কি বলব ওকে? জানতে চাইল কার্লো!
কার্লোর গলার স্বরটা গভীর মনোযোগের সাথে শুনল হেগেন। বিমূঢ় একটা ভাব রয়েছে তার গলার সুরে, কিন্তু এ থেকে কিছুই প্রমাণ হয় না। বিমৃঢ় ভাবটার সাথে রয়েছে একটু কৌতূহলের পরশ। এ থেকেও কিছু প্রমাণ হয় না। তার মানে, কার্লো অভিনয় করছে কিনা তা নিশ্চিত করে বলার কোন উপায় নেই।
ওকে তুমি জানাবে যে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বলল হেগেন, তোমাদের সংসারটাকে লং বীচের উঠানের একটা বাড়িতে তুলে নিয়ে আসা হবে। আরও বলবে যে তোমাকে একটা বড় ধরনের কোন কাজ দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ডন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তোমাদের পারিবারিক জীবনটা যাতে আরও সুখের হয় তার ব্যবস্থা তিনি করবেন। সববুঝতে পারছ তো?
হ্যাঁ। ঠিক আছে। কার্লোর কণ্ঠৰূরে আশার সুর পাওয়া যাচ্ছে।
একটু পরই তোমাদের দরজায় নক করবে আমার দুজন লোক, বলল হেগেন। তোমাকে সাথে করে নিয়ে আসার জন্যেই যাচ্ছে ওরা। কিন্তু ওরা পৌঁছুলেই ওদেরকে বলবে আমাকে যেন একটা ফোন করে। শুধু এই একটা কথা। আর কিছু বলবে না। ওদের আমি নির্দেশ দেব কনির সাথে ওখানেই থাকবে তুমি। সব বুঝতে পারছ?
হ্যাঁ, হ্যাঁ–অবশ্যই, উত্তেজিতভাবে বলল কার্লো। হেগেনের কণ্ঠস্বরে চাপা উত্তেজনা টের পেয়ে গেছে সে। এতক্ষণে সজাগ, সতর্ক হয়ে উঠেছে যেন। পরিষ্কার সব টের পাচ্ছে সে। গুরুতর কোন খবর আছে।
খবরটা দেবার সময় কোন ভূমিকা করল না হেগেন। স্পষ্ট, সংক্ষিপ্ত ভাষায় বলল, এই একটু আগে মেরে ফেলেছে ওরা সনিকে। সাবধান, কিছু বলো না আমাকে। তুমি ঘুমাচ্ছিলে, তাই জানো না, কনি ওকে ফোন করেছিল। কনির ফোন পেয়ে তোমাদের বাড়িতে যাচ্ছিল সনি। কিন্তু খবরদার, এ-কথা কোনভাবেই যেন জানতে না পারে কনি-আমি তা চাই না। কিছু একটা সন্দেহ করবে, করুক–আসল কথাটা যেন কোনভাবেই টের না পায়। জানতে পারলেই ভাববে, ওর দোষেই বুঝি মারা গেছে সনি। শুধু আজকের রাতটা তুমি ওখানেই, ওর কাছেই থাকে। কিন্তু যতই জানতে চেষ্টা করুক, কিছু বলো না। ঝগড়া-বিবাদ যা হবার হয়েছে, সব মিটমাট করে নাও। আদর্শ মামীর মত ব্যবহার করো। অন্তত ওর ছেলে না হওয়া পর্যন্ত খুব ভাল ব্যবহার করে যেতে হবে ওর সাথে তোমাকে। কাল সকালে দুঃসংবাদটা শোনানো হবে ওকে। হয় তুমি, নয়তো ওর মা, কিংবা ডন নিজে ওকে বলবেন যে ওর ভাই মারা গেছে। ওর কাছ থেকে এক সেকেণ্ডের জন্যেও নড়ো না তুমি, এই আমি চাই। বুঝতে পারছ আমি কি বলতে চাইছি? আমার এই একটা অনুরোধ শুধু রাখো তুমি, বিনিময়ে আমিও দেখব কিসে তোমার ভবিষ্যৎ ভাল হয়। কিছু বলার আছে তোমার?
না, টম, কাঁপতে শুরু করেছে কার্লোর গলা। তোমার অনুরোধ একশোবার রাখব আমি, সে-কথা আমাকে আর তোমার মনে করিয়ে দিতে হবে না। শোনো, টম, তোমার সাথে আমার তো চিরকালই খুব ভাল সম্পর্ক, তাই না? যীশুর কিরে, তোমার প্রতি আমি সাঙ্ঘাতিক কৃতজ্ঞ আর ঋণী। বিশ্বাস করো।
করলাম, বলল হেগেন। তোমাকে সম্পূর্ণ আশ্বাস আর নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি আমি, কার্লো, কনির সাথে তুমি ঝগড়া করেছিলে বলে যা ঘটে গেছে সেজন্যে কেউ তোমাকে দায়ী করবে না। এব্যাপারে এতটুকু দুশ্চিন্তা করার কোনও দরকার নেই তোমার। যা করার আমি করব, তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না। একটু বিরতি নিল হেগেন, তারপর কার্লোকে উৎসাহ যোগাবার জন্যে আবার বলল, যাও এবার, কনির যত্ন নাওগে। ফোনের কানেকশন কেটে দিল টম।
ডন কর্লিয়নির কাছ থেকে শিক্ষা পেয়েছে টম হেগেন, তাই কাউকে হুমকি দিতে বা শাসাতে শেখেনি সে। তবে, তার কথার একমাত্ৰঅর্থটা যে কি তা বুঝতে একটুও অসুবিধে হয়নি কার্লোর। কার্লো জানে, মৃত্যুর কাছ থেকে মাত্র একচুল দূরে রয়েছে সে এখন।
এরপর টেসিওকে ফোন করল হেগেন। এই মুহূর্তে লং বীচে চলে আসতে বলল তাকে। কি দরকার, সে সম্পর্কে কোন আভাসই দিল না। টেসিও অবশ্য কিছু জানতেও চাইল না। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল এবার টম হেগেনের বুক থেকে। এইবার তাকে সবচেয়ে ভয়াবহ কর্তব্যটা পালন করতে হবে।
ওষুধ খেয়ে ঘুমাচ্ছেন ডন কর্লিয়নি। তার ঘুম ভাঙাতে হবে। দুনিয়ায় যে মানুষটিকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসে টম হেগেন, তাকে জানাতে হবে তিনি যে গুরুদায়িত্ব ওর কাঁধে দিয়েছিলেন সেই দায়িত্ব পালন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে ও! তার সামাজ্য রক্ষা করতে পারেনি ও। তাঁর বড় ছেলের প্রাণ বাঁচাতে পারেনি। তাকে বলতে হবে, এটাই শেষ সুযোগ, এই শেষ মুহূর্তে বিছানা থেকে উঠে তিনি যদি যুদ্ধে নেতৃত্ব গ্রহণ না করেন, সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে কর্লিয়নি পরিবারকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাবার আর কোন উপায় নেই। হেগেনের চিন্তা-ভাবনার মধ্যে কোন ভাবাবেগ, অন্ধবিশ্বাস বা কোন রকম ভুল-ভ্রান্তি নেই। অন্তস্তল থেকে বিশ্বাস করে সে, একমাত্র মহান ডন নিজে এখনও, এই নিদারুণ পরাজয়ের মধ্যে থেকেও, একটা মাত্র অমোঘ চাল দিয়ে উদ্ধার করে তুলে আনতে পারেন কর্লিয়নি পরিবারকে রক্ষা করতে পারেন নিজের এত কষ্টের গড়া ধ্বংসেম্মুখ সামাজ্যকে।
ডন কর্লিয়নির ব্যক্তিগত ডাক্তারদের সাথে পরামর্শ পর্যন্ত করল না হেগেন। কোন লাভ নেই তাতে। ডাক্তারা এখন যে পরামর্শই দিক না কেন, এখন আর তার কোন গুরুত্ব নেই। এমন কি তারা যদি একবাক্যে জানায়, বিছানা থেকে উঠলে ডন কর্লিয়নির প্রাণ বিপন্ন হয়ে পড়বে, তিনি মারা যেতে পারেন-তবু তাদের কথায়। কান দেবে না টম হেগেন গড় ফাদারকে এই মুহূর্তে সব কথা জানাতে হবে। তারপর তার নির্দেশ শুনতে হবে, তাকে অনুসরণ করতে হবে, অন্ধের মত এবং ডন কর্লিয়নি এই শেষ মুহূর্তে কি করবেন না করবেন সে-বিষয়ে কোন রকম দ্বিধা বা সংশয় দেখা দিতে পারে না, উঠতে পারে না কোনও প্রশ্ন ডাক্তারদের পরামর্শ এখন অবান্তর হয়ে গেছে, সমস্ত কিছুই এখন মূল্যহীন, অবান্তর হয়ে গেছে। সব কথা জানাতে হবে ডন কর্লিয়নিকে, এটাই এই মুহূর্তের একমাত্র কাজ। সব শুনে হয় তিনি নিজ সামাজ্যের নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন, নয়তো পাঁচ পরিবারের হাতে তুলে দিতে হবে কর্লিয়নিদের সমস্ত ক্ষমতা, তাদের কাছে বিলিয়ে দিতে হবে নিজেদের সমগ্র অস্তিত্ব। এর কোন বিকল্প নেই।
