দোষ দিতে গেলে গড ফাদারের দায়িত্বের বোঝা আরও ভারিই করা হবে শুধু। নিজের শোকের প্রচণ্ডতা প্রকাশ করতে গেলে গড ফাদারের শোকটাই তীব্র করে তোলা হবে শুধু। যুদ্ধরত একটা পরিবারের উপদেষ্টা হবার যোগ্যতা তার নেই এ-কথা সে যদি মুখ ফুটে বলে, এমন একজন অপদার্থ লোককে এত গুরুত্বপূর্ণ একটা পদে এতদিন বহাল রাখার জন্যে ডন নিজেও নিজেকে অপরাধী, দোষী ভাববেন। তাই এমন কিছু তাকে বলা চলবে না যাতে তার মানসিক যন্ত্রণার পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।
তাই সিদ্ধান্ত নিল টম হেগেন, খবরটা আর সব সাধারণ খবরের মত করেই শোনাতে হবে গড ফাদারকে। তারপর তাকে সে জানাবে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পেতে হলে এখন কি করতে হবে তা নির্ধারণের জন্যে সব দায়িত্ব নিতে হবে তাকে। কেন, তাও বিশ্লেষণ করে দেবে হেগেন। ব্যস, এইটুকু। এরপর চুপ করে থাকবে সে। অপেক্ষা করবে ডনের নির্দেশের জন্যে। ওর প্রতিক্রিয়া কি হবে তা নির্ভর করবে ডনের ওই আদেশের উপর। গড ফাদার যদি চান সে তার অপরাধ স্বীকার করুক, অকুণ্ঠচিত্তে তাই করবে হেগেন। তিনি যদি আশা করেন সে শোক প্রকাশ করুক, অন্তর থেকে তাই করবে হেগেন।
গাড়ির শব্দ। মাথা তুলে তাকাল হেগেন। দেখল, উঠানে গাড়ি ঢুকেছে। এসে পৌঁছাচ্ছে ক্যাপোরেজিমিরা। ওদেরকে আগে শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে তার, তারপর ঘুম ভাঙাবে গড ফাদারের। উঠে দাঁড়াল হেগেন। ডেস্কের পাশে কেবিনেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কেবিনেট খুলে একটা গ্রাস আর একটা মদের বোতল বের করল। সেই মুহূর্তে সেখানেই স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল হেগেন, একচুল নড়ার শক্তি নেই তার। সমগ্র অস্তিত্ব এমন সাঙ্ঘাতিকভাবে বিচলিত হয়ে পড়েছে যে বোতল থেকে গ্রাসে মদ ঢালবে সে-ক্ষমতাটুকু পর্যন্ত নেই তার। হঠাৎ, সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে, একটা শব্দ এল পিছন থেকে। দরজা খোলা এবং ভিতর থেকে আবার বন্ধ হয়ে যাবার আওয়াজ। ধীরে ধীরে পিছন ফিরল টম হেগেন।
ডন কর্লিয়নি। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনি। গুলি খেয়ে আহত হবার পর এই প্রথম কাপড়চোপড় পরে রোগশয্যা শ্রাগ করে উঠে এসেছেন।
বিশাল কামরার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে হেঁটে এলেন ডন কর্লিয়নি। তাঁর নিজের চামড়া বাঁধানো প্রকাও আরাম কেদারাটায় বসলেন ধীরে ধীরে। তার হাঁটাটা লক্ষ করল হেগেন, একটু আড়ষ্ট ভাব রয়েছে। পোশাকগুলো শরীরে দিলে হয়ে ঝুলছে। কিন্তু হেগেনের তবু মনে হলো, তাকে দেখতে বরাবর এই রকমই লাগে। এখন কে বরং আরও শক্ত বলে মনে হচ্ছে, যেন মনের জোরে শরীর থেকে সমস্ত দুর্বল ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বিছানা থেকে উঠে এসেছেন তিনি। তবে, শরীরটা যে এখনও পুরোপুরি সারেনি তাও বোঝা যাচ্ছে মুখটা গম্ভীর। একটু অস্বাভাবিক রকম গম্ভীর। সেই গাম্ভীর্যের সাথে আগের সমস্ত শক্তি আর বলিষ্ঠতা প্রকাশ পাচ্ছে। শিরদাঁড়া খাড়া করে আরাম কেদারায় বসে আছেন তিনি। কনসিলিয়রিকে বললেন, দাও, আমাকেও এক ফোঁটা অ্যানিসেট দাও।
বোতল বদল করে নিয়ে এল হেগেন। যষ্টি-মধুর গন্ধ মেশানো ঝাঝালো পানীয় ঢালল দুটো গ্লাসে। ঘরে তৈরি, এ-জিনিস দোকানে কিনতে পাওয়া যায় না পুরানো এক বন্ধুর উপহার। প্রত্যেক বছর এক গাড়ি এই অ্যানিসেট পাঠিয়ে দেয় সে কর্লিয়নিদের বাড়িতে।
ঘুমুতে গিয়ে কাঁদছিলেন আমার স্ত্রী, বললেন ডন কর্লিয়নি। জানালা দিয়ে দেখলাম, আমার ক্যাপোরেজিমিরাও এল সবাই। এখন তো রাত দুপুর। তাই, হে আমার প্রিয় কনসিলিয়রি, সবাই যা জানে সেটা তোমার ডনকেও জানানো উচিত।
মাকে কিছু বলিনি আমি, শান্ত গলায় বলল হেগেন। আপনার ঘুম ভাঙিয়ে সব কথা এখুনি আপনাকেই বলতে যাচ্ছিলাম।
ভাবলেশহীন চেহারা ডন কর্লিয়নির। বললেন, কিন্তু আমাকে বলার আগে একটু মদ খেয়ে নেবার দরকার হয়েছিল।
হ্যাঁ, স্বীকার করল হেগেন।
এখন তো মদ খাওয়া হয়ে গেছে, বললেন ডন কর্লিয়নি। হেগেন দুর্বল হয়ে পড়েছে লক্ষ করে মৃদু অভিযোগের সুর ফুটল ভর কণ্ঠে। এবার আমাকে বলতে পারো।
বাঁধের ওপর গুলি করেছে ওরা সনিকে, বলল টম হেগেন। মারা গেছে সনি।
চোখ পিট পিট করছেন ডন কর্লিয়নি। মাত্র এক নিমেষের জন্যে তাঁর সমস্ত মনোবল প্রায় ধ্বসে পড়ল, তার সমস্ত জগৎ সমগ্র অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ল তার, শরীর থেকে শেষ শক্তি বিন্দুটুকুও নিঃশেষ হয়ে গেল। চেহারা দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে সব। কিন্তু তা ওই এক নিমেষের জন্যে মাত্র। তারপরই নিজেকে সামলে নিলেন গড ফাদার।
কয়েক মুহূর্ত পরই একজন বুডিগার্ড ঢুকল সভাঘরে। ক্যাপোরেজিমিদের নিয়ে এসেছে সে। ক্যাপারেজিমিরা সাথে সাথে বুঝতে পারল ছেলের মৃত্যু সংবাদ শুনেছেন গড় ফাদার, কারণ ওদেরকে দেখা মাত্র আরাম কেদারা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
