তাই তিনি কোন প্রশ্ন করে টম হেগেনকে আটকে রাখার চেষ্টা করলেন না। কোন কৌতূহল বা উদ্বেগ প্রকাশ করে তাকে মহা একটা বিপদে ফেলে দিলেন না। অনায়াসে টমকে তিনি পালিয়ে যেতে দিলেন।
কোণার সভাঘরে পালিয়ে এসেছে টমহেগেন। ঘরে ঢুকেই থরথর করে কাঁপছে সে। অদম্য কাপুনিটা কোনভাবেই চেষ্টা করে থামাতে পারছে না! দুই পা এক সাথে চেপে, ঘাড় কুঁজো করে, মাথাটা গুঁজে, দুই হাঁটুর মাঝখানে হাত দুটোকে এক সাথে শক্ত মুঠো পাকিয়ে এমন অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসে পড়ল সে, যেন খোদ শয়তানের কাছে মিনতির সাথে ক্ষমা চাইছে।
যুদ্ধরত একটা পরিবারের উপদেষ্টা হবার যোগ্যতা যে ওর নেই, তা এখন পরিষ্কার বুঝতে পারছে টম হেগেন। পাঁচ পরিবার ওকে তাদের অভিনয়ের সাহায্যে সম্পূর্ণ বোকা বানিয়ে ছেড়েছে, ঠকিয়ে ভূত করে দিয়েছে। চুপচাপ, নিঃসাড় পড়ে থেকে, মারের উপর মার খেয়ে সমস্ত হজম করে, এই ভয়ঙ্কর ফাঁদটা পেতেছিল ওরা। ষড়যন্ত্র পাকা করে, ফন্দি এটে, ২টি বুজে ওত পেতেছিল ওরা। আহত, রক্তে ভেজা হাত মাথার উপর আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে তুলে রেখেছিল, এদিক থেকে শত গুতো খেয়েও সহস্র প্ররোচনাতেও পাল্টা মার দিতে রাজী হয়নি। এসবের পিছনে একটাই উদ্দেশ্য ছিল পাঁচ পরিবারের। মোক্ষম একটা আঘাত হেনে কর্লিয়নিদের একটা স্তম্ভকে ধ্বংস করে দেবে। তাই দিয়েছে। প্রাক্তন বুড়ো কনসিলিয়রির চোখে ওদের এই ছল অবশ্যই ধরা পড়ে যেত। এ-ভুল কখনোই হত না তার। ইঁদুরের গন্ধ আগেই এসে লাগত তার নাকে। তিনশো গুণ সতর্কতা অবলম্বন করত সে, ধোয়া দিয়ে ঠিক বের করে আনত গর্ত থেকে ইঁদুর।
নিজের সম্পর্কে এই সমস্ত ধিক্কারসূচক চিন্তার উপর প্রচণ্ড শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে টম হেগেন। ওর সত্যিকার শুভাকাঙ্ক্ষী, বন্ধু আর ভাই ছিল সনি কর্লিয়নি। ও ছিল তার ত্রাণকর্তা। সেই ছোটবেলার কথা, সনি ছিল টমের আদর্শ পুরুষ। তার সাথে কখনোই তো নীচ আচরণ করেনি সনি, জীবনে কখনও একটা কটু কথা পর্যন্ত বলেনি তাকে, সব সময় আপন, ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মত ব্যবহার করেছে। তাকে যখন মুক্তি দিল সালোযো, বাড়ি ফিরে আসতেই, বন্ধুকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরেছিল সনি দুজনের সাথে দেখা হওয়ায়, আন্তরিক আনন্দ পেয়েছিল সনি। বড় হয়ে নিছুর, রক্তলোলুপ, হিংস্র হয়ে উঠেছিল সনি–কিন্তু তাতে টম হেগেনের কি?
প্রচণ্ড আতঙ্কে কিচেন থেকে পালিয়ে এসেছে টম। জানে, মাকে কিছুতেই ছেলের মৃত্যু-সংবাদ শোনাতে পারবে না সে। ডনকে সবসময় মনে হয়েছে নিজেরই বাবা, সনিকে মনে হয়েছে নিজেরই ভাই, কিন্তু সনির মাকে তার কখনও নিজের মা বলে মনে হয় না। ফ্রেডি, কনি আর মাইকেলকে যেমন স্নেহ করে টম, তেমনি ভালবাসে ওদের মাকেও। কারও কাছ থেকে দয়া পেলে তাকে যেভাবে শ্রদ্ধা করা যায়, সেটাকে ঠিক ভালবাসা বলা যায় না। যাকে বলে অন্ধ ভালবাসা, সনির মায়ের উপর সেটা নেই টমের, তবু টম এ-খবর তাকে নিজের মুখে দিতে পারবে না। কমাসই বা হয়েছে, এই অল্প কদিনেই তিনি তার সব কটা ছেলেকে হারালেন প্রাণ নিয়ে সিসিলিতে লুকিয়ে রয়েছে মাইকেল, ফ্রেডি নেভাডায় নির্বাসিত, আর এখন সান্তিনোকেও তিনি হারালেন চিরতরে। তিন ছেলের মধ্যে কে তার সবচেয়ে প্রিয়পাত্র? কাকে তিনি সবচেয়ে ভালবাসেন? তা তো কখনও প্রকাশ পায়নি তার কথায় বা আচরণে!
ফোন পাবার পর এক মিনিট পেরিয়ে গেছে। এরই মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়েছে টম হেগেন। ক্রেডল থেকে রিসিভার তুলে কনির নাম্বারে ডায়াল করল ও। অপরপ্রান্তে বেজেই চলেছে রেল, কেউ রিসিভার তুলছে না। অনেকক্ষণ পর তুলল, ফিসফিস করে নিজের পরিচয় দিল কনি।
আশ্চর্য নরম সুরে বলল টম হেগেন, কনি, আমি টম বলছি। কার্লোর ঘুম ভাঙিয়ে ওকে আমার কথা বলো, জরুরী একটা কথা আছে ওর সাথে আমার।
সন্ত্রস্ত, নিচু গলায় জানতে চাইল কনি, টমটম, এখানে কি আসছে সনি?
না, কনি, মৃদু কোমল সুরে বলল হেগেন। সনি তোমাদের ওখানে যাচ্ছে। কোনও ভয় নেই। কার্লোকে শুধু ডেকে দাও, আমার কথা বলো ওকে। দেরি করো না, লক্ষ্মী বোন। খুব জরুরী ব্যাপার।
টম, ভয়ঙ্করভাবে আমাকে মেরে?F ও, চাপা সুরে কেঁদে ফেলে বলল কনি। বাড়িতে ফোন করেছি জানতে পারলে কাজ আমাকে মেরেই ফেলবে।
না। আর মারবে না তোমাকে ক দিচ্ছি। আমার কথা বিশ্বাস করো, দৃঢ় কিন্তু শান্ত গলায় বলল হেগেন। ওর সাথে আমাকে শুধু কথা বলতে দাও। তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। বলো, খুবই জরুরী একটা প্রসঙ্গে আলাপ করতে চাই আমি। এখুনি ফোনে আমার সাথে কথা বলা খুব বেশি দরকার ওর। বুঝতে পারছ তো?
পাঁচ মিনিট অপর প্রান্তে আর কারও সাড়া নেই। তারপর ঘুম আর মদের নেশায় জড়ানো, কার্লোর গলা পেল হেগেন।
যত অল্প সময়ের মধ্যে সম্ভব কার্লোকে সজাগ করে ভোলার জন্যে আশ্চর্য তীব্র কণ্ঠে বলল টম হেগেন, শোনো, কার্লো। নিজেকে তৈরি করে নাও। সাঙ্ঘাতিক একটা খবর দিতে যাচ্ছি তোমাকে! খবরটা শোনার পর তোমার চেহারায় কোন রকম প্রতিক্রিয়া যেন না হয়। আমার কথা সব বুঝতে পারছ? খবরটা শোনার পর এমন ভাব দেখাবে যেন কিছুই হয়নি। কনিকে জানিয়েছি তোমার সাথে বিশেষ জরুরী একটা আলাপ আছে। বিষয়টা সম্পর্কে নিশ্চয়ই জানতে চাইবে ও।
