গাড়ি থামাল সনি! তোলাখানার লোকটার হাতে ধরিয়ে দিল এক ডলারের নোটটা! বাকি পয়সা ফেরত পাবার জন্যে অপেক্ষা করছে ও। একটু অধৈর্য হয়ে উঠেছে মনে মনে। গাড়ির জানালাটা তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দিতে চাইছে ও।
আটলান্টিক মহাসাগরের হু হু বাতাস ঢুকে কনকনে ঠাণ্ডা হিম হয়ে যাচ্ছে গাড়ির ভিতরটা কিন্তু তোলাখানার লোকটার হাত একেবারে চালু নয়, খুচরো পয়সা ফেরত দিতে অস্বাভাবিক দেরি করছে লক্ষ্মীছাড়া হারামজাদা, ভাবছে সনি, হাত থেকে খুচরো পয়সাগুলো সব ফেলেই দিল শেষ পর্যন্ত।
পয়সা তোলার জন্যে ঝুঁকে পড়ল লোকটা। এখন আর ওকে গাড়ির পাশে দেখতে পাচ্ছে না সনি। লোকটার শরীর, মাথা সব দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে।
ঠিক এই সময় একটা বিদঘুঁটে ব্যাপার লক্ষ্য করল সনি। সামনের গাড়িটা সরে যায়নি, মাত্র কয়েক ফুট এগিয়ে ওর বুইকের পথ আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ইচ্ছা করলেও সনি এখন গাড়ি চালিয়ে চলে যেতে পারবে না। নিজের অজান্তেই ঝট করে ঘাড় ফিরিয়ে ডান দিকে তোলাখানার ভিতর তাকাল সনি। দেখল অন্ধকারে আরেকজন লোক রয়েছে। কিন্তু লোকটার উপস্থিতি সম্পর্কে চিন্তা করার জন্যে একটা সেকেণ্ড সময়ও পেল না সনি। উইণ্ডস্ক্রীনের ভিতর দিয়ে সামনের গাড়িটার দিকে আবার তাকাতে গিয়েই দেখল সেটা থেকে নেমে পড়েছে দুজন লোক। এগিয়ে আসছে তারা। ওর দিকে।
যে লোকটা পয়সা কুড়োবার জন্যে ঝুঁকে পড়েছে তাকেও দেখতে পাচ্ছে না সনি এক সেকেন্ড আগেও তার সাড়া-শব্দ পাচ্ছিল। এখন পাচ্ছে না
এরপর, কিছু ঘটবার আগেই, এক সেকেণ্ডের একশো ভাগের একভাগ সময়ের মধ্যেই সনি কর্লিয়নি বুঝতে পারল, মারা যাচ্ছে সে। সেই মুহূর্তে ওর মন আর অন্তরাত্মা আশ্চর্য নির্মল, কলুষমুক্ত হয়ে গেল। মন থেকে নিমেষে সাফ হয়ে গেল সমস্ত.হিংসা, বিদ্বেষ আর ঘৃণা সেই লুকিয়ে থাকা ভীতিটা, যাকে বলা হয় মৃত্যুভয়, তার পূর্ণাঙ্গ চেহারা নিয়ে জ্যান্ত হয়ে উঠে যেন সনির সমস্ত অপবিত্রতা দূর করে দিল।
জীবনের উপর তবু একটা মায়া থাকে, থাকে ভালবাসা, সেই মায়া আর ভালবাসারও থাকে একটা প্রতিক্রিয়া। বিদ্যুৎগতিতে সনির প্রকাণ্ড শরীরটা গাড়ির দরজার উপর দড়াম করে আছড়ে পড়ল। অত বড় বুইক গাড়িটা তীব্র একটা ঝাঁকি খেল চাবিটা ভেঙে গেছে দরজার।
অন্ধকার তোলাখানা থেকে সেই নোকটা গুলি চালাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছে সনির বিশাল শরীর। ওর গলায় আর মাথায় বুলেট লাগল। তোলাখানার লোকটা গুলি করছে না আর, কারণ সে দেখতে পাচ্ছে বুইকের পাশে চলে এসে সনির দিকে পিস্তল তাক করছে অপর দুজন লোক। মাথা, বুক, কোমর পিচ-ঢালা রাস্তার উপর পড়ে গেছে সনির, এখনও গাড়ির ভিতর রয়ে গেছে পা দুটো। দুজন একসাথে গুলি করছে এখন সনির শরীরে। তারপর ওরা সনির মুখে লাথি মারতে শুরু করল। বুট জুতোর প্রচণ্ড আঘাতে ক্ষতবিক্ষত, বিকৃত করে দিল মুখটাকে। ব্যক্তিগত ঘৃণার নমূনা রেখে যাচ্ছে ওরা। যারা গুলি করেছে সেই তিনজন আর তোলাখানার নকল লোকটা দ্রুত উঠে পড়ল গাড়িতে। জোন্স বীচের উল্টো দিকে মিডওয়ে পার্কওয়ে, তীরবেগে সেদিকে ছুটে যাচ্ছে গাড়িটা।
রাস্তার মাঝখানে বুইক আর সনির মৃতদেহ পড়ে রয়েছে, ওদের পিছু ধাওয়া করার পথ একরকম বন্ধই। কয়েক মিনিট কেটে যাবার পর এসে পৌঁছুল সনির বাডগার্ডদের গাড়িটা। গাড়ি থামাল ওরা। সনিকে এভাবে পড়ে থাকতে দেখে খুনীদেরকে অনুসরণ করার কোন ইচ্ছাই অনুভব করছে না তারা। প্রকাণ্ড একটা অর্ধবৃত্ত রচনা করে গাড়ির নাক ঘুরিয়ে নিল, ফিরতি পথ ধরে লং বীচের দিকে তীরবেগে ছুটছে। বাধের নিচে নেমে এসে প্রথম যে পাবলিক টেলিফোন বৃদটা চোখে পড়ল সেখানে ঘ্যাচ করে ব্রেক কষে গাড়ি থামাল তারা। লাফ দিয়ে নামল একজন। ছুটে গিয়ে ঢুকল বুদের ভিতর। ফোন করল সে টম হেগেনকে।
হাঁপাচ্ছে লোকটা। দ্রুত, সংক্ষেপে, এক নিঃশ্বাসে বলল সে, সনি নেই জোন্স বাচ তোলাখানার সামনে ওকে মেরে ফেলেছে ওরা।
এতটুকু চাঞ্চল্য নেই টম হেগেনের কণ্ঠস্বরে। সম্পূর্ণ শান্ত এবং সংযত সে বলল, বেশ। সোজা ক্লেমেঞ্জার বাড়ি যাও। তাকে এখানে দরকার আমার। সেই জানাবে তোমাদেরকে কি করতে হবে।
টেলিফোন মেসেজটা কিচেন থেকে রিসিভ করল টম হেগেন। এখানে কর্লিয়নি পরিবারের গৃহকত্রী উপস্থিত রয়েছেন। মেয়ে কনির জন্যে নাস্তা তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে আছেন তিনি। গলা শান্ত আর মাথা ঠাণ্ডা রেখেছিল হেগেন ফোনে কথা বলার সময়, কি ঘটে গেছে তার কিছুই টের পাননি বৃদ্ধা। ইচ্ছা থাকলে টের যে পেতেন না এমন নয়, কিন্তু দীর্ঘদিন ডন কর্লিয়নির সাথে ঘর-সংসার করার ফলে এইটুকু জ্ঞান তার হয়েছে যে যাই ঘটুক না কেন, নিজে থেকে কিছু লক্ষ না করাই সব দিক থেকে ভাল। বেদনাদায়ক কিছু, যদি জানতেই হয়, কেউ না কেউ অচিরেই তা জানাবে তাকে। কানে তুলো আর চোখে ঠুলি পরলে সেই বেদনা ভোগ করা থেকে যদি রেহাই পাওয়া যায়, অন্তত কিছুক্ষণের জন্যে, সেটাই বা মন্দ কিসের! পুরুষদের বেদনা আর মানসিক অশান্তির ভাগ নিতে তিনি রাজী নন, তারা তো আর মেয়েদের বেদনার অংশ নিতে আসে না। তার চেহারায় ভাবের লেশমাত্র নেই। নির্বিকার চিত্তে কফি ফোঁটাচ্ছেন কনির মা, খাবার সাজাচ্ছেন টেবিলের উপর। ব্যথা আর ভয়তে খিদে মিটে যায় বলে বিশ্বাস করেন না তিনি, তাঁর অভিজ্ঞতা বরং উল্টো কথা বলে। তিনি জানেন, পেটে কিছু পড়লে ব্যথা জিনিসটা তবু কমে। কখনও কোন ডাক্তার যদি ব্যথা কমাবার জন্যে তাকে ওষুধ দেয়, তার। উপর ভীষণ রেগে যান তিনি। তবে একটুকরো রুটি আর এক কাপ কফি দিলে, সেটা আলাদা কথা। সন্দেহ নেই, কর্লিয়নি পরিবারের গৃহকত্রী আরও আদিম একটা সংস্কৃতি নিয়ে জন্মেছেন।
